রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে একাই উড়াল দেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম। এটি ছিল তাঁর একক ফ্লাইট যা প্রশিক্ষণের শেষ ধাপ। মাত্র কয়েক মিনিটেই বিমানটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আঘাত হানে উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাথমিক ভবনে। পাইলটসহ প্রাণ যায় অনেক শিশু-কিশোর ও শিক্ষকের।
২১ জুলাই। বেলা ১টা ৬ মিনিট। কুর্মিটোলা বিমানবাহিনী ঘাঁটি এ কে খন্দকার থেকে FT-7 BGI যুদ্ধবিমান নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের রানওয়ে দিয়ে উড্ডয়ন করে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোঃ তৌকির ইসলাম। এটাই ছিল তার প্রশিক্ষণের শেষ ধাপ। প্রশিক্ষক যখন মনে করেন প্রশিক্ষণার্থী সক্ষমতা অর্জন করেছে তখনই পাইলটকে একা বা ‘সলো ফ্লাই’ করতে দেয়া হয়। যা নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে।
২১ জুলাই। বেলা ১টা ১২ মিনিট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যাচ্ছে FT-7 BGI যুদ্ধবিমানটি মাটিতে আছড়ে পড়ে। তার ৬ সেকেন্ড পরে বিস্ফোরিত হয়ে কালো ধোঁয়া উঠে। তার মানে উড্ডয়নের মাত্র ৬ মিনিটের মধ্যেই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনে বিধ্বস্ত হয় বিমানটি। তবে ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী বিমানটি ১টা ১৮ মিনিটের সময় বিধ্বস্ত হয়েছে।
মুহুর্তেই আগুন ধরে যায় পুরো ভবনে। যেখানে ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক মিলনায়তন। আন্তঃ বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআরের বিবৃতি অনুয়ায়ী, উড্ডয়নের পর বিমানটি যান্ত্রিক ত্রুটির সম্মুখীন হয়। দুর্ঘটনা মোকাবেলায় এবং বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোঃ তৌকির ইসলাম বিমানটিকে ঘনবসতি এলাকা থেকে জনবিরল এলাকায় নিয়ে যাবার সর্বাত্মক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমান বাহিনীর একজন কর্মকর্তা এ বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, এই বিমানটা ফ্লাই করার আগে উনি (তৌকির) আরো দুইটা প্রতিষ্ঠিত ইউনিটে তার ফ্লাইং সিলেবাস কমপ্লিট করে এসেছে। ব্যাপারটা এমন না যে এয়ারফোর্স অবহেলার মাধ্যমে তার হাতে ছেড়ে দিয়েছে।
সালমান হাবিব রাফি। মাইলস্টোন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। দুর্ঘটনার সময় সে চার নম্বর ভবনের ক্লাস রুমে। ঘটনার একটা বর্ননা পাওয়া গেল তার কাছে। তিনি জানিয়েছেন, পাইলট তৌকির বিমান বিধ্বস্ত হবার কাছাকাছি সময়ে প্যারাসুট দিয়ে বেড়িয়ে আসলেও প্রাণে বাঁচেনি।
মাইলস্টোন কলেজের মাঠে অবস্থান করে আমরা তিন ঘণ্টা পর্যবেক্ষন করে দেখেছি প্রতি ৩ থেকে ৫ মিনিট পর পর একটি বিমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরন করে। যার প্রতিটি মাইলস্টোন কলেজের মাঠের মাঝামাঝি দিয়ে যায়। রানওয়ে ও মাইলস্টোন কলেজের স্যাটেলাইট ভিউ দেখলে তা আরো স্পষ্ট হয়।
দ্বাদশ শ্রেণির আরেক ছাত্র আফসানুল হক। সব সময়ই তার শংকা ছিলো, কবে যেন কোনো বিমান আছড়ে পরে তাদের মাথার উপর। বিমানটি কোন দিক থেকে এসে বিধ্বস্ত হয়, তা নিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষক অনুরাধা চক্রবর্তী পারামা জানান পাঁচ নম্বর ভবনের দিকে থেকে বিমানটি এসেছে।
বিমানটি যদি অবতরনের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হয় তাহলে সে সঠিক রুটেই ছিল বলে জানিয়েছেন, বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী। তবে যান্ত্রিক ত্রুটি বুঝতে পাড়ার পর কন্ট্রোল রুমের সাথে পাইলট তৌকিরের কি কথা হয়েছে বা আদৌ হয়েছে কিনা সেটিই তদন্তের অন্যতম আলামত।