কিশোরগঞ্জের চাঞ্চল্যকর নরসিংদীর গরু ব্যবসায়ী রমিজ উদ্দিন হত্যার ঘটনায় র্যাবের হাতে আটক মুয়াজ্জিন হাফেজ জাকির হোসেন আদালতে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২৩ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক পার্থ ভদ্রের এজলাশে আসামী মুয়াজ্জিন হাফেজ জাকির হোসেন জবানবন্দি দেন।
সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত দেয়া জবানবন্দিতে জাকির হোসেন দোষ স্বীকারোক্তিসহ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন বলে নিশ্চিত করেছেন কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি (অপারেশনস) মোখলেছুর রহমান। পরে বিচারকের নির্দেশে আসামিকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে লক্ষীপুরের একটি মসজিদ থেকে তাবলিগ জামাতের চিল্লারত অবস্থায় হাফেজ জাকির হোসেনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব সদস্যরা।
বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাব মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, কিশোরগঞ্জের কাটাবাড়িয়া এলাকার নরসিংদীর মনোহরদীর ব্যবসায়ী রমিজ উদ্দিন হত্যাকান্ডের সূত্র উদঘাটনে র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পাশাপাশি র্যাব-১৪ তদন্ত চালায়। তদন্তে নিশ্চিত হয়ে হত্যাকান্ডে জড়িত মসজিদের মুয়াজ্জিন জাকির হোসেনকে চিল্লারত অবস্থায় লক্ষীপুরের একটি মসজিদ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে রমিজ উদ্দিন হত্যাকান্ডে মুয়াজ্জিন জাকির হোসেন জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে কিভাবে হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছেন তা জানিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব কর্মকর্তা জানান, ব্যবসায়ী রমিজ উদ্দিন ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় কর্মরত ছিলেন। ২০০৬ সালে দেশে এসে রমিজ উদ্দিন গরুর ব্যবসা শুরু করেন। হত্যাকারী নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার লেঙ্গুরা ঝিগাতল গ্রামের আব্দুল আওয়ালের পুত্র হাফেজ জাকির হোসেন ৫ বছর ধরে রমিজ উদ্দিনের এলাকায় একটি মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলো।
এক বছর ধরে প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়ার জন্যে রমিজকে ডেকে দিতো সে। এতে মুয়াজ্জিন জাকিরের সাথে রমিজের ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠে। রমিজ বিভিন্ন সময় ব্যবসায়ীক বিষয় নিয়ে মুয়াজ্জিন জাকিরের সাথে পরামর্শ করতো।
তিন মাসে আগে মুয়াজ্জিন জাকির হোসেন ব্যবসায়ী রমিজকে পরামর্শ দেয় যে, তার (জাকির) বাড়ি নেত্রকোণার সীমান্তবর্তী এলাকায়। সেখান থেকে কম মূল্যে ভারতের চোরাই গরু কেনা যাবে। জাকিরের কথায় ৩০ সেপ্টেম্বর রমিজ ব্যাংকে গিয়ে গরু কেনার জন্যে ৬ লাখ টাকা ওঠান। এসময় জাকির হোসেন রমিজের সাথে ছিল।
২ অক্টোবর গরু কিনতে রমিজকে নিয়ে জাকির হোসেন প্রথমে মনোহরদী থেকে কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী এবং পরবর্তী সময়ে বড়পুল এলাকায় যান। এখান থেকে রিকশায় ঘটনাস্থল সদর থানাধীন কাটাবাড়িয়া ডাউকিয়া মসজিদের নির্জন এলাকায় অবস্থান নেন এবং চোরাই গরুর গাড়ি দেরিতে আসবে এমন কথা বলে সময়ক্ষেপন করতে থাকেন।
আরও পড়ুন: ঝালকাঠিতে লঞ্চে আগুন, ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার
রাত ১টার দিকে জাকির রমিজকে বলে যে, তার(জাকির) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হবে। তখন রমিজও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে জাকিরের সাথে নির্জন একটি কলাবাগানে যান। সেখানে রমিজ জাকিরের হাতে থাকা ব্যাগ থেকে হাতুড়ি বের করে রমিজের পিছনে গিয়ে মাথায় দুটি আঘাত করেন। আঘাতের পর মাটিতে লুটিয়ে পড়লে মুখসহ শরীরের আরো কয়েক জায়গায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে রমিজের মৃত্যু নিশ্চিত করেন মুয়াজ্জিন জাকির হোসেন।
এ হত্যার পর নিহত রমিজের সাথে থাকা ৬ লাখ টাকা নিয়ে জাকির ঘটনাস্থল থেকে নরসিংদীর মনোহরদীতে নিজের বাসায় ফিরে যান। সেখানে গিয়ে গোসল করে মসজিদে গিয়ে আজান দেন এবং সকলকে নিয়ে ফজরের নামাজ পড়েন। এরপর মক্তবের ছাত্রছাত্রীদের আরবীও পড়ান জাকির।
সকাল ১০ টিার দিকে রমিজ উদ্দিন কিশোরগঞ্জে নিহত হয়েছেন এমন খবর এলাকায় ছড়িয়েপড়লে মুয়াজ্জিন জাকির হোসেন মসজিদ থেকে পারিবারিক সমস্যা বলে ১০/১৫ দিনের ছুটি নেন।
এরপর নরসিংদী থেকে প্রথমে ময়মনসিংহ শহরের এক আত্মীয়ের বাসায় যায় জাকির। সেখান থেকে গফরগাঁও, সিলেটসহ বিভিন্ন জায়গায় ১২ দিন আত্মগোপন করে সে। এরপর জাকির ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকার একটি জায়গা থেকে ৪০ দিনের চিল্লায় যান। সেখান থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যাকান্ডের সময় জাকিরের পরনের রক্তমাখা পায়জামা উদ্ধার করে র্যাব।
একাত্তর/টিএ