কেন অল্প বয়সেই মাদকের ফাঁদে শিশু তারকারা?

অভিনেত্রী হেইডেন পেনেটিয়ার মৃত্যুর পর গ্লামার জগতের সঙ্গে মাদকাসক্তের বিষাক্ত সম্পর্কের বিষয়টি আবারও লাইম লাইটে। ক্রমেই বেরিয়ে হলিউডের ঝলমলে আলো ও আড়ালের সব অন্ধকার। মাত্র ১৬ বছর বয়সে যখন জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল ‘হিরোস’-এর জন্য লাল গালিচায় পা রাখেন, ঠিক তখনই হলিউডের গ্ল্যামার জগতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে হেইডেন পেনেটিয়ারের জীবনে প্রথম মাদকের আগমন ঘটেছিল।

এনবিসির হিট সায়েন্স ফিকশন সিরিয়ালের কারণে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠা এই কিশোরী তীব্র মানসিক চাপ এবং ক্লান্তিতে ভুগছিলেন। নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন, রেড কার্পেটে যাওয়ার আগে এনার্জি বাড়ানোর কথা বলে তাঁর নিজের দলেরই এক সদস্য তাঁকে প্রথম একটি পিল বা বড়ি খেতে দেন।

মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগেই পেনেটিয়ার তাঁর আত্মজীবনী প্রকাশ করেছিলেন
‘কয়েক মিনিটের মধ্যেই শরীরে এক অলৌকিক শক্তির ঢেউ খেলে যায়, মনে হয়েছিল জীবনের সবচেয়ে সতেজ ঘুম থেকে জেগে উঠেছি’- নিজের প্রকাশিত বইয়ে পেনেটিয়ার সেই ওষুধটি সম্পর্কে লিখেছিলেন। তিনি এই পিলকে বলেছিন এমন এক 'গেটওয়ে ড্রাগ' যা তাঁকে ধীরে ধীরে ওষুধের ওপর নির্ভরশীল করে নেশার অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিয়েছিল।

মাত্র ৩৬ বছর বয়সে এই তারকার আকস্মিক মৃত্যু তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য ও মাদকাসক্তির সাথে দীর্ঘ লড়াইকে আবার জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। একইসঙ্গে শিশু তারকাদের ওপর হলিউডের তৈরি করা চরম মানসিক চাপ নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে।

রাতারাতি তারকা হবার প্রভাবে তীব্র মানসিক চাপ এবং ক্লান্তিতে ভুগছিলেন হেইডেন পেনেটিয়ার
দক্ষিণ ক্যারোলিনার গ্রিনভিলের করোনাস অফিস জানিয়েছে, জরুরি সেবাদানকারী দল কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত এক নারীকে চিকিৎসা দিয়েছিল এবং ময়নাতদন্তে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

পুলিশের কল রেকর্ড থেকে জানা যায়, অতিরিক্ত ড্রাগ নেওয়ার (ওভারডোজ) কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়েই উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থলে যান এবং তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। সে সময় তাঁর সাবেক প্রেমিক ব্রায়ান হিকারসন এবং তাঁর ভাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে পুলিশের মতে, তাঁদের কোনো অপরাধমূলক জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে হেইডেন পেনেটিয়ারের জীবনে প্রথম মাদকের আগমন ঘটেছিল
মৃত্যুর পেছনে মাদক বা অ্যালকোহলের সরাসরি হাত ছিল কি না তা স্পষ্ট নয়, তবে আমেরিকার ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি এই মৃত্যুর তদন্তে যুক্ত হয়েছে। কম বয়সে খ্যাতি অর্জনের পর মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াই করা বহু তারকার তালিকায় হেইডেন অন্যতম। বিশেষজ্ঞরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, অল্প বয়সে অতিরিক্ত খ্যাতির মুখোমুখি হওয়া ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্য ও মাদকাসক্তির ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।

মিসিসিপির অক্সফোর্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারের মেডিকেল ডিরেক্টর লুকাস ট্রটম্যানের মতে, সাধারণ মানুষের চোখে মনে হতে পারে শিশু তারকাদের হাতের মুঠোয় অর্থ ও খ্যাতি সবই আছে।

