বিশেষ সাক্ষাৎকার: অর্থনীতি আসলে কেমন আছে

বিত্তবান ও ক্ষমতাবানদের আয়ই বেশি বাড়ছে, অন্যদের নয়: ড. মুজেরি

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং অর্থনীতি গবেষণা সংস্থা বিআইডিএস-এর মহাপরিচালক ছিলেন তিনি অনেক বছর। তবু তাঁর চিন্তা, কথা আর কাজে গণমূখী সংবেদনশীলতা বেশি। এই প্রবীণ অর্থনীতিবিদের সাথে কথা বলেছেন জুলিয়া আলম। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ড. এমকে মুজেরি বলেন, আর্থিক খাতের সমস্যা এখন প্রকাশিত। এর প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ছে অর্থনীতির নানা খাত উপখাতে। ঋণখেলাপি ও প্রতাপশালীরাই পরিবর্তন করছে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা, প্রণয়ন করছে আর্থিক নীতিমালাও। তিনি বলেন, প্রকৃত উন্নয়নের পূর্বশর্ত সুশাসন কিন্তু সুবিধাভোগী উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের হাতে তাদেরই শ্রেনী স্বার্থে তৈরি হচ্ছে উন্নয়ন নীতি- তাই বাড়ছে বৈষম্য, যেখানে রাষ্ট্রের দায়ই বড়।  

জুলিয়া: বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ও বড় সংকটগুলো নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ কি? 

ড. মুজেরি:  সংকট  শব্দটা কিন্তু আমার মনে হয় যে কঠিন শব্দ। অর্থনীতিতে সংকট থাকবেই কারণ অর্থনীতি সবসময় বহমান। কোন অর্থনীতিই সংকট ছাড়া থাকে না কোনো সময়। একটা  অর্থনীতির বহিঃস্তর থাকে যেটা গ্লোবাল ইকোনমি আর অন্তঃস্থ অর্থনীতি অর্থাৎ ডমেস্টিক ইকোনমি। দুই দিকেই কিন্তু প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে আর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির প্রক্রিয়াগুলোকে এডজাস্ট করতে হয়। যেনো সবসময় একটা ফিকশন মানে ঘাত-প্রতিঘাত প্রতি মুহূর্তেই থাকে। তাই একটা অর্থনীতিতে কোনো রকম ঢেউ থাকবে না সেটি হবার নয়। কোনো কোনো সময় ঢেউগুলো জোরে আসে বিভিন্ন কারণে এবং আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। আমাদের অর্থনীতির সংকটগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু একটা মাত্রা আছে। মোটাদাগে  যদি বলি বাংলাদেশে এই মূহুর্তে বড় সমস্যা বহিঃস্থ খাতে অর্থাৎ ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ এবং এক্সচেঞ্জ রেট বিনিময় হারে- ডলারের দাম বেড়ে যাচ্ছে এবং আমাদের অর্থনীতিতে এর অনেক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। আরেকটা বড় সমস্যা মূল্যস্ফীতি যা আমাদের সব জনগোষ্ঠীকে এফেক্ট করছে। আর একটা অর্থনীতির কোনো জায়গায় যদি সমস্যা হয় এটা কিন্তু ওখানেই স্থির থাকে না- এর ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিক্রিয়া সর্বক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে। তাই বাংলাদশেও সব কর্মক্ষেত্রে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।

জুলিয়া: আামদের অর্থনীতির চলমান সংকটের কারণ কতটুকু বৈশ্বিক?  অন্য দেশেতো আমাদের মতো লাগাতার উচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়নি তাই তারা বিপাকে পড়লেও আমাদেরতো এতোটা বিপাকে পড়ার কথা নয়! তারপরেও আমরা কেনো এই অবস্থায় পড়লাম? 

ড. মুজেরি:  আপনি যদি দেখেন বৈশ্বিক সংকটে গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে কোভিড- ১৯ এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সারা পৃথিবীর অর্থনীতিকে দূর্বল করেছে আর বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম কিছু নয়। হয়তো কোভিড না থাকলে আমাদের অর্থনীতি আরো অনেক বেশি সবল হতে পারতো। এটা তো অস্বীকার করার  উপায় নেই যে আমাদের অর্থনীতি অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেক ক্ষেত্রে প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। উৎপাদন প্রক্রিয়াও অনেক  ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনেক কল-কারখানা  বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর রাশিয়া এবং ইউক্রেন যুদ্ধের বিশ্বব্যাপী প্রভাব কিন্তু বাংলাদেশকেও এফেক্ট করেছে। কারণ বিশ্বব্যাপী প্রতিটা পণ্যের দাম বেড়ে গেছে বিশেষ করে আমরা যে পণ্যগুলো বেশি আমদানি করি- যেমন খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল আর জ্বালানি তেল। এই পরিস্থিতির প্রতিঘাত আসে আমাদের কোভিড জর্জরিত অর্থনীতিতে। অন্যদিকে আমাদের বর্তমান যে পরিস্থিতি অন্তঃস্থ এবং বহিঃস্থ দুই দিকের সংমিশ্রণের ফলাফল। আর্থিক খাতের দুর্বলতা এই সময় আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। সব কিছু মিলিয়ে আমার মনে হয় যে অন্তঃস্থ এবং বহিঃস্থ কারণেই আজকের এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

