সবল-দুর্বল একীভূতকরণে ব্যাংক খাত নিয়ে শঙ্কা

দেশের সবল ব্যাংকের সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকের একীভূত করার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে পুরো ব্যাংক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, ব্যাংক খাতে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তাতে একীভূত করায় সাময়িক রেহাই পাওয়া গেলে দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই হবে না। আর ব্যাংক খাতের ওপর বাড়তে পারে আস্থা সংকট।

এদিকে একীভূতকরণের খবরে এরি মধ্যে গ্রাহকদের অনেকেই আমানত তুলে নিতে শুরু করেছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

দেশে মোট ব্যাংকের সংখ্যা ৬০টি। এর মধ্যে সোনালী-রূপালী-জনতা ও রাকাবসহ আটটি সরকারি ব্যাংক। বিদেশি ব্যাংক ৯টি এবং বাকি ৪৩টি বেসরকারি ব্যাংক।

বর্তমান সরকারের সময়ে দুই দফায় ১২টিসহ মোট ২৬টি নতুন বেসরকারি ব্যাংক লাইসেন্স পেয়েছে।

কিন্তু সুশাসনের ঘাটতি ও পরিচালকদের হাজার কোটি টাকা ঋণ লোপাটের কারণে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর বেশ কয়েকটি মুখ থুবড়ে পড়েছে।

পরিচালনা পর্ষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চুর একক দুর্নীতির কারণে ভগ্নদশা শতভাগ সরকারি বেসিক ব্যাংক। এই ব্যাংকটি এখন বেসরকারি একটি সবল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করে দেওয়া হচ্ছে।

দুর্নীতি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে সবল ব্যাংকের সাথে দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার এই উদ্যোগে শঙ্কা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

Toufique

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী একাত্তরকে বলেন, বাজারই ঠিক করবে কতগুলো ব্যাংক প্রয়োজন।

কিন্তু যে যখনই বিপদে পড়ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মানে সরকার ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এখান থেকে ভালো রেজাল্ট আশা করা যায় না।

‘আর এখন যেটা করছেন, সেটা আরো খারাপ। সবগুলো ধ্বংস করে দিয়ে একীভূত করা হচ্ছে। এটা আসলে উত্তরণের জন্য করা না। এটা মূলত করা হচ্ছে মাফিয়ারা, যাদের কারণে ব্যাংকগুলো খারাপ, তাদের মুক্ত করার জন্য,’ মন্তব্য করেন এই বিশেষজ্ঞ।

চলতি এপ্রিলের চার তারিখে ব্যাংক একীভূত করার বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। অবশ্য তার আগেই বেসরকারি খাতের শরিয়াভিত্তিক এক্সিমের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে দুর্বল পদ্মা ব্যাংক।

আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার পর রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালীর সঙ্গে আরেক রাষ্ট্রায়ত্ত বিডিবিএল একীভূত করার অনুমোদন দুই কোম্পানির পর্ষদ।

বেসরকারি খাতের স্বাস্থ্যবান সিটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হচ্ছে ভগ্নদশার রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংককে। আর দেশের এক সময়ে বেসরকারি খাতের অন্যতম বড় ব্যাংক ন্যাশনাল যাচ্ছে ইউসিবির সঙ্গে।

এর বাইরেও দুর্বল রাষ্ট্রায়ত্ত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক একীভূত হচ্ছে আরেক রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সঙ্গে।

তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, পৃথিবীতে কয়টা উদাহরণ দেখাতে পারবেন যে, রেগুলেটররা চাপ দিয়ে একীভূত করিয়েছে। কোনো উদাহরণ নেই। এখানে জোর করে করছে।

‘এগুলো হচ্ছে একটা সাময়িক রেহাই পাওয়ার উপায় হিসেবে। কিন্তু এটা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না,’ পর্যবেক্ষণ এই বিশেষজ্ঞের।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাংক তৈরিতে দুর্বলকে একীভূতকরণ করা হচ্ছে।

bangladesh bank

মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মূলত দু'টি উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যাংক একীভূতকরণ নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

প্রথমত, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ফলে উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে কার্যকর ব্যাংকিং সেবা প্রদানের জন্য দেশে অধিক সক্ষমতা সম্পন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হবে যাতে করে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি না হয়।

দ্বিতীয়ত, অপেক্ষাকৃত দুর্বল ব্যাংকের বর্তমান সমস্যার সমাধান ও সবল ব্যাংকের কার্যক্রম উন্নয়নের মাধ্যমে আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা, যাতে করে জনস্বার্থে একীভূত ব্যাংক-কোম্পানি অধিকতর সেবা প্রদান করতে পারে।

তবে সরকারি ব্যাংকের সাথে বেসরকারি ব্যাংক কেনো একীভূত হচ্ছে এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলছেন অর্থমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী।

সরকারি বেসিক ব্যাংকের সঙ্গে মার্জ করা হচ্ছে সিটি ব্যাংকে এ বিষয়ে তিনি বলেন, তারা ওটা নষ্ট করে ফেলেছে, সেজন্য এটা করা হচ্ছে।  

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুশাসনের অভাবে এমনিতেই ব্যাংক খাতের ওপর গ্রাহকদের আস্থা সংকট চলছে। একীভূত করায় আস্থার ঘাটতি আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।

যদিও এ বিষয়ে আপাতত কোনো কথা না বলার সিদ্ধান্ত নিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।