‘অনিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ সরকার ও সাধারণ মানুষের মাথা ভেঙে খায়’

অর্থনীতিবিদ এবং অর্থনীতির জনপ্রিয় কলামিস্ট ড. শামসুল আলম সরকারের পরিকল্পনা বিভাগে বড় আমলার কাজ করেছেন লম্বা সময় ধরে। আর সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই সরকার প্রধানের পছন্দে টেকনোক্রেট মন্ত্রিত্ব পেয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রায় আড়াই বছর। এবারও আশায় ছিলেন, তবে না হয়ে হতাশ নন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকার এবং নেত্রী শেখ হাসিনার দক্ষতা আর দূরদৃষ্টিতে এখনো অগাধ আস্থা তার। মন্ত্রীত্বের ভারমুক্ত হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর একাত্তর টেলিভিশনের জুলিয়া আলম - এর সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে অর্থনীতি, রাজনীতি ও ভূরাজনীতির বহুমাত্রিক আলাপ করেছেন, সাবেক এই পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।  

জুলিয়া: আপনি মন্ত্রিত্বে ছিলেন অল্প সময় কিন্তু অর্থনীতি পরিকল্পনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আপনার তাই আবার দায়িত্ব পাবেন বলে আশা ছিল অনেকেরই। জানতে চাই, সে আশা পূরণ না হওয়ার বিষয়টি আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?

ড. শামসুল আলম: ব্যক্তিগতভাবে আমি এমনটা ভাবিনি যে আমি চলতেই থাকবো-তা নাও হতে পারে। কিন্তু আরেকটি ভাবনাও ছিল যেহেতু পরিকল্পনার সাথে জড়িত ছিলাম, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলাম প্রায় বারো বছর। তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করেছি ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ২০১১ থেকে ২০১৫ এরপর সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাও করেছি ২০১৬ থেকে ২০২০। তারপর অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাও আমার নেতৃত্বে প্রণীত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও পরামর্শ নিয়েছি সবটাতেই। তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাংলাদেশে প্রথম বিশাল ডকুমেন্টস রূপকল্প ২০২১ সেটিতেও পুনরায় নেতৃত্বে দিয়েছি। রূপকল্প ২০৪১-সেটিও নেতৃত্ব দিয়েছি। সেই হিসাবে আমার ভাবনা ছিল যেহেতু নবম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করতে হবে নতুন সরকার এসেছে- আমি হয়তো ভেবেছি এজন্যই প্রধানমন্ত্রী আমাকে রেখেছেন এবং মন্ত্রিত্ব দিয়েছেন, এই পরিকল্পনার প্রয়োজনে হয়তো রাখতেও পারে। ভাবতাম আমার  অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগাতে চাইবেন হয়তো। আবার রাখবেনই এমনটা ভাবিনি।  

জুলিয়া: মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজেকে কোথাও কি কখনো অসহায় মনে হয়েছে। এমন কোনো কাজ যা ইচ্ছা থাকলেও করতে পারেননি? 

ড. শামসুল আলম:  আমার ওপরে বস একজন ছিলেন আপনারা জানেন। মান্নান সাহেব অত্যন্ত সহজ এবং হৃদয়বান মানুষ এবং ভালো লাগতো যে সমস্ত ফাইল তিনি চাইতেন আমার মাধ্যমে পরীক্ষিত হয়ে যাক। তিনি চাইতেন আমার ইনপুট আমার মতামত, চাইতেন আমি দেখে দিবো। টাকা পয়সার ব্যাপার, প্রকল্প আছে পরিকল্পনা কমিশনার হিসাবে এবং চূড়ান্তভাবে মন্ত্রী মহোদয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করি। তো ভালো লাগতো যে উনি সচিবকে মার্ক করে দিতেন যে প্রতিমন্ত্রীর মতামত চাই। আমি কৃতজ্ঞ যে উনি আসলে আমার মতামত ছাড়া সাধারণত কোনো ফাইল নিজে ফাইনাল করে ফেলতেন না। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমি সব সময় রাষ্ট্রীয় আইন দেখেছি। কোন অঞ্চল বা কোনো গোষ্ঠী দেখতাম না, দেখতাম দেশের স্বার্থ অর্জিত হবে কি না জনগণ উপকৃত হবে কিনা। এমন অনেক কিছু  বলবো অনেকেই কটু মন্তব্য করতে ছাড়ে না। ধরেন, একটি প্রকল্প ৪০০ কোটি টাকা। যখন জনশুমারি হবে সেখানে আমি বললাম যে স্পেসিফিকেশন দেখতে হবে।  ফাইলটা আমাকে না দেখিয়ে সরাসরি মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে দিয়ে দিলো। আমি অবাক হলাম ফাইলটা আমাকে পরিহার করে গেলো কেন আমি ভিতরে খুলে দেখলাম যে ফাইলে কি আছে? কারণ কি পরিহার করার? তো আমি সংশ্লিষ্ট সচিবকে বললাম ফাইলটা আমাকে না দিয়ে আপনি সরাসরি পাঠালেন যে স্যার তো আমার কাছে ব্যাক করেছেন। তিনি বললেন আমি তাড়াতাড়ি করেছি ক্রয় কমিটিতে যাবে তাই। আমি বললাম এটা কি আপনি ঠিক করেছেন?  তখন আমার একটু সন্দেহ হলো যে বিষয়টা কি। আমি পিছনে খুলে দেখি ফাইলে যে স্পেসিফিকেশন আমাদের যে তথ্য সংক্রান্ত ট্যাবলেট বলি সেটার যে স্পেসিফিকেশন বর্ণনা কোয়ালিটি নিশ্চয়তা ওইটা বদলে পত্রিকায় আসছে ভিন্নভাবে। এইটা যে চেঞ্জ হবে সেটারতো একটা বৈধ রেকমেন্ডেশন থাকতে হবে কোথাও কিছু নাই। আমি মন্ত্রী মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। যাক পরবর্তীতে এটা আবার ফিরে আসলো। এতে প্রায় আট থেকে নয় মাস পিছিয়ে গেলো আমাদের জনশুমারীর কাজটা আবার সেই পুরোনো অ্যাডভারটাইজ করতে হলো যেহেতু আগেরটা আইনসংগত ছিল না। এটা একটা বাস্তব উদাহরণ দিচ্ছি আপনাকে এতো ভেতরের কথা বলা ঠিক না যাহোক পরে এডভার্টাইজ দেয়া হলো। পরে যে ফার্ম পেলো তাতে ১৬৪ কোটি টাকা সরকারের বেঁচে গেল।

জুলিয়া: মন্ত্রীত্বের অভিজ্ঞতায় আর্থিক খাত নিয়ে আপনার ভিন্ন কি অভিজ্ঞতা হয়েছে। আসলে সেখানে ব্যবস্থাপনা বড় নাকি নীতির ভুলও আছে? 

ড. শামসুল আলম: আপনাকে বলি আমিতো প্রায় দেড় যুগ সরকারের সঙ্গে ছিলাম নভেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে কোভিডের যে সময় বা তার আগে আমরা সাফল্য দেখিয়েছি। এরপর রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কোভিডকালে সুন্দরভাবে আমরা কাজ করেছি প্রবৃদ্ধি হার হয়তো কমেছে কারণ লকডাউন করতে হয়েছে বাজার পুরোটা খুলতে দেই নি। সেটা জীবন বাঁচানোর জন্য। তারপর আমরা লকডাউন উঠিয়ে ফেললাম। অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় বড় রকম কোনো অদক্ষতা ছিল না কিন্তু রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের পরে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে গেলো হু হু করে।

জুলিয়া: আর তাতেই কি সব সমস্যার তৈরি হলো? আপনি কি মানতে চাইছেন না যে কোনো অব্যবস্থাপনা বা অদক্ষতা? নীতি যা আছে সব ঠিকঠাক? তাহলে এখন এই অবস্থার মধ্যে পড়লাম কেন?