জুলিয়া: আপনি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ছিলেন অনেক দিন। টাকার মান এবংরিজার্ভ কমে যাওয়ার পর অনেকে এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি ব্যবস্থাপনার দূর্বলতার কথা বলছেন। আপনি কি বলবেন? 

ড. মুজেরি: আপনি যেটা বললেন দুটো জিনিস- একটা হচ্ছে টাকার মান কমে যাওয়া আরেকটা রিজার্ভ কমে যাওয়া। টাকার মান মানে কি? এক্সচেঞ্জ রেট যেটাকে আমরা বলি এটাইতো সাধারণভাবে আমরা টাকার মান হিসেবে চিন্তা করি।  যেটাকে আমরা মুদ্রার পারচেজিং পাওয়ারও বলি। অর্থাৎ আমরা ১ টাকা দিয়ে কি পরিমাণ দ্রব্য কিনতে পারি ।দেশের  ভিতরে টাকার মানটা কমে যখন জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। কারণ তখন আমি একই জিনিস কিনতে গেলে আমাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিতে হয়। আমাদের ইন্টারনাল ইকনোমিতে এখন টাকার মানটা কিন্তু মূল্যের নির্ভর করছে স্বাভাবিকভাবেই। আর বিদেশের সঙ্গে টাকার মান অর্থাৎ ডলারে টাকার ভ্যালু কত সেটা কিন্তু অনেকগুলো ফ্যাক্টরের উপর নির্ভর করে। বড় ফ্যাক্টর হচ্ছে বৈদেশিক লেনদেনে আমাদের কি পরিমাণ শক্তি আছে। শক্তি বেশি হবে যখন আমরা এক্সপোর্ট  বেশি করব ইমপোর্ট কম করব। এখন এক্সপোর্ট ও রেমিট্যান্স আয়ের পরিমাণ যদি ইমপোর্টে ব্যয়ের চেয়ে কম হয় তখনই আমার ডেফিসিট বা ঘাটতি হয়ে যাচ্ছে। আবার আমি যাদের সঙ্গে ব্যবসায় করছি তাদের ইনফ্লেশন রেট বা মূল্যস্ফীতির হার আমাদের দেশের মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে যদি বেশি হয় তখনও আমাদের মুদ্রার মান বিদেশি বাজারে কমে যাবে। এটিকেই আমরা অর্থনীতির ভাষায় বলি রিয়েল এক্সচেঞ্জ রেট অর্থাৎ প্রকৃত বিনিময় হার। রেমিট্যান্সের মাধ্যমে যে ডলারটা আসে সেখানেও একটা অস্থিরতা চলছে । সংকটের আগে এটা উর্ধ্বমুখী ছিল এখন সেভাবে বাড়ছে না। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য বেশি হয়ে গেছে বলেই আমাদের ডমেস্টিক মার্কেটেও টাকার মানটা কমছে।

জুলিয়া: এক্ষেত্রে কি আপনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি ও ব্যবস্থাপনায় কোনো ভুল বা দূর্বলতা দেখেন না?

ড. মুজেরি: বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিকে আমরা মনিটরি পলিসি বলি। বাংলাদেশ ব্যাংক ইনফ্লেশন এবং অন্যান্য কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে এই মুদ্রানীতির মাধ্যমে। সরকারের যেমন নীতি আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি হচ্ছে মুদ্রানীতি। সেই নীতি বাস্তবায়নে কতগুলো হাতিয়ার লাগে। বাংলাদেশ ব্যাংক  সাধারণত এর ব্যাংক রেট পরিবর্তন করে রেপো রেট পরিবর্তন করে মুদ্রা সরবরাহ এবং চাহিদাকে৷ কন্ট্রোল করে মূল্যস্ফীতিটাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। বাংলাদেশ ব্যাংক রেট বাড়িয়ে দিলে দেশে মুদ্রা সরবরাহ কমে যাবে। মুদ্রা সরবরাহ কমা মানে ক্রেডিট কমে যাবে আর ক্রেডিট যদি কমে তবে অর্থ সরবরাহ কমে যাবে। অর্থ যদি কম থাকে তখন গ্রাহক কিনতে পারবে না। ফলে চাহিদা কমবে এবং আমাদের মূল্যস্ফীতিটা কমবে। এখন আমাদের দেশে সমস্যাটা হচ্ছে নানা চ্যানেলে নানা সমস্যার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই হাতিয়ার অর্থনীতিতে এফেক্টিভলি কাজ করে না।


জুলিয়া: আমাদের আমদানি ও রপ্তানিতে ঘাটতি কি বড় ধরনের? হলে তা কেনো?  

