শারদোৎসবে ১৩ জেলায় ‘নিরানন্দ’ মানুষের পাশে ‘সনাতন বন্ধুরা’

উৎসবের আলোয় যখন ঢেকে যায় শহর থেকে গ্রাম, নতুন পোশাকের সুবাসে মেতে ওঠে শিশু থেকে বৃদ্ধ—ঠিক তখনই সমাজের কোনো এক কোণে থমকে থাকে বহু অভাবী মানুষের দিন। তাদের কাছে পূজার আনন্দ মানে কেবলই দীর্ঘশ্বাস। তবে এবারও সেই মলিন মুখে হাসির ঝিলিক ফুটিয়ে এক অন্যরকম উৎসবের বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের একদল তরুণ, যাদের পরিচয়ের মূল ভিত্তি একটাই—মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

সারাদেশে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পথ মাড়িয়ে ‘সনাতন বন্ধুরা সনাতন মানুষের পাশে’—নামে ভার্চুয়াল সংগঠনটি শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে দেশের ১৩টি জেলার ৬৭০ জন ‘নিরানন্দ’ মানুষের হাতে শারদ উপহার হিসেবে পৌঁছে দিয়েছে হয়েছে নতুন বস্ত্র।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটির মুখপাত্র রাজীব মজুমদার জানান, গত ২০ আগস্ট থেকে সংগঠনের সদস্যদের নিজস্ব অর্থায়নে ফান্ড সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। এরপর আট অক্টোবর থেকে হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা (পাইকগাছা), ফেনী, রংপুর, কক্সবাজার, গাইবান্ধা, নারায়ণগঞ্জ, সন্দ্বীপ, নড়াইল, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ এবং টাঙ্গাইল জেলার দূর-দূরান্তের গ্রামে উপহার পৌঁছানোর এই কর্মযজ্ঞ শুরু হয়।

প্রতিটি জেলার রিমোট এলাকা, পাহাড়ি চা বাগান, সুন্দরবনসংলগ্ন অবহেলিত জনপদ এবং বিভিন্ন নদীর চরাঞ্চলে ঘুরে ঘুরে মোট ৪২০ পিস শাড়ি ও ২৫০ পিস লুঙ্গি বিতরণ করা হয়েছে।

সংগঠনের সদস্য প্রশান্ত ভৌমিক, সঞ্জয় সাহা, শুশাংকর মন্ডল, অমিত ভূঁইয়া, কল্যাণ সরকার, জীবন দাশ ও সজল সাহারা জানান, প্রথাগত কোনো বড়ো তহবিল নয়, বরং বন্ধুদের মধ্যে ভালোবাসা ভাগাভাগির এই প্রয়াস সাজাতে তারা প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন। রাত-দিন এক করে অবহেলিত মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাদের সুখ-দুঃখের কথা শুনেছেন এবং তাদের হাতে শারদীয় শুভেচ্ছা তুলে দিয়েছেন।

একক প্রচেষ্টার চেয়ে সম্মিলিত উদ্যোগ যে কতো বড়ো পরিবর্তন আনতে পারে, তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই আয়োজন। মুখপাত্র রাজীব মজুমদার বলেন—কারো একার পক্ষে হয়তো ১০ জনকে সহযোগিতা করা সম্ভব। কিন্তু আমরা যখন সম্মিলিতভাবে হাত বাড়াই, তখন এর পরিধি হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সমাজের সচেতন মানুষ এভাবে এগিয়ে এলে কোনো উৎসবই আর নিরানন্দ থাকবে না।

সংগঠনটির সদস্য শ্রাবণী সাহা, শীবেন রয়, সজীব দাস, তুহিন ও শ্যামলীদের মতে, এই প্রচেষ্টা কেবল পোশাক বিতরণ নয়; এটি ভালোবাসার এক অকৃত্রিম বিনিময়। দেশ ও বিদেশে থাকা সকল সদস্য—যেমন দুবাই প্রবাসী মৃত্যুঞ্জয়, আমেরিকা প্রবাসী চম্পা, ওমান প্রবাসী অজিত সহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য বন্ধুর এই সম্মিলিত প্রয়াসই প্রমাণ করে, দূরত্ব কিংবা সীমাবদ্ধতা মানুষের সেবায় কখনো বাধা হতে পারে না।

Rajib 6

শারদোৎসবের মহালয়া পার হয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে যখন ঢাকের বাদ্য বেজে ওঠার অপেক্ষা, তখন সুন্দরবনের পাশের অবহেলিত গ্রাম কিংবা চায়ের বাগানের প্রবীণ মানুষগুলোর পরনে নতুন শাড়ি-লুঙ্গির এই উপহার কেবলই এক টুকরো কাপড় নয়; এটি তাদের কাছে পরম প্রাপ্তি। ‘সনাতন বন্ধুরা’র এই মানবিক স্পর্শ স্মরণ করিয়ে দেয়—সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আনন্দের জোয়ারে ভাসাই দুর্গোৎসবের প্রকৃত সার্থকতা।