ড. শামসুল আলম: যদি বলেন মূল্যস্ফীতি। হ্যাঁ এটা ঠিক কিন্তু কারো দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনার জন্য না, এটি বাহির থেকে আসা।

জুলিয়া: মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে যদি আর্থিক খাত নিয়ে বলি দেখেন আমাদের ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো উপক্রম হচ্ছে আমরা শুনতে পাই বিভিন্ন গণমাধ্যম সেই খবরগুলো আসে তারপর ঋণ খেলাপির নৈরাজ্য সবসময় ছিল।

ড. শামসুল আলম: আসলে নৈরাজ্য শব্দ ব্যবহার করা যায় না ঐটা আমরা হতাশ হয়ে বলি। নৈরাজ্য যদি হতো তাহলে শ্রীলংকার কি হলো। কোনো কিছু আমদানি করার জন্য ডলারই তাঁদের হাতে নাই। মূল্যস্ফীতি হু হু করে চলে গেলো চল্লিশ শতাংশে সেটি কি আমাদের দেশে হয়েছে? পাকিস্তানে এখনো বর্তমানে ২৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি আমরাতো এখনো কম। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদের সমস্যায় ফেলেছে। আপনি ঋণের কথা বলছেন ঋণের সমস্যা সেটার মূল কারণটা আমি বলি। অর্থনীতি চাঙ্গা হয় কখন যখন টাকা দিবেন। তারা কলকারখানা করবে শিল্প করবে তো সে কারণেই ঋণ বাড়ানো হয়েছে এটা তো অস্বীকার করা যাবে না ফলও পাচ্ছিলাম। এখন ঋণখেলাপি বেড়ে গেছে এটাও সত্য এবং সেটাও মনে রাখতে হবে ভারত আমাদের কাছের দেশ বা অনন্যা দেশ আছে তাঁদের চেয়ে খুব বেশি পিছনে পড়ে গেছি তা কিন্তু নয়। তবে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি আছে।

জুলিয়া: এখানে অব্যবস্থাপনা দেখেন না আপনি?

ড. শামসুল আলম: এটা আমি অবশ্যই স্বীকার করবো যে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় সাফল্য যেভাবে আসার কথা সেটা আসলে দেখা যায়নি বা আমরা পারিনি। কিন্তু দেখেন আমেরিকাতে তো তিনটা ব্যাংক একদম কলাপস করেছে আরো দুএকটা ব্যাংক করতেও পারে তো আমাদের কি কেমন হয়েছে? আমেরিকা পরিণত অর্থনীতি দক্ষতার অর্থনীতি সেই দেশে  তিনটি ব্যাংক একদম ধসে পড়লো সে হিসাবে বাংলাদেশ তো নৈস্যি।

জুলিয়া: এই যে দেশের বাইরে টাকা পাচার হচ্ছে এটাতো আপনাদের অজানা নয়।

ড. শামসুল আলম: টাকা পাচার আপনার সব দেশেই কম বেশি হয়। আমরা শুধু বাংলাদেশ যখন ভাবি মনে হয় যে বাংলাদেশের সব গেলো। শুনেন পানামা পেপারসে কতো দেশের কোটিপতি।

জুলিয়া: আমরা কি সান্ত্বনা খুঁজবো এইটা ভেবে?

ড. শামসুল আলম: সান্ত্বনা না। যেটা বলতে চাইছি টাকা পাচার হয়েছে। যখন রাজনৈতিক কোনো সংকট দেখা দেয় বা মানুষ সেফ মাধ্যমে টাকা রাখতে চায়। মানুষ হুন্ডিতে টাকা পয়সা বিদেশে নেয়, অনেকে এক্সপোর্টের প্রসিড সব দেশে  আনে না। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে এটার জন্য পদক্ষেপ কিন্তু দৃঢ়ভাবে নেয়া হয়েছে। আপনাকে এটি স্বীকার করতেই হবে। এক্সপোর্টারদের গত এক দেড় বছরে যেভাবে চেজ করা হয়েছে আপনাকে বলবো তবে হ্যা আমাদের দেশ এখানে যে দক্ষতা দেখাতে পেরেছে তা বলবো না।

জুলিয়া: এখানে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রশ্রয়ের একটা ব্যাপার কাজ করে যারা এই কাজগুলো করছে। তাই নয় কী?

