পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা, নদীবেষ্টিত দ্বীপের মতো একটি অঞ্চল, যেখানে সড়কপথে যোগাযোগের কোনো সুযোগ নেই। চরকাজল ও চরবিশ্বাসের মতো প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া একটি দুরূহ চ্যালেঞ্জ। এই অঞ্চলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকার ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স দিলেও এগুলো কখনো ব্যবহৃত হয়নি।
অব্যবহৃত নৌ-অ্যাম্বুলেন্স: একটি হতাশার চিত্র
গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উপজেলা হেলথ কেয়ার (ইউএইচসি) প্রকল্পের মাধ্যমে ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক নৌ-অ্যাম্বুলেন্স এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে আরেকটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এই দুটি অ্যাম্বুলেন্সই বর্তমানে গলাচিপা পৌরসভার সুলিজের মসজিদের ঘাট এবং এক নম্বর ওয়ার্ডের লঞ্চঘাটে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। মেশিন ও যন্ত্রাংশ ক্রমশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা এই অ্যাম্বুলেন্সের অস্তিত্ব সম্পর্কেই অজ্ঞ।
আশ্চর্যজনকভাবে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. মো. মেজবাহ উদ্দিন নিজেই দ্বিতীয় অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়ে অবগত নন, যদিও তিনি ২০১৭ সাল থেকে এই কমপ্লেক্সে কর্মরত।
তিনি জানান, একটি অ্যাম্বুলেন্সের চালকের চাকরি গত বছর শেষ হয়েছে এবং মেরামত ও জ্বালানির জন্য বরাদ্দের অভাবে এটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তার ভাষ্য, এটা গতি কম, তেল বেশি খায়। এগুলো মানুষ পছন্দও করে না।
পটুয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. খালেদুজ্জামান জানান, আমি এখানে নতুন। আমাকে বিষয়টি বিস্তারিত জানাতে হবে।
চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ
গলাচিপা ও পাশের রাঙ্গাবালী উপজেলার বাসিন্দাদের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছাতে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টার নদীপথ পাড়ি দিতে হয়। বিকেল পাঁচটার পর ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং বর্ষাকালে ছোট ট্রলারে যাতায়াত প্রায় অসম্ভব। ফলে জরুরি রোগীদের চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, এমনকি নদীপথে রোগী মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
চরবিশ্বাস ইউনিয়নের বাসিন্দা ফাহিম হাওলাদার বলেন, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স কী জিনিস, তাই তো চিনি না। এর সুবিধা কীভাবে পাবো? একইভাবে, চরকাজলের হাতেম আকন জানান, সরকারি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স কখনো রোগী নিয়ে চলতে দেখিনি। যদি চালু থাকতো, তাহলে আমাদের উপকার হতো। চরবাংলার ছালমা খাতুনের মতে, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স থাকলে এক ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হতো, যা রোগীদের জীবন বাঁচাতে পারতো।
ছকিনা ভানু আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, কাঠের নৌকায় রোগী তোলার ভয়ঙ্কর মুহূর্ত আমরা বারবার দেখেছি। ঢেউয়ের আঘাতে জীবন নিভে যায়, অথচ আমাদের কিছু করার থাকে না।
দায়িত্বহীনতার অভিযোগ
তরুণ রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক শাহাদাৎ হোসেন বুলবুল এই পরিস্থিতির জন্য দায়িত্বশীলদের অবহেলাকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স হতে পারতো আমাদের প্রাণভোমরা। কতো মানুষ নদীতে প্রাণ হারালো, যদি এগুলো সচল থাকতো, হয়তো তারা আজও বেঁচে থাকতেন। তিনি এই খাতে প্রায় কোটি টাকার অপচয়ের জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের চালক টিটোন কবিরাজ জানান, তিনি একদিনের জন্যও অ্যাম্বুলেন্স চালাননি, কারণ মেশিনে সমস্যা ছিল। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা ডেভেলপমেন্ট ফ্যাসিলিটেটর স্বপন কুমার গনপতি জানান, এই প্রকল্পটি উপজেলা পরিষদের সিদ্ধান্তে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ফান্ড স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এসেছে।
সমাধানের পথ
স্থানীয়রা মনে করেন এই সমস্যা সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি:
- মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ: নৌ-অ্যাম্বুলেন্সগুলোর মেশিন ও যন্ত্রাংশ মেরামতের জন্য বাজেট বরাদ্দ করা।
- চালক নিয়োগ: দক্ষ চালক নিয়োগ এবং তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
- জ্বালানি বরাদ্দ: অ্যাম্বুলেন্স চালানোর জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
- সচেতনতা বৃদ্ধি: স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের সুবিধা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো।
- তদারকি ও জবাবদিহিতা: স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে দায়িত্বহীনতা রোধ করা।
গলাচিপার চরাঞ্চলের মানুষের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স হতে পারত জীবন রক্ষাকারী একটি সমাধান। কিন্তু দায়িত্বহীনতা, সমন্বয়ের অভাব এবং তথ্যের ঘাটতির কারণে এই সম্ভাবনা অব্যবহৃত রয়ে গেছে। সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে এই অ্যাম্বুলেন্সগুলো চরাঞ্চলের অসহায় মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে, এবং নদীপথে জীবনহানির ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব।