আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়সহ তিন দফা দাবি আদায়ে রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনে মহাখালী, গুলশান ও বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই তীব্র যানজটের পর, এবার সোমবার বিকেলে থেকে যুক্ত হয়েছে রেলপথও অবরোধ। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে নগরবাসী।
মহাখালীতে রেললাইন ও সড়কপথ অবরোধ করে আন্দোলন করছে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা। বিকেল থেকে রেল ক্রসিং অবরোধ করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এতে ফ্লাইওভার ব্যবহার করে কিছু যানবাহন চলাচল করলেও ভোগান্তিতে পড়েছেন এই রুটে চলাচলকারী বেশিরভাগ মানুষ।
ভোগান্তিতে পড়েছেন রেলপথে চলাচলকারী যাত্রীরাও। মহাখালী রেলগেট অবরোধের পরপরই প্রায় সারাদেশের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কমলাপুর রেলওয়ে জানান, রেলপথ অবরোধের কারণে কমলাপুর স্টেশন ছাড়ার অপেক্ষায় আছে ছয় ট্রেন। বনানী ও উত্তরা স্টেশনে ঢাকা প্রবেশের অপেক্ষায় আছে তিনটি ট্রেন।
এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন কয়েক হাজার রেলযাত্রী। তারা বলছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো ট্রেন ছাড়ার খবর আসছে না। এ সময় সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায়ে সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসারও আহ্বানও জানিয়েছেন তারা। বলেছেন, এভাবে আর কতদিন চলবে দাবি আদায়ের উৎসব।
এর আগে বিকেল পৌনে তিনটায় কলেজের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে মহাখালী রেলক্রসিংয়ে এসে সড়কপথ ও রেলপথ অবরোধ করে দেন তারা। এ সময় তাদের মধ্যবর্তী স্থানে রেখে চারদিকে পুলিশ সদস্যদের ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখা গেছে। মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি। আনা হয়েছে জলকামানও।
মহাখালী রেলগেটে অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষকে হেঁটে আন্দোলনরত স্থান পাড়ি দিতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে শ্যামলী, ফার্মগেটের দিক থেকে আসা গাড়ি মহাখালী রেলক্রসিংয়ের আগ থেকে ইউটার্ন নিতে দেখা গেছে। ফলে সাধারণ মানুষ দীর্ঘ পথ হেঁটে এসে উঠছেন গাড়িতে।
এছাড়া, উত্তরাগামী গণপরিবহনগুলোকে ফ্লাইওভার ব্যবহার করতে দেখা যায়। ফলে মহাখালী-বনানী ফ্লাইওভার ছাড়িয়ে তীব্র যানজট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কর্মজীবী মানুষদেরকে ঘরে ফিরতে দীর্ঘ সময় সড়কের উপর যানবাহনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বেশিরভাগ যাত্রী আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
মহাখালী চেয়ারম্যানবাড়ি থেকে হেঁটে রেলগেটে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন এত এত আন্দোলনে আমরা অতিষ্ঠ। প্রতিটা দিন এই আন্দোলনের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায়ই কেটে যাচ্ছে। এভাবে কি কোনো দেশ চলতে পারে?
অন্য এক পথচারী হান্নান শেখ বলেন, মানুষের একটা যৌক্তিক দাবি থাকে, সেটার কারণে আন্দোলন হলে ঠিক আছে। কিন্তু এটা আবার কেমন দাবি তাদের? মন চাইলেই যে কোনো বিষয়ে দাবি জানালাম আর রাস্তায় বসে পড়লাম? এমন হলে আমরা সাধারণ মানুষ কোথায় যাবো?
চাকরি জাতীয়করণ বা কলেজকে রাতারাতি বিশ্ববিদ্যালয় করার মতো দাবি আদায়ের আন্দোলনে দিনশেষে অতিষ্ঠ মানুষ। সড়ক অবরোধের কারণে এম্বুলেন্সেই মারা যাচ্ছে রোগী। ফ্লাইট হারাচ্ছেন বিদেশগামি যাত্রী। চাকরির পরীক্ষা বঞ্চিত হচ্ছেন বেকার যুবক। এভাবে দাবি আদায়ের নামে মানুষের ক্ষতিটা কেউ দেখছে না।
প্রতিদিন কোনো না কোনো অজুহাতে রাস্তা আটকানোর এমন সংস্কৃতিকে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক আন্দোলন উল্লেখ করে সরকারের কঠোর অবস্থান চাইছেন নাগরিকরা।
ঢাকায় প্রায় বিশ বছর ধরে সিএনজি অটোরিকশা চালান কাঞ্চন হাওলাদার। অতীতে এই শহরে বহু আন্দোলন সংগ্রামের সাক্ষী তিনি। কিন্তু গেলো পাঁচ আগস্টের পর প্রায় প্রতিদিনই যা চলছে এমনটা আর কখনও দেখেন নি। তাঁর ভাষায়; এখন যার ইচ্ছা সেই রাস্তা বন্ধ করে দিতে পারে।
কেউ সড়ক বন্ধ করলে এখন আর আগের মতো তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেয় না পুলিশ। ফলে রাজধানীর পথে চলাচলকারী সাধারণ মানুষের প্রশ্ন- ঢাকার রাজপথে কি যা খুশী তাই করা যায়? কারণ কাঞ্চনের মতো দিন এনে দিন খাওয়া মানুষদের কথা কেউ ভাবে না।
সম্প্রতি আশুলিয়ার বাইপাইলে পোশাক শ্রমিকদের অবরোধে রোগীসহ আটকা পড়েন এম্বুলেন্সে চালক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। সেই রোগী এম্বুলেন্সেই মারা যান। রোগীর স্বজন ও এম্বুলেন্স চালকরা বলছেন, আন্দোলনের নামে মানুষের ক্ষতি করার এই সংস্কৃতি বন্ধ হোক।