ড. মুজেরি: দেখেন বাংলাদেশকে প্রতিটি জিনিস এখন আমদানি করতে হচ্ছে, খাদ্যপণ্য ও জ্বালানি থেকে আরম্ভ করে হেন জিনিস নাই যা আমদানি করতে হচ্ছে না আমাদের। দেশের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুত, উন্নয়নের ফলে দ্রুত প্রবৃদ্ধির ফলে আমাদের ডোমেস্টিক প্রোডাকশন সেই গতির সাথে তাল রেখে আমরা বাড়াতে পারছি না। তাই আমদানির চাহিদা শুধু ক্যাপিটাল গুডসে বা ইন্টারমিডিয়েট গুডসে আটকে থাকছে না। ভোগ্যপণ্য বা কনজ্যুমার গুডসে আমরা অনেক বেশি আমদানি নির্ভর হয়ে পড়েছি-এটাই বাস্তবতা। আগে যারা দরিদ্র জনগোষ্ঠী ছিল এখন কিন্তু তারা মধ্যম আয়ের শ্রেণীতে। এই শ্রেণীটা কিন্তু দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এরা কিন্তু খুব দ্রুত জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে চায়। হাউজহোল্ড গুডস- ফ্রিজ টেলিভিশন থেকে শুরু করে সব সামগ্রীর চাহিদা খুব দ্রুতগতিতে বাড়ছে কারণ আমাদের মিডল ক্লাস দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এটা সবখানেই হয় এটাকে আটকানোর কোনো কারণ নাই। অল্প আয়ের অবস্থা থেকে যখন উন্নতি হয় মানুষের তখন খুব তাড়াতাড়ি জীবনযাত্রার মান বাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করে তারা। তাই আমাদের আমদানির পরিমান দ্রুতগতিতে বেড়েছে। রপ্তানি কিন্তু তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। এর বড় কারণ শুধু রেডিমেড গার্মেন্টসে রপ্তানি নির্ভরতা। আমাদের, ৮০-৮৫ শতাংশ এক্সপোর্ট রেডিমেড গার্মেন্টসে। এমন দূর্বলতা এই সংকট না আসার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকই বলেন বা সরকারের নীতিনির্ধারক বলেন এনিয়ে কোন ধরনের প্রচেষ্টা ছিল বলে মনে হয় না। আমদানির রাশ টেনে ধরার প্রচেষ্টাও ছিল না।

জুলিয়া: তার মানে কি দূরদর্শিতার অভাব ছিলো?

ড. মুজেরি: কিছুটা হলেও বলা যায় এই চিন্তাভাবনা নীতিনির্ধারকদের মাথায় ছিলো না। এখন হঠাৎ করে হয়েছে। আমাদের রিজার্ভ গড়তে সাহায্য করেছিল রেমিট্যান্স তা কিন্তু আগের মত বাড়ছে না। আমাদের সরকারি এক্সচেঞ্জ রেট এবং কার্ভ মার্কেটে বা হুন্ডির রেট এই দুইটার মধ্যে পার্থক্য যদি বেশি হয় তখন যারা বিদেশ থেকে অর্থ পাঠায় তারা কিন্তু সরকারি চ্যানেলে পাঠানোর চেষ্টা করে না তারা তখন হুন্ডির মাধ্যমে পাঠায় যেটা হয়ত এখন বেশি হচ্ছে। আমাদের রিজার্ভে  ২৪-২৫ বিলিয়ন ডলার এখন ব্যবহারযোগ্য। এতে  তিন-চার মাসের ইমপোর্ট চাহিদা মিটতে পারবে মানে এখন আমরা থ্রেশহোল্ডের কাছাকাছি চলে এসেছি। কাজেই এখন প্রয়োজন হচ্ছে কনজিউমার গুডস আমদানি কমিয়ে আনার চেষ্টা করা। সেটা কিছুটা হলেও কমেছে। আশা করা যায় আগামী ২ মাসের মধ্যে এটা আরো কমলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে চাপও কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবো।

জুলিয়া: অনেক দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াচ্ছে এখন! বাংলাদেশ ব্যাংকের কি করা উচিত- আপনার পরামর্শ কি? 

