‘বিরল আনন্দে’ বিষাদের ছায়া, তিন সন্তানের কান্না থামাতে বাবার আকুতি

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার গোলখালী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এক গ্রাম। ভাঙাচোরা রাস্তার পাশে টিনের একচিলতে ঘর। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে একসুরে তিনটি শিশুর কান্নার আওয়াজ। বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে আছে তিন নবজাতক—হাসান, হোসেন আর মিম। ফুটফুটে তিন শিশুকে ঘিরে মা শারমীনের চোখে যেমন উপচে পড়া আনন্দ, তার চেয়েও বড়ো হয়ে জেঁকে বসেছে এক তীব্র অনিশ্চয়তা আর দুশ্চিন্তার কালো মেঘ।

গত দুই মার্চ ঘর আলো করে একসঙ্গে জন্ম নিয়েছে এই তিন সন্তান। কিন্তু এই ‘বিরল আনন্দ’ নিম্নআয়ের এই পরিবারটির জন্য এখন এক কঠিন বাস্তবতার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। তিন নবজাতকের মুখে দুমুঠো অন্ন আর বুকের দুধের বিকল্প কৌটার দুধ তুলে দিতে গিয়ে এখন প্রতিনিয়ত ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন পেশায় অটোচালক বাবা রাসেল মোল্লা।

রাসেল-শারমীন দম্পতির রাইসা মনি নামে পাঁচ বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। তিন নতুন অতিথি আসার পর পরিবারে এখন মোট সন্তানের সংখ্যা চার। প্রতিদিন অটো চালিয়ে যা আয় হতো, তা দিয়ে আগে কোনো রকমে চারজনের সংসার চলে যেতো। কিন্তু এখন মানুষ বেড়েছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে খরচ।

অটোচালক রাসেল মোল্লা তার অসহায়ত্বের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, আমি দিন আনি দিন খাই। এর মধ্যে আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। লোডশেডিংয়ের কারণে প্রতিদিন অটো চার্জ দিতে পারি না। যেদিন গাড়ি নিয়ে বের হতে পারি না, সেদিন ঘরে এক টাকাও আয় থাকে না। অথচ এখন প্রতিদিনের খরচ আগের চেয়ে চার গুণ।

তিনি জানান, নবজাতকদের পুষ্টির জন্য প্রতিদিন কৌটার দুধের প্রয়োজন হয়। বাজারে বর্তমানে একটি দুধের কৌটার মূল্য প্রায় ৮৫০ টাকা। একটি শিশু যদি দিনে অন্তত ৮০০ মিলিলিটার দুখ খায়, তবে একটি কৌটা তিন থেকে চার দিন যায়। এতে তিন শিশুর জন্য মাসে শুধু দুধের পেছনেই খরচ হচ্ছে ৩০ হাজার টাকারও বেশি। একজন গ্রামীণ অটোচালকের পক্ষে মাসে শুধু দুধের জন্য এই বিপুল অর্থ জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। ফলে প্রতি নিয়ত পরিচিত মানুষদের কাছ থেকে ধার-দেনা ও ঋণ করে সন্তানদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে রাসেলকে।

নুন আনতে পান্তা ফুরানো এই সংসারে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র গরম আর বিদ্যুৎহীনতা। গ্রামে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় রাসেল ও শারমীন দম্পতিকে রাত জেগে হাতপাখা দিয়ে তিন শিশুকে বাতাস করতে হয়। অন্ধকারে মোমবাতির আলোয় চলে তিন শিশুর দেখভাল। টাকার অভাবে শিশুদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধপত্র কিনতেও হিমশিম খাচ্ছেন এই বাবা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাসেল খুবই পরিশ্রমী এক যুবক। কিন্তু হঠাৎ করে একসঙ্গে তিন সন্তানের খরচ সামলানো তার মতো একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সন্তানদের বাঁচাতে গিয়ে সে দিন দিন ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে।

হাসান, হোসেন আর মিম এখনো বোঝে না দারিদ্র্য কী। তারা খিদে লাগলেই কেঁদে ওঠে। কিন্তু সন্তানদের এই কান্নার আওয়াজ বাবা রাসেলের বুকে তীরের মতো বিঁধছে। নিজের সামর্থ্যের শেষবিন্দু দিয়ে চেষ্টা করেও যখন দুধের টাকা জোগাড় করতে পারছেন না, তখন সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের দিকে হাত বাড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছেন না তিনি।

অসহায় এই পরিবারটির পাশে যদি সমাজের কোনো সামর্থ্যবান মানুষ কিংবা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এসে দাঁড়ায়, তবে হয়তো হাসান, হোসেন ও মিমের শৈশবটা একটু সহজ হবে। একটুখানি মানবিক সহায়তাই পারে ঋণের অতল সাগরে ডুবতে থাকা একজন বাবাকে নতুন করে আশার আলো দেখাতে।