ড. শামসুল আলম: রাজনৈতিক আশ্রয় প্রশ্রয় আছে কিনা জানিনা এটা তো ঐভাবে আশ্রয় প্রশ্রয়ের অভিযোগ আমরা করি ঠিকই এবং সেটা ধরা কিন্তু আসলেই কঠিন। কাগজপত্রতো ধরতে হবে। তবে আমরা আরো সতর্ক হতে পারি আরো তদারকি বাড়াতে পারি কোথাও কোথাও যে ব্যর্থতা নাই বা ছিল না তা একেবারে বলবো না রাজনৈতিক বিচার বিবেচনা থাকতেই পারে পুঁজিবাদ একটা দৈত্যরুপী একে ঠিক মতো নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে মাথা ভেঙ্গে খাবে সরকার আর সাধারণ মানুষের তো খাবেই।

জুলিয়া:  তার মানে আমরা বোধহয় না খুব ভালোমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি?

ড. শামসুল আলম: কোন কোন ক্ষেত্রে পারি নাই। আসলেই হয়তো ঐভাবে পারি নাই।  এই যে আপনি বললেন বেশ কিছু টাকা পয়সা দেশ থেকে চলে গিয়েছে। আগাম সতর্কতা ছিল না হয়তো আর ধরাটাও কঠিন এই বিশ্বে। কিছু কিছু ব্যর্থতা অস্বীকার করবো না যেমন ব্যাংক এর টাকা চলে যাওয়াতো চরম ব্যর্থতা। তো এজন্য কেউ না কেউ দায়ীতো হতেই হবে। এখন বিচারের আওতায় আনতে হবে।

জুলিয়া: সেটা কি হয়?

ড. শামসুল আলম: অনেক ক্ষেত্রেই হয় না। আর অনেক ক্ষেত্রে হয়ও। না হলে পরে সে সমস্যাগুলো থেকেই যায়।

জুলিয়া: একদমই সরকারের বাইরে, একজন দেশপ্রেমিক সাধারণ নাগরিক হিসেবে যদি আমি বলি যে আর্থিক খাতে নৈরাজ্য, খেলাপি সমস্যা নিয়ে আসলে আপনি কি বলবেন? একদম আপনার নিজস্ব মন্তব্য শুনতে চাই ভিন্ন কিছু সরকারের বাইরে থেকে বলছেন এমন।

ড. শামসুল আলম:  সরকারের ভিতর বা বাইরে না, আমি সরকারে থাকতেও অযৌক্তিকভাবে বলিনি কারণ  এটা আমার দায়িত্ব। কিন্তু সেটা করতে গিয়েও আমি সব সময় সতর্ক থেকেছি যে আমি অযৌক্তিক বা অবিশ্বাসী কিছু বলছি কিনা। আমি এটা কিন্তু করিনি। আমার আড়াই বছর মন্ত্রীত্বের আগের জীবনেও মিডিয়ায় প্রচুর গিয়েছি লেখালিখি করেছি পত্রিকায়। আমি এমন কিছু বলিনি যেটা তথ্যভিত্তিক নয় যেটা যুক্তিতে টেকে না কাজেই যেগুলো মন্ত্রী হিসাবে বলেছি এখনো সেভাবেই বলবো এখনো কোনো পার্থক্য দেখি না কারণ আমি সরকারে থাকতেও কিন্তু সবসময় চেষ্টা করেছি জনগণের দিক থেকে কোনটা সঠিক তা ভাবতে। সরকার আজ আছে কাল নাই। কাজেই যতক্ষণ আছি সঠিকভাবে সরকারকে সমর্থন দিয়েছি কিন্তু অযৌক্তিক কখনোই কিছু বলিনি কাজেই আমার বক্তব্য নিয়ে খুব একটা বিতর্ক হয়েছে বলে আমি দেখিনি।

জুলিয়া: আচ্ছা একটা বিষয় কি আপনি মানতে পারবেন যে আমাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা বা নীতিগুলো বলেন আসলে খুব একটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নয়। আমরা রিজার্ভ সংকটের মতো দুরবস্থায় কেনো পড়লাম?