ড. মুজেরি: বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি হার যেটা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক খাত কন্ট্রোল করে এগুলো কিন্তু এডজাস্ট করেছে বা বাড়িয়েছে। তবে এর কার্যকারিতা বাংলাদেশে খুব সীমিত। আপনি উন্নত দেশগুলোতে দেখেন সেখানকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি নীতি হার পরিবর্তন করে সঙ্গে সঙ্গে দেশের সব সুদ হারে একটা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়-হয় কমে বা বাড়ে। ট্রান্সমিশন চ্যানেল সেখানে খুব কার্যকর। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষেত্রে বাস্তবতা হচ্ছে যে এই কার্যকরীতার অভাব আছে। অর্থাৎ এই চ্যানেলগুলো খুব স্ট্রং না। খুব কাজ করেনা। কাজেই বাংলাদেশ ব্যাংক তার নীতি সুদ হারগুলো পরিবর্তন করতে পারে তবে যেমন আশা করেন সেই ধরনের ফলাফল হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নাই। অর্থাৎ নীতি সুদ হারগুলো পরিবর্তন অনেকটাই অকার্যকর হাতিয়ার হয়ে গেছে আমাদের বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে। আমরা যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাই তাহলে আমাদেরকে দেখতে হবে মূল্যস্ফীতির আসল কারণটা কি। এটা কি সরবরাহ ঘাটতির কারণে ঘটছে নাকি চাহিদা বৃদ্ধির কারণে তা অনুসন্ধান দরকার আছে। তবে কারণটা দূর করার নীতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতার মধ্যে নাও থাকতে পারে। সেটা অন্য কোন মন্ত্রণালয় বা সরকারের অন্য কোন এজেন্সির হাতে থাকতে পারে।

জুলিয়া: বর্তমান গভর্নর একজন সাবেক আমলা, আগেরজনও তাই। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি ব্যবস্থাপনায় আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কোন প্রভাব দেখছেন কি আপনি! অর্থনীতিবিদ হিসেবে আপনার মন্তব্য কি? 

ড. মুজেরি: নীতি আসলে বাংলাদেশ ব্যাংকেরই হোক বা অন্য নীতি নির্ধারণী সংস্থা, পরিকল্পনা কমিশন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের বা যেকোনো মন্ত্রণালয়ে হতে পারে। বাস্তবতাটা হচ্ছে, একটা দেশের নীতি নেওয়ার প্রক্রিয়াটাই আসল জিনিস। সঠিক নীতি তৈরি বা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কার্যকরী পন্থা হচ্ছে রিসার্চ। এপ্লাইড রিসার্চ অর্থাৎ সঠিক গবেষণা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে সমস্যাগুলো দূরীকরণের জন্য বা কাঠামোটাকে উন্নত করার জন্য কি ধরনের নীতি নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কি বাংলাদেশে গবেষণাভিত্তিক সঠিক নীতি নেয়ার দিকটা দুর্বল। আমরা নীতিগুলোকে অনেক সময় এডহক ভিত্তিক গ্রহণ করি। কোন দেশে বিশেষ করে সামষ্টিক অর্থনীতির নীতি প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তাই সঠিক নীতি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জুলিয়া: আরেকটু স্পেসিফিক যদি জানতে চাই- আমলা গভর্ণরদের সময়ের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি আপনার কাছে কেমন মনে হচ্ছে?

ড. মুজেরি: আসলে গভর্নর সাবেক আমলাই হোক বা যাই হোক না কেন তিনিতো নীতি প্রক্রিয়ার বাইরে নন। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের কথা বলছি না সর্বক্ষেত্রেই এখন জেনারেলিস্টরাই কিন্তু নীতিনির্ধারণ ও সবকিছুতে মূল ভূমিকা পালন করছে। এখানে স্পেশালিস্টের কোন প্রয়োজন হয় না। এটাই কিন্তু বাস্তবতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে অনেক সাবেক আমলা গভর্নর ছিলেন। আমলা হওয়াটা কিন্তু দোষের নয়, সমস্যাটা হচ্ছে আমি নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াটা কিভাবে করছি। যদি আমি দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গিতে সঠিক নীতিটা বাছাই করে সেটা ব্যবহার করতে পারি তাহলে কিন্তু তার সুফল পাবো। অতীতে অনেকে সেটা করেছেন। কাজেই আমলা হওয়াটা আমি দোষের কিছু দেখি না। ব্যক্তিকে টার্গেট না করে নীতি প্রক্রিয়াকে উন্নত করলে আমরা সুফল পেতে পারি।


জুলিয়া: আর্থিক খাতের দুর্বলতা,জালিয়াতি,খেলাপি সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে বছরের পর বছর! এখন আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংক চাচ্ছে এখানে সংস্কার হোক তারা ঋণের শর্ত দিচ্ছে এগুলো। এ নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ কি? 

ড. মুজেরি: সংস্কার একটা চলমান প্রক্রিয়া এবং পৃথিবীর সব দেশেই তা করে। আমাদের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে আর অর্থনীতি এগিয়ে গেলে পুরনো ধ্যান-ধারণা, পুরনো হাতিয়ারগুলো সময়ের সাথে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন আছে সর্বক্ষেত্রেই- এটাকে চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। ডায়ানামিক অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশে দ্রুতগতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশ হবো আমরা টার্গেট করেছি তা মাথায় রেখে সংস্কার প্রক্রিয়া চলমান হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আপনি যদি অতীতে দেখেন, সংস্কার যখন ইমপোজড হয়েছে তখনই আমরা সেটা প্রতিপালন করেছি। আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকে ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর  রিফর্ম প্রোগ্রাম বাংলাদেশ ব্যাংক বাস্তবায়ন করেছে ৷ সেগুলো কিন্তু ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও আইএমএফ থেকে যখন শর্ত হিসেবে দেওয়া হয়েছে তখনই আমরা প্রতিপালন করেছি। এটা চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে হওয়া উচিত ছিল। আইএমএফ বা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের থেকে চাপিয়ে দেওয়া নয়। এখন যেহেতু আইএমএফ থেকে ঋণ চাচ্ছি, আইএমএফ সম্মত হয়েছে তাই ঋণের শর্ত হিসেবে সংস্কার  প্রতিপালন করতে হবে। আমাদের ঋণখেলাপি  নানা ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি, জালিয়াতি-এগুলোতো ১-২ দিনে হয় নাই বছরের পর বছর আমরা শুনছি। এখন আমাদের নিজস্ব উন্নয়নের জন্যই সংস্কারটা বেশি প্রয়োজন। আমাদের বাস্তবতা হচ্ছে চাপিয়ে না দিলে আমরা করতে চাই না। কারণ এক্ষেত্রে কঠিন সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হয়। যেমন আপনি বললেন আমাদের ব্যাংক খাতে একটা বড় সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণ, এটাতো একদিনে হয়নি এই সমস্যাতো সেই সত্তর ও আশির দশকের থেকে ফেস করছি, বিভিন্ন সংস্কার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু আমরা সফলতা অর্জন করতে পারিনি। আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দেখেন।  এখন আমাদের খেলাপি ঋণ অনেক বেশি হয়ে গেছে-  কোন দেশেই ব্যাংকে এতো খেলাপি ঋণ নাই। ব্যাংকের স্বাস্থ্যের জন্য এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর- ক্যান্সারের রোগ। ক্যান্সার নিয়ে আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থাতো উন্নয়নে সহায়ক হবে না। তাই ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের আইনগুলো আমরা বাস্তবায়ন করিনি। আমরা বারবার খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন করেছি একেকবার একেকভাবে পরিবর্তন করেছি। কেন পরিবর্তন করেছি? যারা খেলাপি তাদের স্বার্থেই করেছি। খেলাপি ঋণের সংজ্ঞাতো একটা স্ট্যান্ডার্ড সংজ্ঞা হওয়া উচিত সাদাকালোর মতো পরিষ্কার-এরমধ্যেতো অস্পষ্টতা থাকার কথা না। আমরা নিজের স্বার্থেই এই অস্পষ্টতা তৈরি করেছি এবং পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছি খেলাপি ঋণ টাই বাস্তবতা হয়ে গেছে। যারা খেলাপি ঋণ পরিশোধ করেনি তাদের কিন্তু শোধ করার ক্ষমতা আছে। কিন্তু আমাদের আইন কাঠামো বলেন বাস্তবায়ন ক্ষমতা বলেন বা যে কারণেই হোক ঋণগুলো আমরা আদায় করতে পারছি না বা করছি না। এখন আমরা নিজেরাও যেহেতু করছি না তাই আইএমএফ এর শর্তে হতে পারে। খেলাপি ঋণ নিয়ে আমাদের ব্যাংক খাত কখনো এগিয়ে যেতে পারবে না। আমরা উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবো না। এখন প্রতিজ্ঞা নেওয়া উচিত যে আমরা খেলাপি ঋণ বর্জন করবো।

জুলিয়া: বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দারিদ্র ও বৈষম্য পরিস্থিতি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ জানতে চাই! 

ড. মুজেরি: প্রথমে যদি বলি, বাংলাদেশে আমরা যেভাবে দারিদ্র পরিমাপ করি অর্থাৎ আমরা যেটা কে বলি চরম দারিদ্র্য এটা কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত  আমরা সাফল্যজনকভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। স্বাধীনতার পরে প্রায়  ৬০/৬৫ শতাংশ ছিল দারিদ্র্যের হার, যেটাকে এখন আমরা প্রায় ২০-২৩-২৪ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। এটা বড় সাফল্য, তাতে সন্দেহ নেই।  এখন এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে এই দারিদ্র্য দূর করা। কোভিড এর আগ পর্যন্ত মোটামুটি সাফল্যজনকভাবেই আমরা এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কোভিডের কারণে দারিদ্র্যের হার কিছুটা বেড়ে গেছে। অর্থনৈতিক ও অন্যান্য কারণে। তবে কোভিডের কারণে যে দারিদ্র্য বৃদ্ধি সম্ভবত সাময়িক। কোভিডের কারণে যারা দারিদ্র সীমার নিচে নেমে গেছে তারা হয়তো আবার উপরে উঠে আসতে পারবেন। আমি আশাবাদী ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হবো।

জুলিয়া: কিন্তু আয় বৈষম্য? ধনীরা ধনী হচ্ছে,গরীবদের অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে- এতো ব্যবধান বিশ্বের অন্য কোনো দেশে নেই। এটা কিভাবে দেখেন আপনি?

