না ফেরার দেশে কান্ট্রি মিউজিকের রানি ডলি পার্টন

সংগীত জগতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, কান্ট্রি মিউজিকের কিংবদন্তি রানি এবং মানবতাবাদী অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব ডলি পার্টন আর নেই। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশভিলের ভ্যান্ডারবিল্ট-ইনগ্রাম ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অত্যন্ত শান্তিতে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘ অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে নিজের সুর ও কণ্ঠ দিয়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করা এই শিল্পী পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে শেষ বিদায় নেন।

Dolly Parton 06
সংগীতজীবন এবং পরোপকারী স্বভাবের জন্য ডলি পার্টন ছিলেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা এবং বিশেষ করে ২০২৫ সালের মার্চে তাঁর স্বামী কার্ল ডিনের প্রয়াণের পর তিনি নিজেই নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নেওয়া কমিয়ে দিয়েছিলেন বলে এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর মুখপাত্র মার্সেল পারিসো জানান, ক্যান্সারের সাথে স্বল্পমেয়াদী কিন্তু বীরত্বপূর্ণ লড়াই শেষে এই মহান শিল্পী না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

Dolly Parton 01
দারিদ্র্য থেকে সাফল্যের শিখরে:
১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি টেনেসির প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক অস্বচ্ছল পরিবারে জন্ম নেন ডলি পার্টন। ১২ ভাইবোনের পরিবারটি ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। ৭ বছর বয়সে কাকার দেয়া গিটারে সুর তোলার মাধ্যমে সংগীতের সাথে তাঁর পথচলা শুরু হয়। নিজের মায়ের সেলাই করা পোশাকের গল্প নিয়ে তিনি লিখেছিলেন বিখ্যাত গান ‘কোট অব মেনি কালারস’।

হাইস্কুল শেষ করেই সংগীত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে তিনি ন্যাশভিলে চলে যান। ১৯৬৬ সালে বিয়ে করেন কার্ল ডিনকে, যিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৫৯ বছর ধরে আড়ালে থেকে তাঁর অন্যতম বড় শক্তি হয়ে ছিলেন। ১৯৭১ সালে ‘জোশুয়া’ গানের মাধ্যমে চার্টে প্রথম শীর্ষস্থান পান ডলি।

Dolly Parton 05
এরপর উইটনি হিউস্টনের গলায় অমর হয়ে ওঠা বিশ্বখ্যাত ভালোবাসার গান ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’, ‘জোলিন’ এবং কর্মজীবী নারীদের অধিকারের প্রতীক হয়ে ওঠা ‘নাইন টু ফাইভ’-এর মতো কালজয়ী গান রচনা করেন তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি ৩,০০০-এরও বেশি গান লিখেছেন, ৪৯টি অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন এবং সর্বমোট ১১টি গ্র্যামি পুরস্কার অর্জন করেছেন।

সুর থেকে রূপালী পর্দা: মঞ্চ মাতানোর পর ডলি তাঁর দ্যুতি ছড়িয়েছেন হলিউডের রূপালী পর্দায়ও। ১৯৮০ সালে ‘নাইন টু ফাইভ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক ঘটে। পরবর্তীতে ‘দ্য বেস্ট লিটল হোরহাউজ ইন টেক্সাস’ এবং ‘স্টীল ম্যাগগোলিয়াস’-এর মতো সফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি তরুণ প্রজন্মের মন জয় করেন। ২০০৫ সালে ‘ট্রাভেলিন থ্রু’ গানের জন্য তিনি দ্বিতীয়বার অস্কারের জন্য মনোনীত হন। সমাজ ও মানুষের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তিনি সব সময় শ্রদ্ধেয় ছিলেন।

Dolly Parton 04
মানবতার সেবায় অনন্য অবদান:  
শুধু সংগীত নয়, জনসেবায় ডলির অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। নিজের মাতৃভূমির অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফেরাতে ১৯৮৬ সালে তিনি ‘ডলিউড’ থিম পার্ক চালু করেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রেখে আসছে। বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি গঠন করেন একটি পাঠাগার, যার মাধ্যমে বিশ্বের শিশুদের মাঝে ৩০ কোটিরও বেশি বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।

২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময়ে প্রতিষেধক তৈরির গবেষণা ত্বরান্বিত করতে তিনি আধুনিক ‘মডার্না’ ভ্যাকসিনের গবেষণায় নিজস্ব তহবিল থেকে ১ মিলিয়ন ডলার অনুদান প্রদান করেছিলেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ত্রাণ কার্যক্রমেও তিনি সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

Dolly Parton 02
কান্ট্রি মিউজিক হল অব ফেম এবং রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম-এ স্থান পাওয়া এই কালজয়ী তারকা ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালে রাখতেই ভালোবাসতেন। তাঁর সুরের জাদু, প্রাণবন্ত হাসি এবং অসীম মানবপ্রেমের গল্প তাঁকে চিরদিন বিশ্ববাসীর হৃদয়ে অমলিন করে রাখবে।

তথ্যসূত্র: সিএনএন