সেন্টমার্টিন থেকে ফেরার পথে ট্রলারে গুলি, ‘রোহিঙ্গা’ আহত

সেন্টমার্টিন থেকে কাঠের ট্রলারে ফেরার পথে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে এক ‘রোহিঙ্গা যুবক’ আহত হয়েছেন। তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় ওই ট্রলারের বাকিরা অক্ষত আছেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে টেকনাফের সেন্টমার্টিন রুটের শাহপরীর দ্বীপের কাছে এ ঘটনা ঘটে।

আহত রোহিঙ্গা যুবকের নাম আলী জোহার। তিনি ডান পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। উখিয়ার রোহিঙ্গা ৩-নম্বর ক্যাম্পের জি-৮৪ ব্লকের বাসিন্দা জোহার পেশায় রাজমিস্ত্রী।

প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, আলী জোহার ভবনের কাজ করার জন্য সেন্টমার্টিন দ্বীপে গিয়েছিলেন এবং গত এক মাস ধরে ওই দ্বীপে ছিলেন।

তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকা জোহার কীভাবে ক্যাম্প ছেড়ে দীর্ঘদিন বাহিরে থাকলেন, কাজ করলেন এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আলী জোহার জানান, বৃহস্পতিবার সেন্টমার্টিন থেকে চারটি ট্রলারে করে দ্বীপে আটকা পড়া লোকজনকে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু তারা সেই ট্রলারগুলোতে উঠতে পারেননি। পরে ২৫ থেকে ৩০ জন একজোট হয়ে একটি কাঠের ট্রলার ভাড়া করে রওনা দেন। শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাশ থেকে তীরে ওঠার কথা থাকলেও ট্রলারের মাঝি সেটা না মেনে তাদের নিয়ে যায় শাহপরীর দ্বীপের পূর্বপাশের ঘাটের দিকে। ওই সময়ই মিয়ানমার থেকে দুটি ট্রলার বের হয়ে সীমানার কাছাকাছি এসে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। সেই গুলি এসে লাগে তার ডান পায়ে।

টেকনাফ থানার অফিসার ইনচার্জ ওসমান গনি জানান, বৃহস্পতিবার বোট মালিক সমিতির সভাপতি রশিদ আহমেদের মালিকাধীন চারটি ট্রলারে করে প্রায় ২৫০ জন মানুষ এসেছিলো। ওই ট্রলারগুলোতে গুলির ঘটনা ঘটেনি। প্রশাসনকে না জানিয়ে কেউ এসে থাকলে সেটা তার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

এদিকে স্থানীয় সূত্র বলছে, কক্সবাজারের টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে চলাচল করা ট্রলার ও স্পিডবোট লক্ষ্য করে ওপারে মিয়ানমার থেকে বারবার গুলি ছোড়া হচ্ছে। একের পর এক গুলিবর্ষণের ঘটনায় টানা আট দিন ধরে এ নৌপথে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রলারসহ নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

মঙ্গলবারও একটি স্পিডবোট লক্ষ্য করে ১০ থেকে ১২টি গুলি ছোড়া হয়। তবে স্পিডবোটটিতে থাকা পাঁচ জন যাত্রী প্রাণে বেঁচে গেছেন।

গুলিবর্ষণের ঘটনায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাকি সেখানে যুদ্ধরত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যরা জড়িত তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউই।

এদিকে চলমান পরিস্থির ফলে সেন্টমার্টিন দ্বীপে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সংকটে দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রায় দেড়শ’ মেট্রিক টন খাদ্য পণ্য নিয়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে রওনা হয়েছে ‘এমভি বারো আউলিয়া’ জাহাজ।

শুক্রবার দুপুরে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে খাদ্য পণ্য পাঠানো হয় দ্বীপটিতে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. ইয়ামিন হোসেন এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, জেলা প্রশাসনের ৭৫ মেট্রিক টন খাদ্য পণ্য, কোরবানির জন্য পাঁচটি গরু ও ৩০০ প্যাকেট শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসা সামগ্রী ও তিনজন মিডওয়াইফও দ্বীপটিতে যাচ্ছেন। এছাড়াও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মালামালসহ প্রায় দেড়শ’ মেট্রিক টন খাদ্য পণ্য যাচ্ছে, যা দিয়ে এক মাসের সংকট কাটবে।

তিনি আরও জানান, দ্বীপের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয় করে জাহাজটি পাঠানো হয়েছে। দ্বীপ থেকে বিভিন্ন কাজে কক্সবাজারে এসে আটকে পড়া অনেক বাসিন্দাও এই জাহাজে করে সেন্টমার্টিন ফিরে যাবেন।

২০২০ সালের ৮ নভেম্বর মিয়ানমারের পার্লামেন্টারি নির্বাচনে অং সান সুচির ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ৪১২ আসনের মধ্যে ৩৪৬টিতে জয় পায়। কিন্তু অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করেছে দেশটির সেনাবাহিনী।

২০২১ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। এরপর থেকে তাদের নিপীড়ন-নির্যাতন ও হামলায় অন্তত সাড়ে চার হাজার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। বন্দী করা হয়েছে ২৫ হাজার মানুষকে। জান্তা বাহিনীর নৃশংস হামলায় মিয়ানমার জুড়ে অন্তত ৭৮ হাজার বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে আরাকান আর্মিসহ দেশটির একাধিক বিদ্রোহী সংগঠন জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। এর ফলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

মিয়ানমারের রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশটির সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরকান আর্মির মধ্যে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে যুদ্ধ চলছে। যার আঁচ লেগেছে বাংলাদেশের সীমান্তের গ্রামগুলোতে।