উত্তরার মাইলস্টেন স্কুলের শিশুদের সেই বিমান দুর্ঘটনার দুসহ স্মৃতি ভোলাতে ব্যতিক্রমী এক আয়োজন উদযাপন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘আজ আমাদের ছুটি ওভাই আজ আমাদের ছুটি’ শিরোনামে ছোট্ট শিশুরা মেতেছিলো ছবি আঁকা ও খেলায়। এরই ফাঁকে ফাঁকে চলেছে কাউন্সেলিং।
তবে ভয়াবহ সেই দিন অনেকটা পেরিয়ে গেলেও মাইলস্টোনের শিশুদের চোখের গভীরে এখনও লুকিয়ে আছে হারানোর বেদনা। তাদের মুখের হাসি ফিরে এলেও, মনের কোণে রয়ে গেছে কিছু না বলা কষ্ট, কিছু অসমাপ্ত গল্পো।
মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) সারাদিন রোটারি ক্লাব অব বনানী ও ছুটি রিসোর্ট আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ছবি আঁকা, খেলা, গল্প আর গান—সবকিছুতেই ছিলো এক অন্যরকম আবহ। আনন্দে ভরে ওঠে চারপাশ, কিন্তু প্রতিটি হাসির আড়ালেই লুকিয়ে ছিলো গভীর স্মৃতি, প্রিয়জন হারানোর ব্যথা।
রোটারি ক্লাব বনানী ও ছুটি রিসোর্ট পূর্বাচলের আয়োজনে একদিনের জন্য হলেও তারা ভুলে থাকতে পেরেছে সেই ভয়াবহ দিন। সেই ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার স্মৃতি তাড়ানোর জন্যই এই অনুষ্ঠান। ছোট্ট শিক্ষার্থীরা সারাদিন মেতে উঠে ছবি আঁকা আর খেলায়। ফাঁকে ফাঁকে কাউন্সেলিং।

হিলিং টুগেদার উইথ মাইলস্টোনস ব্রেভ হার্টস
‘আজ আমাদের ছুটি ও ভাই, আজ আমাদের ছুটি’— এই স্লোগানে দিনব্যাপী আয়োজনটি হয়ে উঠেছিল আনন্দঘন। অংশ নিয়েছিল মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির বেদনা বয়ে বেড়ানো প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী।
দিনব্যাপী কর্মসূচিতে ছিল মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সেশন, ছবি আঁকা, ট্রেজার হান্ট প্রতিযোগিতা, খেলাধুলা এবং সবশেষে নিজেদের কষ্ট কাগজে লিখে তা দিয়ে নৌকা বানিয়ে নীল জলে ভাসিয়ে দেওয়ার প্রতীকী আয়োজন।

আমার বোনকে পোড়া দেহে কোলে তুলেছিলাম
তাহসিন আব্দুল্লাহ, মাইলস্টোন স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। দুর্ঘটনার দিন স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফিরছিলো। হঠাৎ অস্বাভাবিক শব্দ শুনে দৌড়ে ফের স্কুলে আসে। সে জানায়, দেখি বিমান পড়ে আগুন লেগেছে। হন্য হয়ে বোনকে খুঁজতে থাকি। এক সময় দেখি, পোড়া শরীর নিয়ে সে বেরিয়ে আসছে। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু কয়েকদিন পর বোনটা চলে গেল চিরতরে।
চোখের জল মুছতে মুছতে তাহসিন বলে, আমরা দুই ভাইবোনের বয়সের পার্থক্য তেমন ছিলো না। সবকিছুর সঙ্গী ছিল বোন। তাকে হারিয়ে মনে হয়, আমরা একটা পার্টনার হারিয়েছি।

বন্ধুদের বাঁচাতে আমি নিজেই আগুনের ভেতরে গিয়েছিলাম
সূর্য সময়, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। আগুনের ভেতর থেকে একে একে বন্ধুদের নামিয়ে আনে সে। তার ভাষায়, আমি শ্বাস নিতে পারছিলাম না। নিজের জামা দিয়ে মুখ ঢেকে জানালার পাশে গিয়ে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করেছি। পরে বন্ধুরা পড়ে আছে দেখে একে একে সবাইকে উদ্ধার করেছি, তারপর নিজে নেমেছি।
বেদনাগুলো নীল জলে ভাসিয়ে দিলাম
ইভেন্ট শেষে শিক্ষার্থী আরেফিন সিদ্দিক বলেন, সারাদিন ইভেন্টে ব্যস্ত ছিলাম। আনন্দ করেছি। কষ্ট কিছুটা ভুলে থাকতে পেরেছি।
আরেক শিক্ষার্থী আফিফ জানায়, খেলেছি, অংশ নিয়েছি— খুব ভালো লেগেছে। কষ্টটা মনে ছিলো না।

ওদের ট্রমা একটু একটু করে হালকা হচ্ছে
মাইলস্টোনের সিনিয়র লেকচারার অভিজিৎ অধিকারী বলেন, ট্র্যাজেডির পর থেকে প্রতিদিনই চেষ্টা করছি— ওদের ট্রমা যেন হালকা হয়, যেন আবারও হাসতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে। আজকের আয়োজন সেই প্রচেষ্টাকে আরও দূর এগিয়ে দিলো।
মেন্টাল হেলথ ফার্স্ট এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি লিড মনিরা রহমান বলেন, এমন আয়োজন শিশুদের মানসিক পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা আবারও বন্ধুর মুখে হাসি দেখে বিশ্বাস পায়— জীবন থেমে থাকে না।
চিত্রশিল্পী তাহমিনা হাফিজ লিসা বলেন, বাচ্চারা ছবি আঁকছে, কারো ছবিতে চোখের জল, কারো ছবিতে সেই স্মৃতি, তাদের আঁকা ছবিগুলো যেন সাক্ষ্য দিচ্ছিলো- স্মৃতির রঙ কখনোই পুরোপুরি মুছে যায় না।

এটা শুধু বিনোদন নয়, মানসিক নিরাময়ের প্রচেষ্টা
রোটারি ক্লাব বনানীর প্রেসিডেন্ট খন্দকার আব্দুল মুবিন বলেন, এটা শুধু বিনোদন নয়; বরং শিশুদের মনের ভয়, দুঃখ ও চাপ দূর করার এক আন্তরিক প্রয়াস।
ছুটি রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর ফেরদৌস জানান, মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। এমন উদ্যোগে যুক্ত হতে পেরে আমরা আনন্দিত।
২১ জুলাই ২০২৫ তারিখে ঢাকার উত্তরা দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি দোতলা ভবনের ওপর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীসহ অন্তত ৩৫ জন নিহত এবং প্রায় ১৫০ জন আহত হন।
স্বজন হারানোর বেদনা বুকে নিয়েই দিনভর গান, হাসি আর স্মৃতির ভেলায় ভাসিয়ে বাড়ি ফিরলো মাইলস্টোনের ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা। সবশেষে কাগজে মনের গহীনে কষ্ট লিখে নীল জলে ভাসিয়ে দিয়ে গেলো শিশুরা।
