‘ভিডিও দেখলেই মিলবে টাকা’— প্রতারণায় নিঃস্ব নেত্রকোনার শত শত তরুণ

ঘরে বসে সহজে আয় আর ভিডিও দেখলেই মিলবে টাকা—এমন প্রলোভনে পড়ে অনলাইনভিত্তিক ‘স্টারলিংক’ নামের একটি অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে টাকা বিনিয়োগ করে প্রতারিত হয়েছেন নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকার শত শত তরুণ।

প্রাথমিকভাবে নেত্রকোনা সদর উপজেলার রৌহা ইউনিয়নসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় এই অনলাইন স্ক্যামের মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতিদিন কিছু নির্দিষ্ট সময় ভিডিও দেখলে ও মাত্র এক থেকে তিন হাজার টাকা বিনিয়োগ করলেই নিয়মিত মুনাফা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। শুরুর দিকে টাকা তোলা সহজ হওয়ায় অনেকেই বিশ্বাস তৈরি করে বড়ো অঙ্কের টাকা ডালপালা মেলে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু কিছুদিন পরই টাকা উত্তোলনের আবেদন ‘হোল্ড’ বা ‘রিজেক্ট’ করে প্রতারক চক্রটি উধাও হয়ে যায়। রৌহা ইউনিয়নেই এই প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ টাকা। জেলাজুড়ে এই অঙ্ক আরও কয়েক গুণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রৌহা ইউনিয়নের রাহিদ (ছদ্মনাম) নামের এক তরুণ জানান, ইলোন মাস্কের নাম ভাঙিয়ে ‘স্টারলিংক’ নামে এই প্রতারণা চালানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে এক থেকে তিন হাজার টাকার প্যাকেজ কিনে দৈনিক ভিডিও দেখার অফার প্রচার করা হতো। শুরুতে অনেকে টাকা ফেরত পাওয়ায় বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে এবং বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনদেরও এতে যুক্ত করানো হয়।

অন্য এক ভুক্তভোগী ইয়াসিন (ছদ্মনাম) বলেন, পাঁচ-সাত দিন পর টাকা তোলার আবেদন আটকে দেওয়ার পর শর্ত হিসেবে নতুন সদস্য ‘রেফার’ করতে বলা হতো। প্রতিটি নতুন সদস্যে ১০ শতাংশ কমিশন দেওয়ার লোভও দেখানো হতো। টাকা জমার ক্ষেত্রে বিকাশ, নগদ, রকেটের পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেনও ব্যবহার করা হতো।

এদিকে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্টারলিংক নামের একটি ২৪২ সদস্যের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের অ্যাডমিন আকাশ তালুকদার নামের এক তরুণ দাবি করেন, তিনিও নিজে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা খুইয়েছেন এবং সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে থানায় কোনো অভিযোগ জানাননি। ওই অ্যাপ বন্ধের পর এখন একই কৌশলে ‘দেশী মাইনিং’ নামের নতুন আরেকটি স্ক্যাম প্ল্যাটফর্ম চালু হওয়ার তথ্য মিলছে, যা নিয়ে আবারও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রতারণার শিকার হয়েও আইনি জটিলতা ও সামাজিক লজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগীরা থানায় লিখিত অভিযোগ জানাতে দ্বিধাবোধ করছেন।

আইটি বিশেষজ্ঞ মো. আনোয়ার হাসান জানান, এটি একটি চেইনভিত্তিক প্রতারণামূলক স্ক্যামচক্র। শুরুতে কিছু লাভ দিয়ে ফাঁদে ফেলে তারা একসময় পুরো অর্থ হাতিয়ে নেয়। 

সমাজকর্মী মৃণাল কান্তি চক্রবর্তী বলেন, অল্প সময়ে ধনী হওয়ার প্রলোভন থেকে মুক্ত রাখতে যুবসমাজ ও অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল প্রতারণার বিষয়ে পুলিশ নিয়মিত সতর্ক করে থাকে। কেউ এ ধরনের প্রতারণার শিকার হলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা লিখিত অভিযোগ দিতে পারেন। অভিযোগ পেলে প্রযুক্তিগত সহায়তায় ডিভাইস ও চক্র শনাক্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।