বছরে খোয়া যায় ১২৮ কোটি

দুর্বল সিস্টেমে দেড় দশকে অগ্রণী ব্যাংকের ক্ষতি ২ হাজার কোটি টাকা

সিস্টেমের ত্রুটি আর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় প্রতি বছর ১২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা অর্থ হারাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। এক-দুই বছর নয়, এই সমস্যা চলছে প্রায় ১৫ বছর ধরে। এমনকি ব্যাংকের সিস্টেমে প্রকৃত কর্মীর তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৬৬ হাজার বেশি ‘স্টাফ অ্যাকাউন্ট’ চিহ্নিত থাকার তথ্যও উঠে এসেছে নিরীক্ষায়।

অগ্রণী ব্যাংকের অনিয়ম নিয়ে ৩ পর্বের প্রতিবেদনের আজ প্রথম পর্ব।

স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক এখন বড় প্রশ্নের মুখে। অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় উঠে এসেছে, সিস্টেমের ত্রুটি ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় প্রতিষ্ঠানটিতে বছরে খোয়া যাচ্ছে প্রায় ১২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। ১৫ বছর ধরে চলা এই দুর্বলতার সঙ্গে রয়েছে স্টাফ অ্যাকাউন্ট ও গ্রাহক নিরাপত্তায় গুরুতর অসঙ্গতি।

রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের আইটি অ্যান্ড এমআইএস ডিভিশনের ওপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় উঠে এসেছে ব্যাংকের অর্থ ব্যবস্থাপনার উদ্বেগজনক চিত্র। ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে রয়েছে ১ কোটি ৪৮ লাখের বেশি সক্রিয় হিসাব। নিয়ম অনুযায়ী এসব হিসাব থেকে বার্ষিক হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি ও এসএমএস অ্যালার্ট চার্জ আদায়ের কথা থাকলেও, বিপুলসংখ্যক হিসাব থেকে এসব চার্জ আদায় হচ্ছে না। দেশের ১০টি বড় শাখার নমুনা পর্যালোচনা করে নিরীক্ষক দল দেখতে পেয়েছে, সঞ্চয়ী হিসাবের প্রায় ১৩ শতাংশ ও এসএমএস সেবার ক্ষেত্রে প্রায় ৩১ শতাংশ গ্রাহকের কাছ থেকে কোনো চার্জ আদায় করা হচ্ছে না।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে বাড়ছে গ্রাহক-ঋণ, রেমিট্যান্সের ৯০ শতাংশ গ্রামে

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান একাত্তরকে বলেন, অগ্রণী ব্যাংকের আইটি বিভাগের ওপর করা পরিদর্শনে বেশ কিছু অনিয়ম উঠে এসেছে। এ বিষয়ে ব্যাংকটির উচিত দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। আর বাংলাদেশ ব্যাংক তার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের হিসেব বলছে, অগ্রণী ব্যাংকের প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ সঞ্চয়ী হিসাবের মধ্যে প্রায় ১৮ লাখ হিসাব থেকে রক্ষণাবেক্ষণ ফি আদায় হচ্ছে না। এতে বছরে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৬২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে, প্রায় ৪৫ লাখ ৭০ হাজার গ্রাহকের হিসাব থেকে এসএমএস অ্যালার্ট চার্জ কাটা হচ্ছে না। এই খাতে বছরে ক্ষতি হচ্ছে ৬৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। চলতি হিসাব, এসএনডি ও সুপার সেভিংস হিসাব থেকেও নিয়মিত চার্জ আদায় না হওয়ায় আরও অর্থ হারাচ্ছে ব্যাংকটি। সব মিলিয়ে বছরে ১২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বঞ্চিত হচ্ছে অগ্রণী ব্যাংক। একই ধারা ১৫ বছর চললে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ ক্ষতির পেছনে ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম বা টি-২৪ সফটওয়্যারের ত্রুটিপূর্ণ চার্জ ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়েছে। কোনো গ্রাহকের হিসাবে চার্জ কাটার সময় পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে সিস্টেম আংশিক টাকা কাটে অথবা কিছুই কাটে না। পরবর্তী সময়ে ওই হিসাবে টাকা জমা হলেও বকেয়া চার্জ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদায় হয় না। নিরীক্ষক দলের মতে, বকেয়া চার্জ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদায়ের ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক অর্থ হারাচ্ছে।

সামিট গ্রুপের রেকর্ড ২ হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকি

জানতে চাইলে সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান একাত্তরকে বলেন, এই চার্জ না করা কোনো যোগ্যতার ঘাটতি নাকি দুর্নীতি তা আগে বের করতে হবে। এরপর যদি দুর্নীতি হয় তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর যদি যোগ্যতার ঘাটতি হয় তাহলে অবশ্যই তাদের যোগ্যতা বৃদ্ধিতে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ‘স্টাফ অ্যাকাউন্ট’ নিয়ে। অগ্রণী ব্যাংকের সিস্টেমে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩৪টি হিসাব স্টাফ অ্যাকাউন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা মাত্র ১০ হাজার ৪৫০ জন। অর্থাৎ প্রকৃত কর্মীর সংখ্যার তুলনায় স্টাফ অ্যাকাউন্ট হিসেবে চিহ্নিত হিসাব অনেক বেশি। নিরীক্ষক দল এসব হিসাব যাচাই করে প্রকৃত কর্মী ছাড়া অন্যদের কাছ থেকে নিয়ম অনুযায়ী চার্জ আদায়ের সুপারিশ করেছে।

শুধু অর্থ ক্ষতিই নয়, গ্রাহকের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে নিরীক্ষক দল। অনেক গ্রাহকের কেওয়াইসি ফরমে মোবাইল নম্বর নেই, আবার কোথাও ল্যান্ডফোন নম্বর দেওয়া আছে। ফলে এসব গ্রাহক লেনদেনের এসএমএস অ্যালার্ট বা ওটিপি পাচ্ছেন না। ভুল বা পুরোনো মোবাইল নম্বরের কারণে গ্রাহকের ব্যাংকিং তথ্যের গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে জালিয়াতি বা অর্থ আত্মসাতের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা।

চূড়ান্তের পথে নবম পে স্কেল, যে কোনো সময় বাস্তবায়ন

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈদয় আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ একাত্তরকে বলেন, এই বিষয়টি আমার জানা নেই। সম্ভবত আপনাকে ভুল তথ্য দেওয়া হতে পারে। তবে বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখার ব্যবস্থা নিচ্ছি।

এদিকে অর্থ ক্ষতি বন্ধে পাঁচ দফা সুপারিশ করেছে নিরীক্ষক দল। এর মধ্যে রয়েছে টি-২৪ সফটওয়্যার আপগ্রেড করে বকেয়া চার্জ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদায়ের ব্যবস্থা চালু করা, ১ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি স্টাফ অ্যাকাউন্ট যাচাই, প্রতি তিন মাসে চার্জ আদায়ে ব্যর্থতার কারণ জানিয়ে প্রতিবেদন দেওয়া ও কেন কোনো হিসাব থেকে চার্জ আদায় হয়নি তার অডিট ট্রেইল সংরক্ষণ। পাশাপাশি গত ১৫ বছরে সমস্যাগুলো সমাধানে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনারও সুপারিশ করা হয়েছে।