রাজবাড়ীতে কোন প্রকার ক্যামিকেল ছাড়া দুধ আর চিনি দিয়ে তৈরি সর দই সুনাম ছড়াচ্ছে পুরো জেলায়। বিক্রি হচ্ছে জেলার বাইরেও। দুধ বিক্রিতে সমাধান পাচ্ছেন খামারীরা। এতে কর্মসংস্থান হয়েছে শতাধিক পরিবারের।
রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের এক সময়ের কৃষক মো. নিয়ামুল ইসলাম। নিজের পালন করা একটি গাভীর দুধ বিক্রি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন তিনি। এক মিষ্টি দোকানির পরামর্শে ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে তার গাভীর ৩ কেজি দুধ দিয়ে তৈরি করেন দই। প্লাস্টিকের কাপে করে ২০ টাকা দরে বিক্রি শুরু করেন তিনি।
সেই শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে, বর্তমানে তিনি বৃহৎ আকারে গড়ে তুলেছেন ‘হালাল সর দই’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। যেখানে ভেজালের বালাই নেই। ফলে, পুরো জেলায় তার তৈরি দইয়ের চাহিদা বেড়েছে।
প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে ৭শ’ কেজি দুধ দিয়ে অন্তত ৪০০ কেজি দই তৈরি করছেন তিনি। এতে কর্মসংস্থান হয়েছে শতাধিক পরিবারের।
শুধু নিয়ামুলই নয়, তার দেখাদেখি আরো ৬টি দই কারখানা গড়ে উঠেছে শ্রীরামপুর গ্রামে।
সরেজমিনে কালুখালী উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামে ঘুরে দেখা যায়, গ্রামে কেউ বাইসাইকেলে আবার কেউ মোটরসাইকেলে করে বাজারে না গিয়ে দুধ নিয়ে আসছেন দই কারখানায়। পুরো গ্রামটিতে যেন দুধের ব্যবসায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
খামারি মো. নজির হোসেন জানান, তার খামারে ৩০ থেকে ৩৫ কেজি দুধ হয়। এক সময় এই দুধ বিক্রি নিয়ে তাকে চিন্তায় থাকতে হতো।
তিনি বলেন, বাজারে গিয়ে দুধ নিয়ে বসে থাকতো হতো। আর এখন হালাল দই কারখানায় যাওয়ার সাথে সাথে দুধ ঢেলে রেখে দেয়। এক সপ্তাহ পর পর টাকা নিলেও সমস্যা নেই। এখন দুধ দিয়ে গিয়ে অন্য কাজের সময় পাই।
আছাদ নামের অপর দুধ বিক্রেতা বলেন, কালুখালীর বাজারে এক সময় ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় দুধ বিক্রি করতে হতো। এখন ৬০ থেকে ৭০ টাকায় আমরা বিক্রি করতে পারি। তাছাড়া দই কারখানা হওয়ায় দুধের চাহিদা বেড়েছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে গাভীর খামার। এই গ্রামে এখন আর দুধ সঙ্কট নেই।
প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকেও নিয়ামুলের হালাল সর দইয়ের স্বাদ নিয়ে আসেন মানুষ। তারা নিজেরাও যেমন খান, আবার আত্মীয়-প্রতিবেশীদের জন্য কিনেও নিয়ে যান।
হালাল সর দইয়ের ক্রেতা সফিক কাজী বলেন, আমি একদিন রাজবাড়ী থেকে এই দইয়ের সন্ধান পেয়ে দেখতে আসি। ওইদিন এক কেজি কিনে নিয়েছিলাম। এখন আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি গেলে নিয়মিত নিয়ে যাই।
অপর দই ক্রেতা তরিকুল ইসলাম জানান, গ্রামটি ধীরে ধীরে ‘দই গ্রাম’ নামে পরিচিতি পাচ্ছে। দই খেতে প্রতিদিন শত শত মানুষ আসে এখানে।
কালুখালী উপজেলার মদাপুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামের হালাল সর দই প্রস্তুতকারী নিয়ামূল ইসলাম বলেন, আমার দইয়ের বিশেষত্ব হলো আমি কোনো ভেজাল দেই না, কোন প্রকার ক্যামিকেলও মেশানো হয়না। দুধ আর চিনি দিয়েই দই তৈরি হয়। যে কারণে একবার যে খেয়েছে সে অন্যজনের কাছে গল্প করেছে, এভাবেই প্রচারণাটা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আমার এই দই রাজবাড়ী ছাড়াও ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হচ্ছে। ৩ কেজি দুধ দিয়ে শুরু করে আজ আমি দিনে সাড়ে ৭শ’ কেজি দুধের দই তৈরি করি।
‘আমার দেখা-দেখি এই গ্রামে, সততা দই, ভাই ভাই দইসহ মোট ৬টি কারখানা গড়ে উঠেছে। এতে কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে আগুনে পুড়লো ছয় গুদাম
রাজবাড়ী সদর উপজেলার প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ড. খায়ের উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, হালাল সর দই কারখানাটি গড়ে ওঠায় শ্রীরামপুর গ্রামের খামারীরা উপকৃত হচ্ছেন, আবার নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ায় বেকারত্ব কমেছে। বাজারজাত করণসহ এমন উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়।
একাত্তর/আরএ