মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ আর চারদিকে মিসাইল হামলার আতঙ্ক। এর মধ্যেই চরম অনিশ্চয়তা কাটিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখলেন ৩৭৮ জন প্রবাসী বাংলাদেশি। বৃহস্পতিবার সকালে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইটে তারা দুবাই থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। মৃত্যুভয়কে জয় করে প্রিয়জনদের কাছে ফেরার এই মুহূর্তটি বিমানবন্দরে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান সংঘাতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্য। একের পর এক ড্রোন ও দূরপাল্লার মিসাইল হামলার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে বিমান চলাচল। এমন পরিস্থিতিতে দুবাই বিমানবন্দরে আটকা পড়েছিলেন বহু বাংলাদেশি।
কেরানীগঞ্জের আকরাম হোসেন, যিনি ১৮ বছর ধরে দুবাইয়ে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কর্মরত, তিনি বলেন, আমাদের পাশের বিমানবন্দরেই মিসাইল হামলা হয়েছে। চারপাশে অজানা ভয়, কখন যে জীবন চলে যায় তার নিশ্চয়তা ছিল না। মানুষজন সব এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছিল।
আরেক যাত্রী সুমাইয়া আক্তার স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলেন, সেখানে কীভাবে সময় কেটেছে তা বলে বোঝাতে পারব না। ইউএস-বাংলার কারণে দেশে ফিরতে পেরে এখন অন্তত মনভরে শ্বাস নিতে পারছি।
সকাল সোয়া ৭টায় যখন ইউএস-বাংলার বিএস-৩৪২ ফ্লাইটটি অবতরণ করে, তখন বাইরে অপেক্ষমাণ শত শত স্বজনের চোখে ছিল আনন্দাশ্রু। ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা আজিমুন নাহার তার ৫০ বছর বয়সী ছেলে আকরামকে কাছে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেন।
কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার বুকের ধন আমার কাছে ফিরে এসেছে, আর কিছু চাই না। যুদ্ধের খবর শোনার পর থেকে দুশ্চিন্তায় এক মুহূর্ত ঘুমাতে পারিনি। প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার এমন অসংখ্য দৃশ্যে বিমানবন্দরের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশি প্রবাসীদের চরম বিপদে বড় ঝুঁকি নিয়ে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় ইউএস-বাংলা। ৪৩৬ আসনবিশিষ্ট বিশাল এয়ারবাসের মাধ্যমে মোট দুটি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার কথা জানিয়েছে তারা। প্রথমটি সকালে যাত্রী নিয়ে এলেও দ্বিতীয় ফ্লাইটটি বৃহস্পতিবার বিকেল সোয়া ৫টায় দুবাইয়ের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যাবার কথা রয়েছে, যা স্থানীয় সময় রাত ১০টায় পুনরায় যাত্রী নিয়ে ফেরার কথা রয়েছে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম জানান, দুবাই এয়ারপোর্ট অথরিটির অনুমতি সাপেক্ষে এই ফ্লাইটগুলো চালানো হচ্ছে। যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বা যাচ্ছে, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
আটকেপড়া অনেক প্রবাসী এই উদ্ধারকাজের জন্য ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে দুবাই বিমানবন্দরে যখন সব ফ্লাইট বন্ধ এবং বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজও আটকা পড়েছে, তখন এই বিশেষ ফ্লাইটটি তাদের কাছে হয়ে উঠেছিল একমাত্র আশার আলো।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে আসুক এবং বাকি প্রবাসীরাও দ্রুত নিরাপদে ফিরে আসুক, বিমানবন্দরে উপস্থিত সকল স্বজনের মুখে আজ এই একটিই প্রার্থনা ছিল।