বাংলা নিয়ে পড়াশুনা করতে গিয়ে রীতিমতো বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ভক্ত হয়ে পড়েছেন পাকিস্তানের এক যুবক। করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে অনার্স পাস করা মোহাম্মদ তাহির ওয়াহিদ এখন স্বপ্ন দেখছেন পাকিস্তানে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটানোর।
ওয়াহিদের কথায়, আমি সঠিকভাবে বাংলা শিখতে চাই, চাই আমাদের এখানে বাংলা ভাষার চর্চা আরও বিস্তৃত হোক। বাংলাদেশে যাওয়ার ইচ্ছেও আছে। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেতে চাই। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য আমি বাংলা ভাষায় আরও দক্ষ হতে চাই।
তাহির ওয়াহিদের বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। শিক্ষকতা করতেন প্রাথমিক স্কুলে। তার ছয় সন্তানের মধ্যে তাহির ছাড়া কেউ আগে কখনও বাংলা ভাষা শিখাতে আগ্রহ দেখাননি। তাহিরের কেন আগ্রহ হলো, তিনি জানান, ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় বাংলা দৈনিক আনন্দবাজারকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তাহির বলেন, স্কুলে ইতিহাস বইয়ে পড়েছিলাম বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অতীতের যোগাযোগের কথা। সেই থেকে ইচ্ছে ছিলো বাংলা ভাষা শিখবো। তাই কলেজ শেষ করেই সোজা করাচী চলে আসা।
১৯৫৩ সালে চালু হবার পর থেকেই করাচী বিশ্ববিদ্যালয় আছে বাংলা বিভাগ। একাত্তরের যুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা হবার পাকিস্তানে বাংলা চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ টিকে আছে। প্রতি বছর চার-পাঁচ জন শিক্ষার্থী সেখানে ভর্তি হন।
মোহাম্মদ তাহির ওয়াহিদ জানান, বাংলা বিভাগে দু’জন শিক্ষক আছেন। তার সাথের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুধু একজন বাঙালি ছিলেন। আর অনলাইনে বাংলাভাষী বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে বাংলা শিখেছেন তিনি। এখন বাংলা লিখতে এবং বলতে পারেন।
করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে চার বছর মেয়াদের অনার্স ডিগ্রি আছে। বিভাগে প্রবেশের মুখেই রয়েছে বাংলাদেশের আহসান মঞ্জিল, স্মৃতিসৌধ, কক্সবাজারের ছবি। শিক্ষকরাও নিয়মিত বাংলা বই ও গবেষণা প্রকাশ করেন।
করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়াশোনা শেষ করে অনেক শিক্ষার্থী অনুবাদক হিসেবে কাজ করেন। অনেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজের সুযোগও পান। মোট ৪৬টি কোর্সে ১৩৮ ক্রেডিট করতে হয়। এছাড়া বিএ (পাস) ও এমএ শ্রেণির ডিগ্রি নেয়া যায়।
পরিবারের সায় না থাকায় বাংলা নিয়ে পড়াশুনা করার জন্য তাহিরকে অনেক সংগ্রামও করতে হয়েছে। কারণ, বাবা সোজা জানিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলায় পড়লে নিজ খরচে পড়তে হবে। তিনি এক টাকাও দেবেন না। এতে দমে যাননি তাহির। টিউশনি করে পড়ার খরচ চালিয়েছেন।
করাচীতে আসার পর তাহির বাঙালি অধিবাসীদের সংখ্যা দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। তার ধারণার বাইরে ছিলো শহরটিতে এতো বাঙালি থাকতে পারেন। তাহিরের কথায়, বাঙালি অধিবাসীরা দাবি করেন, পাকিস্তানে তাদের সংখ্যা প্রায় ৩০ লক্ষ। এত বাংলাভাষী থাকলেও পাকিস্তানে বাংলার চর্চা নেই বললেই চলে। স্কুলে এখানে কোথাও বাংলা পড়ানো হয় না।
তিনি জানান, বাংলায় অনার্স পড়তে শুরু করার পর তাকে প্রথম শিখতে হয়েছে বাংলা হরফ। ধীরে ধীরে আয়ত্তে আসতে থাকে ভিনদেশি ভাষা বাংলায়। প্রতি সেমিস্টার নতুন করে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে চিনেছেন তিনি।
প্রথম বছর পাঠ নিয়েছেন বাংলা পদ্য ও সাহিত্য সম্পর্কে। বাংলা লেখাও শেখানো হয়। তৃতীয় সেমিস্টারে পড়ানো হয় কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা। কবি ফররুখ আহমেদের লেখা ছিল নিয়মিত পাঠ্য। পড়তে হয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, উপন্যাস ও আধুনিক সাহিত্য।
ষষ্ঠ সেমিস্টারে পড়ানো হয় বাংলা ছোটগল্প। সপ্তম সেমিস্টারে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়েন তাহির। পড়তে হয়েছে জসীমউদ্দিন, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। তাদের বিভাগে দেখানো হত হুমায়ূন আহমেদের নাটক। অষ্টম সেমিস্টারে ভাষাবিজ্ঞান ও ধ্বনিবিজ্ঞান পড়তে হয়েছে তাহিরদের।
তাহির জানান, করাচীতে আছে নজরুল ইসলাম একাডেমী। সেখানে রয়েছে অজস্র বাংলা বই। পড়ার লোক তেমন কেউ নেই। সেখানে গিয়ে প্রাণভরে বাংলা বই পড়েছেন তাহির। তিনি চাইছেন, পাকিস্তানে বাংলা ভাষার চর্চা আরও বিস্তৃত হোক।
বর্তমানে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ তৈরি করে পাকিস্তানে যারা ইচ্ছুক, তাদের বাংলা শেখাতে উদ্যোগী হয়েছেন পাকিস্তান পাঞ্জাবের এই যুবক। বাংলা সাহিত্য উর্দুতে অনুবাদ করতেও চাইছেন তিনি। সেই সঙ্গে বেড়াতে আসতে চান বাংলাদেশে।
আরও পড়ুন: বর্ষবরণের প্রভাতে নির্ভয়ের গান ধরার আহবান
একবার হলেও ঘুরে যেতে যান কবি নজরুলের চুরুলিয়া গ্রামে। ইচ্ছে আসে রবি ঠাকুর প্রিয় শান্তিনিকেতনে বেড়াতে যাবার। আর মনে গোপন ইচ্ছে হলো, বাংলাদেশ বা ভারতের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি বাংলা নিয়ে আরও পড়াশুনা করা যায়।
একাত্তর/আরএ