পাগলা মসজিদের দানবাক্সে একের পর এক রেকর্ড, এবার সর্বোচ্চ

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের ১১টি দানবাক্সে এবার রেকর্ড পরিমাণ টাকা মিলেছে। মাত্র তিন মাস ১৩ দিনে এ দানবাক্সগুলোতে পাওয়া আট কোটি ২১ লাখ ৩৪ হাজার ৩০৪ টাকা। যা যাবতকালের সর্বোচ্চ।  এছাড়া স্বর্ণালঙ্কারসহ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া গেছে। 

এর আগে গত ১৭ আগস্ট দানবাক্সগুলোতে সাত কোটি ২২ লাখ ১৩ হাজার ৪৬ টাকা পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এবার বেশি পাওয়া গেলে এর চেয়ে ৯৯ লাখ ২১ হাজার ২৫৮ টাকা।

শনিবার সকাল সাতটার দিকে জেলা প্রশাসক ফৌজিয়া খান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরীসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দানবাক্সগুলো খোলা হয়। 

এরপর রূপালি ব্যাংকের ৮০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, পাগলা মসজিদের এতিমখানার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শহীদি মসজিদের শিক্ষক শিক্ষার্থীসহ তিন শতাধিক মানুষ এ গণনার কাজে অংশ নেন। 

সন্ধ্যা ছয়টার দিকে গণনা শেষে মসজিদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শওকত উদ্দিন বিভিন্ন মুদ্রা ও স্বর্ণ পাওয়ার তথ্য জানান। 

মসজিদ কমিটির কর্মকর্তা ও স্থানীয়রা জানান, জেলা শহরের পশ্চিম প্রান্তে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে তিন একর ৮৮ শতক জায়গা নিয়ে দৃষ্টিনন্দন পাগলা মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সের অবস্থান। সুউচ্চ মিনার ও তিন গম্বুজ বিশিষ্ট তিন তলা পাগলা মসজিদটি অন্যতম ঐতিহাসিক দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা হিসেবে মনে করা হয়। 

মসজিদটি ঘিরে মানুষের কৌতূহলের কোনো শেষ নেই। এখানে দান করলে মনোবাসনা পূর্ণ হয়- এ বিশ্বাস থেকেই পাগলা মসজিদে দেশ-বিদেশের মানুষ দান করেন। নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষ টাকা-পয়সা, স্বর্ণালঙ্কার ও বৈদেশিক মুদ্রা এ মসজিদে দান করে থাকেন। অনেকে রাতে গোপনে এসে এ মসজিদে দান করেন। এমনকি গভীর রাতে দূর-দূরান্ত থেকে বাস ও ব্যক্তিগত গাড়িতে করে এসে মুসলিম, হিন্দুসহ সব ধর্মের নারী-পুরুষ গোপনে এ মসজিদে দান করেন। 

পাগলা মসজিদকে নিয়ে নানান কৌতূহল থাকলেও ২০১৫ সালের পর থেকে এ মসজিদে মানুষের দান করার আগ্রহ বেড়েছে। যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আগে ছয় মাস পর পর আটটি দানবাক্স খোলা হতো। এখন তিন মাস পর পর দানবাক্সগুলো খোলা হয়। আটটির পরিবর্তে একটি বেড়ে এখন নয়টি দানবাক্স রাখা হয়েছে। সর্বশেষ ১১টি দানবাক্স বসানো হয়েছে। 

২০১৫ সালে ছয় মাস পর আটটি বাক্স খুলে পাওয়া গিয়েছিল ৬৫ লাখ টাকা। পরের ছয় মাস পর পাওয়া গিয়েছিল ৭৮ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের দিকে পাওয়া গিয়েছিল সর্বোচ্চ এক কোটি ১০ লাখ টাকা। পরের বার টাকা বেশি পাওয়ায় ছয় মাসের স্থলে তিন মাস পরপর দানবাক্সগুলো খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 

এরপর ধীরে ধীরে দানের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালে ৩১ মার্চে  দানবাক্সগুলোতে পাওয়া গিয়েছিল ৮৪ লাখ ৯২ হাজার টাকা। পরের বছর ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারিতে পাওয়া গিয়েছিল এক কোটি ১৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।  করোনাকালে সবকিছু বন্ধ থাকলেও পাগলা মসজিদে মানুষের দান কমেনি। ২০২০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মসজিদের দানবাক্সে মিলেছিল সর্বোচ্চ এক কোটি ৫০ লাখ ১৮ হাজার টাকা। এরপর থেকেই পাগলা মসজিদে দানের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। 

২০২২ সালের ১২ মার্চ দানবাক্সে পাওয়া গিয়েছিল তিন কোটি ৭৮ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট মিলেছে সাত কোটি ২২ লাখ ১৩ হাজার ৪৬ টাকা।
 
মসজিদ পরিচালনা কমিটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা বীর মুক্তিযোদ্ধা শওকত উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, দানের এ টাকা দিয়ে মসজিদ, মাদ্রাসা এতিমখানার উন্নয়নে কাজ করা হয়। এছাড়া হত দরিদ্রদের ক্যানসার ও জটিল রোগের জন্য চিকিৎসা খাতে সহায়তা করা হয়। তাছাড়া পাগলা মসজিদ কেন্দ্রিক নুরুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসার ১৩০ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ভরণপোষণ এই দানের টাকা দিয়ে করা হয়ে থাকে। মসজিদ কেন্দ্রিক কবরস্থানের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে কাজও করা হয়। মহামারী করোনাকালে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার সরঞ্জামাদি কেনা হয়েছিল। ১১৫ কোটি টাকা দিয়ে দৃষ্টিনন্দন মসজিদ ও আধুনিক ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী জানান, গণনার কাজের সার্বিক নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশসহ পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন।

জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ কমিটির সভাপতি ফৌজিয়া খান জানান, পাগলা মসজিদের দানের টাকা দিয়ে একটি অত্যাধুনিক মসজিদ ও ইসলামী কমপ্লেক্সের কাজ শুরু করা হবে। যেখানে এক সঙ্গে ৩০ হাজার মুসুল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। সেখানে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও নামাজ আদায় করতে পারবেন বলে জানান তিনি। 

প্রচলিত আছে, বাংলার ১২ ভুঁইয়ার অন্যতম ঈশা খানের বংশধর দেওয়ান জিলকদর খান ওরফে জিলকদর পাগলা নরসুন্দা নদীর তীরে বসে নামাজ আদায় করতেন।  তিনি মারা গেলে পরবর্তীতে তার ভক্তরা সেখানে মসজিদটি নির্মাণ করেন। জিলকদর পাগলার নামানুসারেই মসজিদটি ‘পাগলা মসজিদ’  হিসেবে পরিচিতি পায়।