ড. মুজেরি: এখনো আমাদের দেশের প্রায় ১২-১৩ শতাংশ লোক চরম দারিদ্র যার জন্য আমাদের ব্যবস্থা নিতেই হবে। আর বৈষম্যটাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রথমত একটা দেশ যতো উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যায় বৈষম্যটাও কিন্তু ততো বাড়তে থাকে। একটা সীমা পর্যন্ত এই বৈষম্য বাড়ে। তারপরে ধীরে ধীরে তা কমে আসে। কেন বৈষম্য বাড়ে? প্রবৃদ্ধি যখন ঘটে অর্থনীতিতে সুযোগ বৃদ্ধি পায়-কর্মসংস্থান ও অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। তবে সুযোগ বৃদ্ধি পেলেই হবে না। দেখা যায়, যারা উপরের দিকে থাকেন, যারা হয়তো শিক্ষিত, যাদের  অর্থ প্রতিপত্তি আছে, শহরে বাস করে এই উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীরই সুযোগগুলো গ্রহণ করার ক্ষমতা তাদের বেশি।

জুলিয়া: আপনার কি মনে হয় না যে আমাদের নীতিকাঠামোটাই ধনীবান্ধব! এটা গরিবের দিকে যায় না, তাদের নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি না? 

ড. মুজেরি: আমাদের দেশে না সব দেশেই যদি বলি, উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় কতগুলো দিক রয়েছে একটা দিক হচ্ছে ।আরবান বায়াজ। শহরের লোকরা বেশী সুবিধা পায় গ্রামের লোকদের তুলনায়। আবার রিচ বায়াজ থাকে এতে ধনীদের সুবিধা বেশি হয়। এর বড় কারণ হচ্ছে উন্নয়নের সঙ্গে বা উন্নয়ন প্রক্রিয়ার এবং নীতির সাথে জড়িত সুবিধাভোগী শ্রেণীই নীতি গ্রহণ করে। তাই উন্নয়ন নীতিগুলো গ্রহণ ও বাস্তবায়ন যারা করছেন তারাই সুবিধাভোগী! গরিব শ্রেণী অংশগ্রহণ বা পার্টিসিপেশন নাই। আমি যদি উচ্চ শ্রেণীর হই এবং আমি যদি নীতি প্রণয়ন  করি, আমি আমার শ্রেণীর স্বার্থেই তা নিবো, আমার নিজের স্বার্থ না হলেও আমার শ্রেণীর স্বার্থ আগে আসবে!


জুলিয়া: আয় বৈষম্যের ক্ষেত্রে সমগ্র দেশটা নিয়েইতো আসলে চিন্তা করা দরকার-তাই না?

ড. মুজেরি: আপনি যেটা বললেন সমগ্র দেশকে নিয়ে চিন্তা করা- আমাদের নেতৃত্বের মধ্যে সেটা থাকতে হবে।  আমি মনে করি আমাদের নেতৃত্বের মধ্যে তা আছে এটা। কিন্তু এটা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার প্রশ্নটাই বড়? সবাইকেই সামগ্রিক দেশ নিয়ে চিন্তা করতে হবে-আমরা যেটা এসডিজিতে বলি লিভিং নো ওয়ান বিহাউন্ড। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে কিন্তু আমরা উন্নয়নের আওতায় আনতে পারি নাই। তাদেরকেইতো বেশি গুরুত্ব দিতে হবে-যেটাকে বলে পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশন। যেমন নারীদের ক্ষেত্রে আমরা বলি কি পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশন দিতে হবে, কোটা সিস্টেম করতে হবে। তারা পিছিয়ে আছেন তাদেরকে সামনে আনার জন্য তাদেরকে সহযোগিতা দিতে হবে। আয় বৈষম্যের কারণ হচ্ছে যাদের বিত্ত আছে, ক্ষমতা আছে তারা যে গতিতে তাদের আয় বাড়াচ্ছেন দরিদ্ররা সেই গতিতে আয় বাড়াতে পারছেন না তারা পিছিয়ে পড়ছেন। ফলে  বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জুলিয়া: বৈষম্যের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়ইতো সবচেয়ে বেশি-তাই নয় কি? 

