নেত্রকোণায় ৩৩ গ্রামীণ নারীকে বিশেষ সম্মাননা

পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানো থেকে শুরু করে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা—গ্রামীণ নারীদের নীরব বিপ্লব ছড়িয়ে রয়েছে কৃষির প্রতিটি পরতে। দেশীয় বীজ টিকিয়ে রাখা, সম্পূর্ণ বিষমুক্ত উপায়ে শাকসবজি চাষ, পরিবেশবান্ধব জৈব সার তৈরি কিংবা কুটিরশিল্পে নৈপুণ্য দেখিয়ে তাঁরা যেমন গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখছেন, তেমনি বাঁচিয়ে রাখছেন হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য ও স্থানীয় জ্ঞান। এসব অসামান্য উদ্যোগের স্বীকৃতি দিতে নেত্রকোণায় ৩৩ জন প্রান্তিক নারীকে দেওয়া হলো ‘গ্রামীণ নারী সম্মাননা-২০২০৬’।

আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার নেত্রকোণা সদর উপজেলার কুতুবপুর এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টারে এই সম্মাননা প্রদান ও ঐতিহ্যবাহী প্রদর্শনী মেলার আয়োজন করা হয়। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা 'বারসিক'-এর উদ্যোগে এবং 'গ্রিন কোয়ালিশন'-এর সহযোগিতায় টানা তৃতীয়বারের মতো এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হলো দিনটি।

এ বছর কৃষিবৈচিত্র্য, বীজ সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিসহ ৩৩টি ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৩৩ জন নারীকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে নেত্রকোণা সদর উপজেলার ২৫ জন এবং কলমাকান্দা উপজেলার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ৮ জন নারী রয়েছেন। সদর উপজেলার কুতুবপুরের পাশাপাশি কলমাকান্দার খারনৈ ইউনিয়নের নয়াপাড়াতেও এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে নারীদের পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চায় নিয়মিত সহযোগিতা করা হচ্ছে।

সম্মাননা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি আয়োজন করা হয় এক জমকালো কৃষিপণ্য ও দেশীয় বীজের প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে গ্রামীণ নারীদের নিজেদের হাতে সংরক্ষিত ২২৫ ধরনের ধানের বীজ, ৭৩ জাতের সবজির বীজ, ৩৬ জাতের মৌসুমি সবজি, ২৭ পদের অপ্রচলিত শাকসবজি, ১৭ জাতের ফল, ১১ ধরনের প্রাকৃতিক জৈব বালাইনাশক এবং ১৪ পদের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পের উপকরণ তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, দেশকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ও সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে নারী-পুরুষকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। সভ্যতার সূচনা যেমন নারীর হাত ধরে হয়েছিল, তেমনই এক টেকসই ভবিষ্যতের দিকেও সভ্যতা এগিয়ে যাবে নারীদের পথচলায়। প্রান্তিক পর্যায়ের এই উদ্ভাবনী নারীদের স্বীকৃতি দেওয়াকে তিনি অত্যন্ত সময়োপযোগী উদ্যোগ বলে মন্তব্য করেন।

বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী অহিদুর রহমান জানান, কৃষাণীদের প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে নিয়ে আসাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে অন্য নারী ও তরুণ প্রজন্ম নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও টেকসই কৃষিচর্চায় উদ্বুদ্ধ হবেন।

নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ ও টেকসই পরিবেশ গঠনে গ্রামীণ নারীদের হাতে সংরক্ষিত এসব দেশীয় বীজ ও প্রাকৃতিক কৃষিচর্চা এক বড় শক্তি। তাঁদের এই অকৃত্রিম অবদানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রয়োজনীয় সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা ও উপযুক্ত সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।