ড. শামসুল আলম:  শুনেন কোভিড হবে বাংলাদেশে এর প্রক্ষেপণ কেউ  করতে পারে নি। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ হবে কীভাবে প্রক্ষেপণ করবে? বিশ্ব মন্দাও আগে কেউ প্রকাশ করতে পারেনি। ঘটে গেলে তখন প্রকাশ পেল। তখন সরকার এটা করতে পারে নাই ওটা করতে পারে নাই ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু যারা বলে তারাও কিন্তু প্রকাশ করতে পারেনি যে সরকার বিপদে পড়তে যাচ্ছে। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হতে যাচ্ছে এটা পত্রিকায় লিখা হয়েছে-এরকম আর্টিকেল আমরা দেখেছি। বাংলাদেশ কি শ্রীলঙ্কা হয়েছে?  আমরা ভালোর প্রশংসা করতেও কেনো জানি একটু সংকীর্ণ।

জুলিয়া: একজন রাজনীতিবিদ মন্ত্রীর সীমাবদ্ধতা আর টেকনোক্রেট মন্ত্রীর সীমাবদ্ধতা কীভাবে দেখেন? 

ড. শামসুল আলম: আপনি সুন্দর একটা প্রশ্ন করেছেন। আমি টেকনোক্রেট মন্ত্রী ছিলাম বিশেষজ্ঞ মন্ত্রী হিসেবে। দেখুন এখানে পার্থক্য আছে। রাজনৈতিক মন্ত্রীর অবশ্যই রাজনৈতিক জোর আছে যেটা হলো যে আমি জনগণের  প্রতিনিধি। জনগণের হয়ে কথা বলছি, সিদ্ধান্ত জনগণের সিদ্ধান্ত । কিন্তু আমি টেকনোক্রেট মন্ত্রী হয়ে আমার ভিতরে এই দুর্বলতা টা ছিল যে হ্যাঁ আমি মন্ত্রী হয়েছি সরকার দায়িত্ব দিয়েছে আমার সেবা চাচ্ছেন কিন্তু আমার মনে হতো আমিতো জনগণের প্রতিনিধি না কাজেই আমি যেভাবে বলছি সেটা কতোটা জনগণের অনুকূলে যাবে আর কতটুকু যাবে না।  আফটারঅল একজন টেকনো্ক্র্যাট  মন্ত্রী। টেকনোক্রেট মন্ত্রী অবশ্যই সরকার নিতে পারে বিশেষজ্ঞ মতামত ব্যবহার করতে পারে। আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী টেকনোক্রেট মন্ত্রী হয়েছেন প্রথমে।  জনপ্রতিনিধি হয়ে জোরেশোরে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় কিন্তু একজন টেকনোক্রেট মন্ত্রী বারবার চিন্তা করেন- আমিও করেছি আমার ভয় হতো যে আসলে সিদ্ধান্ত ঠিক নিচ্ছি কিনা।

জুলিয়া: এরকম কি হয়েছে যে আপনি এটা করতে চাচ্ছেন কিন্তু টেকনোক্রেট মন্ত্রী বলে বাধা পাওয়া, কটু  কথা শুনা কিংবা অন্য রকম একটা পরিবেশের মধ্যে আপনাকে পড়তে হয়েছে?