ড. মুজেরি: অবশ্যই! এখানে রাষ্ট্রকেই মূল ভূমিকা পালন করতে হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উপরে উঠাতে সহযোগিতা দরকার এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ। সুযোগগুলো তাদের গ্রহণ করার মতো  নীতিকাঠামো দরকার-  তাদের শিক্ষা থেকে আরম্ভ করে সব ক্ষেত্রে সেগুলো আমাদের দিতে হবে।

জুলিয়া: বৈষম্যের নগরায়নও কিন্তু স্পষ্ট- স্পেসিফিক যদি বলি- ঢাকা শহরে যারা বাস করছে গরীব এবং মিডল ক্লাস, তাদের সাথে ধনীদের তফাৎটাও কিন্ত অনেক বেশি। এমনটা কি হওয়ার কথা? 

ড. মুজেরি: অবশ্যই না। আমরা যদি আয় বৈষম্যের কথা চিন্তা করি আমরা আয় বৈষম্য মেজার করি কিভাবে? বিবিএস এর হাউসহোল্ড ইনকাম এক্সপেনডিচার সার্ভিস যেটা হয় ৫ বছর পর পর হয় সেখানে আয়ের বৈষম্য মাপা হয়। এছাড়া আর কোনো উপায় আমরা পাই না তাই এটাকে বলি রিপ্রেজেনটেটিভ৷ এখানে কিন্তু এভারেজ বা গড় আয় বৈষম্য মেলে। স্পেসিফিক পিকচার আসে না কারণ গড়টা আসে সবার মিলিয়ে। কাজেই নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত বা যারা বস্তিতে বাস করেন এদের আলাদা আলাদা আয় বৈষম্য কিন্তু আমাদের জানা নেই। আপনি যদি একজন উচ্চবিত্ত  মানুষের কাছে তার আয় কত জানতে চান আপনি কি তার সঠিক তথ্যটি পাবেন? এর মানে হলো প্রকৃত বৈষম্য মাপার নির্ভরযোগ্য তথ্যও কিন্তু অপ্রতুল। 

জুলিয়া: আমরা কাগুজে হিসেবে না যাই- আপনার আমার আশেপাশে আমরা কি দেখছি-ধনী আরো ধনী হচ্ছে সুইস ব্যাংকে তাদের টাকা জমছে আরও কোথায় রাখবে সে জায়গা খুঁজছে। আর জনগোষ্ঠির  অনেকে সপ্তাহে এক দুই দিন মাছ, মাংস খেতো এখন তাও খেতে পারছে না। এখানে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভূমিকা দরকার ছিল, নীতিকাঠামোও ওরকম হওয়ার কথা ছিল যেনো আয়টা বাড়লে সবারই বাড়ে। সেটা কি আসলে হয়েছে? 

ড. মুজেরি: হা এটাই তিক্ত বাস্তবতা।  আপনি যেভাবে, যে অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে বললেন আমার মনে হয় আমরা সবাই শেয়ার করা দরকার। আসলেই ধনী আরো ধনী হচ্ছে গরীব আরো গরীব হচ্ছে। এর কারণটা কি? একটা বড় কারণ সুশাসনের অভাব। আপনি দেখেন ধনীদের যে পরিমাণ আয়কর দেয়ার কথা সেটা দিচ্ছে না। আয় গোপন করছে ইনকাম। কারণ ইনকামটা ট্রান্সপেরেন্ট না। আয়টা দেশে থাকলেও বিভিন্নভাবে গোপনীয় থাকছে আবার বিদেশেও পাচার হচ্ছে অনেক সময়। এটা প্রদর্শিত আয় না অপ্রদর্শিত আয়। সুশাসনের অভাব বা করাপশনের ফলে এই অপ্রদর্শিত আয়ের সঞ্চয় উপরের শ্রেণীতে ক্রমাগত বেড়ে গেছে। একটা শ্রেনী যদি অর্থ বেশি শোষণ করে অন্য শ্রেণীর পরিমাণ কমতে থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। কাজেই যার  ক্ষমতা আছে প্রতাপ আছে, যার সুযোগ আছে তারা তা পুরোপুরি ব্যবহার করছেন আয় বৃদ্ধির জন্য। সেটা হোক বৈধ পথে বা অবৈধ পথে। তাই আয় বৈষম্য ক্রমাগত বেড়ে চলছে।  তো এখান থেকে উত্তরনের উপায় কি? উত্তরণের একটি উপায় হচ্ছে যে আমাদের সুশাসন কায়েম করতে হবে। সুশাসন যদি থাকে আইনের যদি সঠিক প্রয়োগ করতে পারি সবার জন্য যদি আইন সমান করতে পারি তাহলেই সম্ভব। বাস্তবতা হচ্ছে এটা কিন্তু পৃথিবীর কোথাও একদিনে ঘটেনি। এটা একটা প্রক্রিয়া-আমাদের যেটা সবচেয়ে বড় দরকার তা হচ্ছে আমাদের স্ট্রং একটা ডিসিশন লাগবে যে আমরা এই প্রক্রিয়াটা শুরু করব। প্রক্রিয়াটাকে শুরু করাই হচ্ছে বড় কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রক্রিয়াটা এখনও সঠিকভাবে শুরু করেছি বলে মনে হয় না। আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেন্জ কখন এই প্রক্রিয়াটাকে শুরু করব এবং কত দ্রুত এটা আমরা বাস্তবায়ন করতে পারব। আমরা আজকে বলি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন বা সবাইকে নিয়ে উন্নয়ন করব কিন্তু সুশাসন এর বড় প্রিকন্ডিশন। পূর্বশর্তটাকে যদি আমরা প্রতিপালন না করতে পারি তাহলে কিন্তু অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন করতে পারব না। তা যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করতে পারবো ততো তাড়াতাড়ি আমরা অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব।

জুলিয়া: উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা পরিস্থিতিতে ২০২৩ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আপনি কোথায় দেখছেন। আপনার আগাম পরামর্শ কি?

ড. মুজেরি: ২০২৩ সালে বিশ্ব কেমন হবে তা এখনও অনেকটাই অনিশ্চিত কারণ এখনও রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হয়নি আর কবে হবে সেটাও আমরা জানি না। আমরা যদি বিশ্বের নানা সংস্থা-আইএমএফ বা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের পূর্বাভাস লক্ষ্য করি ২০২৩ সালের জন্য তারা আশাব্যঞ্জক পূর্বাভাস দেয়নি তাই বাংলাদেশেও সার্পোটিভ পরিবেশ আশা করা বোধ হয় এই মুহূর্তে ঠিক হবে না। কাজেই  আমাদের  নীতিগুলোকে, কৌশলটাকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে বিশ্ব মন্দার মধ্যেও আমরা আমাদের অর্থনীতিটাকে যতটা সম্ভব সচল রাখতে পারি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারি এবং আমাদের লক্ষ্যের দিকে যেন এগিয়ে যেতে পারি। আমাদের দূর্বলতাগুলো বিশেষ করে বহিঃস্থ অর্থনীতির ক্ষেত্রে যে দূর্বলতাগুলো দূর করে আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য যত দ্রুত সম্ভব অর্জন করতে হবে। যতো দ্রুত সম্ভব এটাকে সন্তোষজনক অবস্থায় নিয়ে আসতে হবে।  তার জন্য যা কিছু করণীয় দেরি না করে এখনই করতে। আর আমাদের মূল্যস্ফীতির লাগামটাকে আরো জোরে টেনে ধরতে হবে।  শুধুমাত্র মুদ্রানীতিতে নির্ভর করলে হবে না কারণ আমি আগেই বলেছি মুদ্রানীতির দূর্বলতাগুলো রয়েছে। এটা আমাদের দেশে সঠিকভাবে কাজ করার মতো পরিবেশ এখনও অর্জন করতে পারিনি। আমাদের ফিসক্যাল পলিসি, রাজস্ব নীতি শক্ত করতে হবে যাতে মূল্যস্ফীতি রোধে সহায়ক হয়। আমাদের একটা বড় দুর্বলতা হচ্ছে ট্যাক্স জিডিপি রেশিও। যা  ৯ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে বিগত ১ দশকেরও বেশি। এটাকে কিন্তু বাড়ানো সম্ভব এবং তার জন্য আমাদেরকে কিছু কঠিন বাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে হবে।  কর অবকাশগুলোকে রেশনালাইজড করলেই আমাদের ট্যাক্স জিডিপি রেশিও ডাবল ডিজিট হতে পারে। সার্বিক রাজস্ব খাত সক্ষম হলে এটা ১৮ শতাংশেও উন্নীত হতে পারে। কর অবকাশ না দিয়েও খাতগুলোকে সহায়তার আরো অনেক পদ্ধতি আছে আমরা সেগুলোতে দেই না কারণ আমরা ট্রান্সপারেন্ট না। বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে আমরা যা আমদানি করছি তার জন্য কোনো ট্যাক্স দিতে হচ্ছে না। পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে সহায়তা করার অনেক উপায় আছে যেগুলো স্বচ্ছ এগুলো না দিয়ে আমরা ক্ষতি করছি। 

আমরা যদি ২০২৩ সালে অর্থনীতিকে সঠিক পরিচালনা করতে চাই আমাদের অভিষ্ট লক্ষ্যে যেতে চাই তাহলে কিন্তু এই সিদ্ধান্তগুলো নেয়া আর দেরি করা উচিত হবে না। কঠিন সিদ্ধান্তের জন্য দৃঢ় নেতৃত্ব প্রয়োজন। আমাদেরকে এখনি এই সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে সেটা যত কঠিন হোক না কেন। আইএমএফ এর চাপেই হোক বা নিজের স্বার্থেই হোক যেটা প্রয়োজন আমাদের এগুলো করা দরকার। 

জুলিয়া: আপনাকে  ধন্যবাদ

ড. মুজেরি: আপনাকেও  ধন্যবাদ



একাত্তর/এআর