কিন্তু মনে রাখা দরকার, তাদের মানসিক বিকাশের সময় এমন কিছু অভিজ্ঞতা ও প্রাপ্তবয়স্ক পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়, যা একজন সাধারণ মানুষকে পোহাতে হয় না। এই ট্রমাটিক অভিজ্ঞতাগুলোই তাদের মাদকাসক্তির মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মাত্র ১২ বছর বয়সে রিহ্যাবে যান অভিনেত্রী ড্রিউ ব্যারিমোর
মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগেই পেনেটিয়ার তাঁর আত্মজীবনী প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে তিনি নিজের মাদকাসক্তি, প্রসবপরবর্তী বিষণ্নতা এবং তাঁর ২৮ বছর বয়সী ভাইয়ের মৃত্যুর কষ্ট নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছিলেন। হেজেলডেন বেটি ফোর্ড সেন্টারের ভাইস প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ময়্যার্স বলেন, নিজের জীবনের সংগ্রাম এভাবে সবার সামনে শেয়ার করা সম্মানের যোগ্য হলেও, প্রতিনিয়ত মিডিয়ার ক্যামেরার নজরদারি তাঁকে মানসিকভাবে সুস্থ হওয়ার কোনো সুযোগ বা অবকাশ দেয়নি।

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, শিশু তারকারা প্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষাবলয় ছাড়াই খুব সহজে মদ ও মাদকের নাগাল পেয়ে যায়। অতি অল্প বয়সে ‘না’ বলা বা প্রলোভন এড়িয়ে চলার মতো মানসিক পরিপক্কতা তাদের থাকে না। অতীতে ড্রিউ ব্যারিমোর (১২ বছর বয়সে রিহ্যাবে যান) এবং ডেমি লোভাটোর মতো তারকারাও শিশু বয়সে মাদকাসক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন।

ডেমি লোভাটোর মতো তারকারাও শিশু বয়সে মাদকাসক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন
সম্প্রতি পেনেটিয়ারের বিদায়ের পর হলিউড অভিনেত্রী মিশেল রদ্রিগেজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এত কম বয়সে তরুণ তারকাদের চলে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের। একের পর এক এমন ঘটনা কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না। উল্লেখ্য, পেনেটিয়ারের আগে গত বছর মিশেল ট্র্যাকটেনবার্গ এবং ড্যাভি চেসের মতো শিশু তারকারাও মাদকের সঙ্গে লড়াই করে প্রাণ হারিয়েছেন।

প্রাক্তন ডিসনি স্টার ক্রিস্টি কার্লসন রোমানো শিশু বয়সের খ্যাতিকে এক ধরণের 'মানসিক আঘাতজনিত রোগ'-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, শৈশবেই যখন স্বাধীনতা হারিয়ে যায় আর তার জায়গা নেয় লোকচক্ষুর নজরদারি, প্রত্যাখ্যান আর অতিরিক্ত মানসিক চাপ, তখন সেই শিশুর জীবনের কোনো ভবিষ্যৎ থাকে না। আর যখন বয়স বা ক্যারিয়ারের কারণে তাদের এই পরিচিতি বা খ্যাতি কমে যায়, তখন ব্রেন ডোপামিনের অভাব দূর করতে তারা ওষুধের ওপর আরও বেশি নির্ভর হয়ে পড়ে।

তাছাড়া অনেক শিশু তারকার মা-বাবাই তাদের প্রফেশনাল ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন, যা পারিবারিক ও পেশাদারি সীমানা ধ্বংস করে দেয়। পেনেটিয়ার মাত্র ১১ মাস বয়সে প্রথম বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেন। তিনি স্বীকার করেছিলেন, তাঁর মা সবসময় তাঁকে সফল করার জন্য চরম চাপ দিতেন, যা তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ ছিল না।

পেনেটিয়ারের ভাই জেনসেনও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান
অতিরিক্ত মাদক ও অ্যালকোহল সেবন শরীরের লিভার, হার্টসহ অন্যান্য অঙ্গ স্থায়ীভাবে অচল করে দেয়। পেনেটিয়ারের ভাই জেনসেনও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান এবং মৃত্যুর আগে তিনিও কোকেন ও হেরোইনে আসক্ত ছিলেন। ভাইয়ের মৃত্যুর পর পেনেটিয়ার নিজে সুস্থ থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকরা তাঁকে আগেই সতর্ক করেছিলেন, মদ খাওয়া বন্ধ না করলে পাঁচ বছরের বেশি তিনি বাঁচবেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তি একটি ক্রনিক ব্যাধি। সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যেও রিলেপ্স বা পুরনো অভ্যাসে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। হেইডেনের এই অকাল প্রস্থান আরও একবার প্রমাণ করে দিল—গ্ল্যামারের ঝলমলে আলোর পেছনে কতটা বিভীষিকাময় আঁধার লুকিয়ে থাকে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি