নীলফামারীতে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, আহত ২৫

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে একই জায়গায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি পালনের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন।

শনিবার রাত আটটার দিকে শুরু হওয়া দফায় দফায় এই ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় চলে  রাতে ১০টা পর্যন্ত।

ঘটনার পর থেকেই উপজেলা জুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে উপজেলায় আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারীর টহল জোরদার করা হয়েছে।

দলীয় সূত্র জানা যায়, রোববার উদযাপিত হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে একই জায়গায় কিশোরগঞ্জ দ্বি-মুখি উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরে দোয়া মাহফিলের কর্মসূচির আহ্বান করে উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক (বর্তমান কমিটির সদস্য) মাসুদ রানা পাটোয়ারীর নেতৃত্বাধীন একটি গ্রুপ এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সাধারণ সম্পাদক একেএম তাজুল ইসলাম ডালিম নেতৃত্বাধীন অন্য গ্রুপ।

এনিয়ে শনিবার রাত সাড়ে সাতটার দিকে দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। এতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার জানান দিতে উভয় গ্রুপ কর্মী-সমর্থক নিয়ে কিশোরগঞ্জ বাজার এলাকায় পৃথক দুই স্থানে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা পাটোয়ারীর নেতৃত্বে তার কর্মী-সমর্থকরা  ধাওয়া করে মামুন-ডালিমের নেতৃত্বাধীন গ্রুপকে।

মামুন-ডালিমের নেতৃত্বাধীন গ্রুপের কর্মী-সমর্থকরা একত্রিত হয়ে পাল্টা ধাওয়া করে মাসুদ গ্রুপকে। এরপর দফায় দফায় দুই গ্রুপের ওই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে প্রায় দেড় ঘণ্টা। এতে মাসুদ রানা পাটোয়ারীর ভাই কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা জাতীয় পার্টির নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ওরফে গ্রেনেড বাবুসহ উভয় গ্রুপের অন্তত ২৫ জন আহত হন। খবর পেয়ে কিশোরগঞ্জ থানা পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং র‌্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে ছত্রভঙ্গ হয় উভয় গ্রুপ।

উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা পাটোয়ারী অভিযোগ করে বলেন, দলের খারাপ সময়ে আমরা যারা ত্যাগী নেতাকর্মী আছি আমাদের বঞ্চিত করে পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে উপজেলা বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়েছে। বেবী নাজনীনের নেতৃত্বে আমরা কিশোরগঞ্জ উপজেলায় দলের খারাপ সময় থেকে এখন পর্যন্ত রাজপথে নেমে থেকে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা যারা ত্যাগ স্বীকার করেছি আমাদের বাদ দিয়ে পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে ভিন্ন দল থেকে আসা লোকদের হাতে কমিটির নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন জাতীয় পার্টির নেতা ছিলেন। অপরদিকে সাধারণ সম্পাদক একে.এম তাজুল ইসলাম ডালিম ছিলেন উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। মামুন-ডালিম নেতৃত্বাধীন কমিটি কখনই দলের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেনি।

তিনি বলেন, হাসিনা সরকারকে উৎখাতে ছাত্র-জনতার সাথে আমরা দুর্বার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছি। দলীয় পদ-পদবি বঞ্চিত আমিসহ অন্যান্য ত্যাগী নেতাকর্মীরা আমরা জিয়ার সৈনিক এটাই আমাদের বড় পরিচয়। সমানে নির্বাচন আসছে, আমি উপজেলার প্রত্যেকটি ইউনিয়নে ত্যাগী, বঞ্চিত নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করছি। কেন্দ্রের প্রত্যেকটি কর্মসূচি আমরা পালন করে আসছি। তারই ধারাবিহকতায় দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের সিদ্ধান্ত নেই।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কিশোরগঞ্জ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ ও থানার সাথে কথা বলে এটি এক সপ্তাহ আগে এই স্থানটি নির্ধারণ করেছি। শনিবার সকালে স্কুল কর্তৃপক্ষের জানায় এখানে মামুন-ডালিমের নেতৃত্বাধীন কমিটি দোয়া মাহফিল করবে। আমি এ বিষয়ে মামুন-ডালিমকে ফোন দিয়ে বলি ‘ভাই আমি এক সপ্তাহ আগে এই স্থানের অনুমতি নিয়েছি, আমরা নেওয়া স্থানে কেনো কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছো, তোমরা ঝামেলা করতে একই স্থানে কর্মসূচি দিলা? তোমরা পার্টি অফিসে তোমাদের কর্মসূচি পালন করো।

মাসুদ রানা বলেন, এরপর রাতে মামুন-ডালিমের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দিকে আসলে আমি ও আমার ছোট ভাইসহ আমার লোকজন তাদের ধাওয়া দিলে তারা পালিয়ে যায়। পরে আওয়ামী লীগ-যুবলীগের সাথে যোগসাজশ করে মামুন-ডালিমের লোকজন আমাদের ওপর হামলা চালায়। তাদের হামলায় আমার ছোট ভাইসহ ১০ জন আহত হয়েছে।

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আমার ভাই গ্রেনেড বাবুর ছেলে এই উপজেলার সমন্বয়কারী হিসেবে নেতৃত্বে দিয়েছে সেই জন্য আওয়ামী লীগ এ সুযোগটা নিলো, যোগ করেন মাসুদ রানা।

nilfamari-bnp1

এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মাসুদ রানা পাটোয়ারী উপজেলা বিএনপির সদস্য। দলীয় শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের দায়ে তার সদস্য পদ স্থগিত রয়েছে। তার ছোট ভাই সদর ইউপি বর্তমান চেয়ারম্যান গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের ঘোষণা দিয়েছে মাসুদ রানা। গ্রেনেড বাবু একসময় উপজেলা যুবদলের নেতা থাকলেও পরবর্তীতে সে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে লাঙল প্রতীক নিয়ে কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এখন সে নিজেকে বিএনপি দলীয় দাবি করছে।

তিনি বলেন, শনিবার কিশোরগঞ্জ বাজার এলাকায় আমাদের কয়েকজন দলীয় নেতাকর্মীর সামনে বাবু ঘোষণা দেয় রোববার গরু জবাই করে মানুষকে খাইয়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করবো আমি ও আমার বড় ভাই মাসুদ। তার এমন কথায় আমাদের দলীয় নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ জানিয়ে দলীয় কার্যালয়ে ফিরে আসে। আমিসহ দলের নেতাকর্মীরা পার্টি অফিসে ছিলাম। এক পর্যায়ে গ্রেনেড বাবু ও মাসুদ রানার নেতৃত্বে তার লোকজন আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে আমাদের ১৫ জন নেতাকর্মীকে আহত করে। পরে খবর পেয়ে বিভিন্নস্থানে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীসহ বাজারের লোকজন একত্রিত হয়ে তাদের ধাওয়া করলে তারা পালিয়ে যায়।

তিনি জানান, আহত নেতাকর্মীরা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলে এখনও কয়েকজন গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আমরা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিবো।

কিশোরগঞ্জ থানার ওসি পলাশ চন্দ্র মন্ডল জানান, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াসহ সংঘর্ষের সংবাদ পাওয়া গেছে। স্থানীয় থানা পুলিশে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে পুলিশ সুপারকে অবগত করার পর সেনাবাহিনীসহ যৌথ বাহিনী আসায় দুই গ্রুপ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক।