গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বিনিরাইলে প্রতি বছর পৌষের শেষ দিন বসে মাছের মেলা, যেটি এলাকায় জামাই মেলা নামে বিখ্যাত। এদিন এ মেলা থেকে মাছ কিনে জামাইরা শ্বশুরবাড়িতে যান। মেলায় জামাই-শ্বশুরদের মাঝে চলে বড় মাছ কেনার প্রতিযোগিতা।
এই মেলাকে ঘিরে এলাকায় উৎসবে মেতে ওঠেন সাধারণ মানুষ। দিনব্যাপী এ মেলায় অন্তত দেড় কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয়। আর দেশী-বিদেশী মাছ কিনতে বিভিন্ন জেলার মানুষ ভিড় করেন এখানে।
গাজীপুরের কাপাসিয়ার ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র বর্মন বিয়ের পর থেকে টানা ১৭ বছর ধরে জেলার কালীগঞ্জের এই মেলা থেকে মাছ কিনে নিয়ে যান নরসিংদীর পলাশে তার শ্বশুরবাড়ি। তার মতো একই অবস্থা বেসরকারি চাকরিজীবী খোরশেদ আলমের। তিনি শশুরবাড়ির জন্য এবার দুটি মাছ কিনেছেন ১৮ হাজার সাতশ টাকায়।
গাজীপুরের বোর্ড বাজার থেকে আনোয়ার হোসেন তার স্ত্রী শিউলিকে সঙ্গে নিয়ে মেলায় এসে চারটি রুই মাছ কিনেছেন। জামাই মেলা থেকে মাছ কিনতে পেরে তারা যেমন খুশি তেমনি খুশি হচ্ছেন শ্বশুরবাড়ির লোকজন।
মেলায় গাজীপুর, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ থেকে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছেন। আর এসব দেশী-বিদেশী মাছ সাশ্রয়ী দামে কিনতে পেরে খুশি এখানে আসা ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা।
বাজারের সবচেয়ে বেশি ওজন ৭৩ কেজি ওজনের ১০ ফুট ৭ ইঞ্চি দীর্ঘ মাছের দাম চাওয়া হয়েছে ৯০ হাজার টাকা। পাখি নামের এই মাছটির দাম উঠেছে ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। হাক-ডাক দিয়ে বেচাকেনা হচ্ছে রকমারি মাছ। বিক্রেতারা বলছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা মেলায় মাছ বিক্রি করতে এসেছেন। এখানে উৎসবের আমেজে প্রতিযোগীতার মাধ্যমে ক্রেতারা মাছ কিনেন।
আয়োজকরা বলছেন, ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া বিনিরাইলের মাছের মেলা এখন কালীগঞ্জের ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে। এ মেলা সবচেয়ে বড় মাছের মেলা হিসেবে স্বীকৃত। তবে করোনার বিধি-নিষেধের কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে এবার মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলায় আগত ক্রেতা-বিক্রেতার সুযোগ সুবিধা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
একদিনের এই মেলায় অন্তত দেড় কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়। শুধু মাছ কেনা-বেচা নয়, হরেক রকমের মিষ্টি, নানা ধরনের তৈজসপত্রসহ রকমারি পণ্যের পশরায় নানা বয়সী নারী-পুরুষের উপচে পড়া ভিড় থাকে রাত পর্যন্ত।
প্রায় আড়াইশ বছর ধরে উপজেলার জামালপুর, জাঙ্গালীয়া ও বক্তারপুর ইউনিয়নের বিনিরাইল এলাকায় বসে ঐতিহ্যবাহী জামাই মেলা। নামে জামাই মেলা হলেও মূলত এখানে বিক্রি হয় ছোট বড় দেশী-বিদেশী নানা পদের মাছ। মেলা উপলক্ষে সকাল থেকেই সহস্রাধিক দোকানে মাছের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন মাছ বিক্রেতারা।
মেলায় চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাছ নিয়ে এসেছেন ব্যবসায়ীরা। সামুদ্রিক চিতল, বাঘাইড়, আইড়, বোয়াল, কালিবাউশ, পাবদা, গুলসা, গলদা চিংড়ি, বাইম, কাইকলা, রূপচাঁদা, শাপলা মাছের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে নানা রকমের দেশী মাছ। বড় আকারের মাছকে ঘিরেই জটলা বেশি ক্রেতাদের।
মেলাটি এখন এই এলাকার কৃষ্টি, ঐতিহ্য বহনের পাশাপশি এলাকাবাসির উৎসবে পরিণত হয়েছে।