ড. শামসুল আলম: না এভাবে সরাসরি হয় নাই তবে অনেকেতো বিশেষ করে যখন রাজনৈতিকভাবে এলাকায় যেতাম তখন এই প্রশ্নটা অনেকে করতেন যে আপনিতো জনপ্রতিনিধি না। সিদ্ধান্ত আপনি নিবেন না আমার এলাকার সিদ্ধান্ত আমরা নেবো। তা আমি দেখতাম তাঁদের কথা কিন্তু সত্য-সিদ্ধান্ত সঠিক বেঠিক সেটা হলো ভিন্ন প্রশ্ন যৌক্তিক অযৌক্তিক সেটাতো অবশ্যই আছে কিন্তু জোরটা তাঁদের ছিল আমরা সিদ্ধান্ত নেবো। তো সেক্ষেত্রে আমি থেমে যেতাম।

জুলিয়া: আপনার দৃষ্টিতে এবারের মন্ত্রীসভা কেমন হলো? নতুন মন্ত্রীদের দুই মাসের কাজগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ড. শামসুল আলম: বড় কঠিন প্রশ্ন এবং বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন।

চট করে এটা বলা কিন্তু আসলে কঠিন। কারণ অন্তত তিনটি মাস সময় লাগবে বুঝতে কি পেরেছেন, কি পারেন নাই। এখনই মূল্যায়নের সময় আসেনি। মূল্যায়নে একটু সময় দিতে হবে আমাদের যেমন মূল্যস্ফীতি কত কমাতে পারছি এটাতে সময় দিতে হবে। এটাতো যৌথ পার্লামেন্ট সিস্টেম গভর্নমেন্ট তাই যৌথ সিদ্ধান্ত মেনে নেন সবাই। একক মন্ত্রী অনেক সময় একাই কিছু করতে পারে না করা উচিতও না এটা সামষ্টিক সিদ্ধান্তে বাস্তবায়িত হয়। এজন্য বস্তুনিষ্ঠভাবে যদি বলি তিন মাস না গেলে বলা ঠিক হবে না বলেই আমি মনে করি।

জুলিয়া: তারপরও যাদেরকে যে দায়িত্বগুলো দেয়া হয়েছে তাঁদের সম্পর্কেতো খানিকটা হলেও ধারণা আছে। খুব একটা যে নতুন সেটাও নয়। আসলে আপনার কাছে কি মনে হয় যে আসলে যথাস্থানে যথা মানুষ কি এসেছে?

ড. শামসুল আলম: শুনেন কে কীভাবে দায়িত্ব পালন করে আগে বলাও মুশকিল। অনেকে শিক্ষিত হয়েও দায়িত্বশীল হয় না। চেয়ারে বসলে পরে একজনের বুদ্ধিমত্তা অভিজ্ঞতা জ্ঞান,  চিন্তাধারা দেশের প্রতি তার উপলব্ধি সব মিলিয়ে একজন মানুষকে আগাম বলা যাবে না যে উনি ভালো বা খারাপ। পারফর্মেন্সতো দেখতে হবে। অনেকে পারফর্ম ভালো করে ফেলে যেটা বাইরে থেকে আগে মনে করতেন না কেউই। যাকে নেয়া ঠিক হলো না বলবেন দেখা গেলো সেই ভালো পারফর্ম করল। আবার অনেকের ধারণা যে উনি খুব ভালো করবেন খুব চটপটে সুন্দর বলেন দেখা গেলো আসলে তিনি ভালো করলেন না। এখন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সকলকেই। এখনই মন্তব্য করাটা বোধহয় খুবই আগাম হয়ে যাবে।

জুলিয়া: অর্থ মন্ত্রণালয় খুবই গুরত্বপূর্ণ এক মন্ত্রণালয়। সাবেক এক পররাষ্ট্র মন্ত্রী সেখানে এবার অর্থমন্ত্রী হয়েছেন। তাকে নিয়ে যদি একটু আপনার মূল্যায়ন শুনি?

ড. শামসুল আলম: কাজ না দেখে আগাম ধারণা করাটা খুবই কঠিন। হ্যাঁ তিনি কূটনীতিক হিসাবে ভালো করেছিলেন, তিনি স্বাধীনতার পক্ষের একজন ব্যক্তি, যুদ্ধের শুরুতে সে সময় ইয়ং অফিসার হয়েও তিনি স্বাধীনতার পক্ষ নিয়েছিলেন, সাহসী ভূমিকা ছিল তাঁর। তিনি অর্থনীতি পড়েছেন  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যদিও তা ব্যবহারিক করেননি। আশা করবো এবং আমি নিশ্চিত তার সরলতা নিয়ে কূটনৈতিক দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন নেই। এখন তিনি যদি মিলেমিশে মতামত নিয়ে পরামর্শ নিয়ে সহকর্মী এবং অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যান কেনো পারবেন না? পারার কথা, এখন বিষয়টা হলো তিনি কতটা অংশগ্রহণমূলক হবেন। অনেক দেশেইতো প্যানেল অব অ্যাডভাইজার্স থাকে তো অর্থমন্ত্রী চাইলে এরকম প্যানেলে আলাপ আলোচনায় যেতে পারেন এক মাস পর বা তিন মাস পর সবাইকে ডাকতে পারেন। অলিখিতভাবেও  কমিটি করতে পারেন। সেটা করলে বোধ হয় রাষ্ট্রের জন্য ভালো হবে  অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের জন্যও ভালো হবে। তিনি অর্থনীতি নিয়ে এরকম ইতিবাচক মতামত গ্রহণ করলে ভালো তো করবেন আশা করি। আমাদের হতাশার কিছু নাই।

জুলিয়া: দেশের খুব ভালো একটা সময় আপনি যেখানে ছিলেন এখন সেই মন্ত্রণালয়ে এসেছেন নতুন পরিকল্পনামন্ত্রী। নতুন মন্ত্রী ও তার কাজ নিয়ে একটু ছোট করে আপনার একটু মূল্যায়ন শুনতে চাইবো। তার প্রতি আপনার কোনো পরামর্শ আছে কী?

ড. শামসুল আলম: পরামর্শ একটাই উনি শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছিলেন তিনি বয়সেও অনেক অভিজ্ঞ তিনি যদি আলাপ আলোচনা করে পরামর্শ নিয়ে এবং সব চেয়ে বড় কথা সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেশকে রেখে স্বচ্ছতার সাথে আশাবাদী হয়ে কাজ করে তবে ভালো করবেনই। সবসময় ভাবতে হবে সমগ্র দেশটাই আমার এবং পরিকল্পনা মন্ত্রী কিন্তু একটি  গুরত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় বাণিজ্যের মতো অর্থের মতো পররাষ্ট্রের মতো। 

জুলিয়া: মূল্যস্ফীতি কমাতে এবার সরকার ঘোষিত অভিযান আসলে কেমন কাজ করছে বলে আপনার কাছে মনে হচ্ছে? সরকার অর্থ সরবরাহ টাইট করছে এবং আরো করতে চাচ্ছে এটা কি কাজে দেবে?

ড. শামসুল আলম: উৎপাদন খরচ কমাতে মূল্যস্ফীতি এখন আর এই চাহিদা তাড়িত না দেশের বাইরে পণ্যের দাম বাড়ছে। তাই আমাদের উৎপাদকরা আর কৃষকরাও দামটা বাড়িয়ে  চাইবেন। একজন ডিম উৎপাদক আগের দাম চাইবেন না কারণ তার উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। কাজেই উৎপাদন খরচতাড়িত মূল্যস্ফীতি কমাতে সময় নিতে হয়। আমাদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রযুক্তি দরকার ট্রেনিং দরকার যতটা সম্ভব উপকরণ আমদানি করে উৎপাদকদের দিতে হবে। সহজলভ্য করতে হবে। আমরা টাকার সরবরাহ কমিয়ে দিবো সেটা ঠিক আছে এবং এটাও মনে রাখতে হবে গত তিন মাস ধরে কমে আসছে মূল্যস্ফীতি। সবসময় বাজার বুঝতে হবে। সরবরাহের মূল্য সব সময় বুঝতে হবে। না বুঝে দাম বাড়ানোর দোষ দেবো ব্যবসায়ীদের? যথাযথ দোষ না দিয়ে অযথা দোষ দিলে তো হবে না। কাজেই এটাই বলবো যে মূল্যস্ফীতি কমাতে নানা পদক্ষেপে জোর দিতে হবে। উৎপাদন সার্বিকভাবে যেন বাড়ে শিল্পকারখানা বাড়ে  শিল্পোৎপাদন বাড়ে। এটা যদি করতে পারি আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে অবশ্যই আশা করা যায়। সরকারকে আরো দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে উৎপাদন বাড়াতে কিকি করা যায় সেই বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে।

