রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে গত ২১ জুলাই বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফটি-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এতে ২৭ জন শিক্ষার্থীসহ ৩৫ জন নিহত এবং শিক্ষার্থীসহ শতাধিক মানুষ আহত হন। দুর্ঘটনার ২১ দিন পেরিয়ে গেলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সান্ত্বনা বা খোঁজখবর না নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন নিহত ও আহত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা।
মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) সকাল আটটার দিকে দিয়াবাড়ির মেট্রোরেল কার্যালয়ের সামনে তারা মানববন্ধন করেন এবং দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের বিচার, ক্ষতিপূরণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আট দফা দাবি জানান।
দাবিগুলো হলো-
- সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
- সারা বাংলাদেশে মাইলস্টোন স্কুলসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে।
- সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি নিহত শিশুর জন্য পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ (জরিমানা) এবং প্রত্যেক আহত শিক্ষার্থীদের জন্য এক কোটি টাকা দিতে হবে।
- স্কুলের পক্ষ থেকে প্রত্যেক নিহত শিশুর জন্য দুই কোটি এবং প্রত্যেক আহত শিশুর জন্য এক কোটি টাকা জরিমানা দিতে হবে।
- রানওয়ে থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থান পরিবর্তন করতে হবে (অন্যথায় রানওয়ের স্থান পরিবর্তন করতে হবে)।
- কোচিং ব্যবসার মূলহোতা স্কুল শাখার প্রধান শিক্ষক মিস খাদিজাকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তার সুষ্ঠু বিচার করতে হবে।
- স্কুলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ অভিভাবকদের দেখাতে হবে।
- বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণব্যবস্থা জনহীন জায়গায় করতে হবে।
এমনই এক সকালে আদরের সন্তানকে স্কুলে দিতে এসেছিলেন বাবা-মায়েরা। যাদের আশা ছিলো শিক্ষা অর্জন করে পরিবার আর দেশের সেবা করবে তাদের সন্তান। কিন্তু মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ তারাই সেই স্কুলের সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছেন সন্তান হারানোর বিচারের দাবি নিয়ে। সঙ্গে যোগ দেয় নিহত ও আহতদের সহপাঠীরাও।
মানববন্ধনে আসা এসব মানুষের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের বাধ্যতামূলক কোচিংয়ের কারণেই আজ তারা সন্তান হারা। আক্ষেপ জানান, দুর্ঘটনার এতোদিন পেরিয়ে গেলেও সরকারের পক্ষ থেকে সান্ত্বনা দিতেও তাদের কাছে কেউ আসেনি। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এই পরিবারগুলো স্কুল কর্তৃপক্ষকে দুর্ঘটনার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করা, নিহত ও আহত বাচ্চার জন্য ক্ষতিপূরনসহ আট দফা দাবি জানায়।
আর সেদিনের ঘটনায় প্রাণে বেঁচে ফেরা ও নিয়মিত শিক্ষার্থীরা বলছেন, এখনও সেদিনের নির্মম স্মৃতি ভুলতে পারছেন না তারা।
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে নিহত আয়মানের মায়ের আর্তনাদ, তার মতো আর কেউ যেন সন্তানহারা না হয়। যারা জীবিত আছে তারা সবাই তার আয়মানের মতো তাই তাদের নিরাপত্তার দাবিতে তিনি আজ রাস্তায়। বিচার না চাইলে ওপারে মৃত সন্তান কে কী জবাব দেবেন, এই প্রশ্নও তার!
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী মারিয়াম উম্মে আফিয়ার মা উম্মে তামিমা আক্তার বলেন, আমার বাচ্চাটাকে আমি কখনও কোচিংয়ে দিতাম না। বাচ্চাটাকে দেড় মাস হয়েছে কোচিংয়ে দিয়েছি। কেন দিয়েছি জানেন? আমার বাচ্চা বাসায় এসে আমাকে বলে, আম্মু আমি যদি কোচিং না করি, মিসরা আমাকে আদর করে না। আফিয়ার মা উম্মে তামিমা আক্তার আরও বলেন, এখানে যে বাচ্চাগুলো মারা গেছে, সব কোচিংয়ের বাচ্চা। এ স্কুলে কোচিংয়ের জন্য যতোটা প্রেশার দেওয়া হয়, আমার মনে হয় না অন্য কোথাও এত প্রেশার দেওয়া হয়। অভিভাবকেরা কোচিংয়ের পক্ষে নন বলেও জানান তিনি। আফিয়া স্কুলের বাংলা মাধ্যমের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
কোচিংয়ে দেওয়ার পর মেয়ে খুশি ছিল জানিয়ে তামিমা আক্তার বলেন, যখন বাচ্চাটাকে কোচিংয়ে দিলাম, এক সপ্তাহ পর আমার ময়না পাখি, আমারে জড়াইয়া ধইরা বলে, মা মিসরা আমাকে এখন অনেক আদর করে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অভিভাবকেরা বলেন, আজ আমরা মারামারি করতে আসিনি। এসেছিলাম মানববন্ধন করতে। স্কুল কর্তৃপক্ষ, একজন শিক্ষকও তো আমাদের কাছে আসেননি। আমরা তো সন্তানহারা অভিভাবক। কেউ তো এসে বললেন না, আসেন আপনাদের সঙ্গে কথা বলি।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের হাতে নিহত ছাত্রছাত্রীদের ছবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। এ সময় তারা ‘কোচিংয়ের নামে ব্যবসা, বন্ধ কর, বন্ধ কর’, ‘ফুল-পাখি সব পুড়ল কেন, জবাব চাই, দিতে হবে’, ‘কী এসেছে কী এসেছে, বিমান এসেছে, বিমান এসেছে, কী করেছে কী করেছে, মায়ের বুক খালি করেছে ‘শিক্ষা না ব্যবসা, শিক্ষা-শিক্ষা’ প্রভৃতি স্লোগান দেন।
এদিকে নীতিমালার বাইরে কোচিং বাণিজ্য নিয়ে নিজেদের জায়গা পরিষ্কার করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা নুরুন নবী বলেন, শিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়ম মেনেই বাড়তি ক্লাস পরিচালনা করেন তারা। তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালের নির্দেশনা মেনে স্কুলের দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য এক্সট্রা ক্লাশের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। আর অভিভাবকরা ফর্মফিলাপ করে সন্তানেদর সেই ক্লাশে দিয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে সুস্থ করতে প্রতিদিনই কাউন্সিলিং করছেন তারা। ভূমি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর সিভিল এভিয়েশনের সব নিয়ম মেনেই তারা স্কুল চালাচ্ছেন। তবে সরকার চাইলে প্রতিষ্ঠানটি স্থানান্তরিত করতে প্রস্তত।
এর বাইরেও শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে নানা ধরনের কাউন্সিলিং, শোকসভা থেকে শুরু করে নানা ধরনের কাজ করছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বলেও জানান তিনি। দুপুরে স্কুলে নিহতদের জন্য শোক আর আহতদের জন্য দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয় হল রুমে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য চলে কাউন্সিলিং সেবা।
২১ জুলাই বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণ হারান স্কুলটির ২৭ শিক্ষার্থীসহ ৩৫ জন। যে ঘটনার পর শোকে স্তব্ধ হয় গোটা দেশ।