দস্যু আতঙ্কে পূর্ব সুন্দরবনের দুই সহস্রাধিক জেলে। দীর্ঘ তিন মাস পর যখন বনে মাছ ধরতে যাওয়ার সব রকমের প্রস্তুতি সম্পন্ন এমন সময় অপহরণের খবর জেলেদের মাঝে নতুন আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
বিশেষ করে সম্প্রতি পশ্চিম সুন্দরবন থেকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানার সাত জেলেকে মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ এবং চাদঁপাই রেঞ্জে দুই দস্যু আটকের ঘটনায় পূর্ব সুন্দরবনের জেলেদের মাঝেও দস্যু ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে পূর্ব সুন্দর বন বিভাগ শরণখোলা রেঞ্জের বনরক্ষীরা জানিয়েছেন, জেলেদের সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে এবং বনদস্যুদের প্রতিহত করা হবে।
বনসংলগ্ন শরণখোলা উপজেলার বগি, চালিতাবুনিয়া, খুড়িয়াখালী, সোনাতলা গ্রামের জেলেরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বনবিভাগের দেয়া জুন, জুলাই, আগস্ট এই তিন মাসের অবরোধে সাধারণ জেলেরা খুবই আর্থিক সংকটে থাকেন। এসময় তাদের অন্যকোনো কাজ থাকে না। কোনোরকম ধারদেনা করে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করে থাকেন। অবরোধ শেষে ধারদেনা করে মহাজনদের কাছ থেকে দাদন এনে বনে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
তারা আরও জানান, সুন্দরবনে আগের মত মাছ পাওয়া যায় না। এছাড়া শরণখোলা রেঞ্জের শতকরা ৮৫ ভাগ জায়গা অভয় অরণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কারণে এমনিতেই যখন জেলেরা সুন্দরবনে মাছ ধরতে যেতে অনীহা বোধ করছেন। সেখানে আবার নতুন করে দেখা দিয়েছে বনদস্যুদের অপতৎপরতা।
জেলেরা বলছেন, মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে বন অফিস থেকে বিএলসি ও পারমিট গ্রহণ করে বনে যেতে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। তার উপর যদি বনদস্যুদের আক্রমণ হয়। মুক্তিপণের দাবিতে জেলেদের অপহরণ করা হয়। তখন সাধারণ জেলেদের দুর্দশার সীমা থাকে না । দরিদ্র জেলেদের পক্ষে ৫০ থেকে ১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে বাড়ি ফেরার সম্ভব হয় না। অনেক সময় মুক্তিপণের টাকা দিতে না পারায় দস্যুরা নির্মম অত্যাচারের শিকার হন। এমনকি দস্যুদের হামলায় জেলেদের জীবনও বিপন্ন হওয়ার শঙ্কা থাকে।
এর আগে গত মধু আহরণ মৌসুমেও মৌয়ালদের কাছে বনদস্যুরা ফোন করে চাঁদা আদায় করে। গত ৭/৮ মাস আগে বঙ্গোপসাগর থেকে এবং সুন্দরবনের শ্যালাসহ একাধিক বন অফিস এলাকা থেকে বেশ কয়েকজন ছেলেকে মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করে বনদস্যুরা। এসব কারণে এ বছর অবরোধ শেষে জেলেরা দস্যুদের ভয়ে বনে যেতে সাহস করছেন না। তবে অনেক জেলে আর্থিক সংকটের হাত থেকে বাঁচতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরতে সুন্দরবনের যাত্রা করছেন।
সুন্দরবন ব্যবস্থাপনা কমিটি ভিলেজ টাইগার রেসপন স্টিম (ভিটিআর টির) শরণখোলা উপজেলার ফ্যাসিলেটেটর মো. আলম হাওলাদার জানান, গত ১০-১২ বছর পর্যন্ত বনদস্যুদের তৎপরতা কম ছিলো। কিন্তু বেশ কয়েক মাস আগে থেকে বঙ্গোপসাগরসহ সুন্দর বনে বনদস্যু ও জলদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতিমধ্যে বনের বিভিন্ন জায়গায় বনদস্যুদের জেলে অপহরণের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। ফলে শরণখোলার জেলেদের মাঝে অনেকটা ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। আশা করি বনবিভাগ এবং কোস্টগার্ডের ব্যাপক তৎপরতা থাকলে বনদস্যুরা আক্রমণ করতে সাহস পাবে না।
শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুদীপ্ত কুমার সিংহ জানান, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিশেষ সভায় সুন্দরবনের জেলেদের সুরক্ষায় সব ধরনের প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
শরণখোলা রেঞ্জের স্টেশন কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমান জানান, ছয় শতাধিক বিএলসির (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) মাধ্যমে ইতোমধ্য শরণখোলা ও বগী ষ্টেশন থেকে সহস্রাধিক জেলে পারমিট করে বনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন। ১ সেপ্টেম্বর বনে প্রবেশ করবেন। বনবিভাগ জেলেদের সার্বিক সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে। তবে পূর্বের তুলনায় জেলেদের সংখ্যা কিছুটা কম বলে মনে হচ্ছে। কত সংখ্যক নৌকা ও জেলে এ বছর পূর্ব সুন্দরবনে মাছ ধরবে তার সঠিক নিরূপণ করতে আরও কিছু সময় লাগবে।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা রানা দেব জানান, বন বিভাগের স্মার্ট টিম জেলেদের সুরক্ষার জন্য সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়াও কোস্ট গার্ডের পশ্চিম জোন কমান্ড সার্বক্ষণিক টহলে থাকবে।