জুলিয়া: আমাদেরতো সব পণ্যের দাম আকাশচুম্বী।

ড. শামসুল আলম: উৎপাদন খরচ যে বেড়েছে এটা আমি আপনাকে শুরুতেইতো বললাম সব দেশে উৎপাদন খরচ বেড়েছে কৃষক পর্যায়ে দাম কমে কেমনে? এটাতো আমাদের  মেনে নিতে হবে আমাদের আয় বাড়াতে হবে প্রয়োজনে আমাদের পুনর্বিন্যাস করতে হবে বেতন কাঠামো। কারণ মূল্যস্ফীতি দরদাম একবার বেড়ে গিয়েছে তা সহজে কমিয়ে আনতে পারবেন না।

জুলিয়া: সরকারতো বিভিন্নভাবে অভিযান চালাচ্ছে এতে করে কি আসলে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব?

ড. শামসুল আলম: অভিযানের বিষয়টা ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় না এটা সুচিন্তা বা সব তথ্যর ভিত্তিতে বা গবেষণামূলক।

জুলিয়া: নির্বাচনের আগে আমেরিকা ইউরোপ থেকে নানা রকম প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ ছিলো যেটি আসলে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করার শঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনের পরে তারাই আবার সহযোগিতার কথা বলছে এই নিয়ে আপনি কি বলবেন?

ড. শামসুল আলম: তারা আমার ধারণা একটু বেশি বাড়াবাড়ি করেছে কারণ একটি স্বাধীন দেশে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। হ্যাঁ এটাও ঠিক তারা গণতন্ত্রের কথা বলতে পারে মানবাধিকারের কথা বলতে পারে-এগুলো সার্বজনীন। স্বাধীনতার স্বাদ মানুষ কখনই পাবে না যদি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত না হয়। কাজেই মানবাধিকার নিয়ে কথা বলাটাও আমি অযৌক্তিক মনে করি না। যেটা অযৌক্তিক মনে করি তারা যেভাবে সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে ধমক দিতে চাচ্ছিল যেই সুরে এটা করতে হবে ঐটা করতে হবে এই নির্বাচন এইভাবে করতে হবে এইটা বোধহয় একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। পদ্ধতি নিয়ে তারা কথা বলতেই পারে তবে যেভাবে দৌড়ঝাঁপ আমেরিকার রাষ্ট্রদূত করছিল মনে হয়েছিলো তার দেশের  নির্বাচন। 

অবশ্যই আমেরিকা আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র বাণিজ্যে আমরা গার্মেন্টসের বড় একটা অংশ তাঁদের কাছে পাঠাই জ্ঞান বিজ্ঞান প্রযুক্তি অস্বীকার করা যাবে না কিন্তু এটাও ঠিক আমাদের মনে রাখতে হবে যে আমাদের দুর্দিনে পরম সংকটে কারা বন্ধু ছিল। চীন হোক ভারত হোক আমেরিকা হোক রাশিয়া হোক একটা ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক আমাদের রক্ষা করতে হবে।

জুলিয়া: তারা কি ভুল বুঝতে পেরেছে?

ড. শামসুল আলম: না না আমি যেটা বলি তাঁরা মুখে বলে অনেক কিছু-অনেক কিছু করে যেটা মুখে বলে না মুখে যেটা বলে তার উল্টো কাজ বহু করেছে পৃথিবীতে। সহযোগিতা তাঁদের করতে হবে সরকার বৈধ প্রতিষ্ঠিত এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকার আছে কাজেই আমেরিকা সহযোগিতা না করে তো উপায় নাই যাবে কোথায় সেই অর্থে আমরা বলবো আমেরিকার সহযোগিতা করতেই হবে।

জুলিয়া: আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. শামসুল আলম: আপনাকেও ধন্যবাদ।