বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে আল্পস পর্বতমালার হাজার বছরের পুরোনো হিমবাহগুলো দ্রুত গলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। এই বিপর্যয় রুখতে প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে এক ব্যতিক্রমী ও পরিবেশবান্ধব পরীক্ষা শুরু করেছেন সুইজারল্যান্ডের গবেষকেরা। গলে যাওয়া হিমবাহের বরফ বাঁচাতে কৃত্রিম প্লাস্টিকের বদলে এবার ব্যবহার করা হচ্ছে ভেড়ার উল।
সাধারণত সূর্যালোক প্রতিফলিত করতে এবং তাপমাত্রা শোষণ কমাতে গ্রীষ্মকালে হিমবাহ ও বরফাবৃত অঞ্চলে সিন্থেটিক বা প্লাস্টিকের ত্রিপল বিছিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এসব প্লাস্টিকজাতীয় কভার থেকে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর 'মাইক্রোফাইবার' সূক্ষ্ম কণা হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
এই দূষণ রোধে সুইজারল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলের 'তসানফ্লুরন' হিমবাহের বরফ গলা কমাতে পরিবেশবাদী সংগঠন 'সামিট ফাউন্ডেশন' এবং 'ইউনিভার্সিটি অব লসান'-এর যৌথ উদ্যোগে শুরু হয়েছে ‘কিপ ইট উল’ নামক একটি বিশেষ প্রকল্প।
২০২৬ সালের গ্রীষ্মের চরম তাপদাহে নির্ধারিত সময়ের কয়েক সপ্তাহ আগেই আল্পসের বরফ গলতে শুরু করে। বরফ ক্ষয়ের ফলে সৃষ্ট ভূমিধস ২০২৫ সালে ব্লাটেন গ্রামকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল এবং গত সপ্তাহে হিমালয়ে প্রলয়ঙ্করী আকস্মিক বন্যার জন্ম দিয়েছে।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক টিমোথি স্টেইনার জানান, বায়োডিগ্রেডেবল বা পচনশীল উপাদানের ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি সুইজারল্যান্ডে প্রতি বছর যে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ ভেড়ার উল ফেলে দেওয়া হয়, তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ। চারজন মাস্টার্স শিক্ষার্থী প্রথম এই ধারণাটি উপস্থাপন করেন।
চলতি বছরের জুন মাসে সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান 'ফিসোলান'-এর তৈরি উলের দুটি প্রোটোটাইপ কম্বল তসানফ্লুরন হিমবাহের ২০০ বর্গমিটার এলাকায় বিছিয়ে দেওয়া হয়। পুরো গ্রীষ্মজুড়ে গবেষকেরা কৃত্রিম জিওটেক্সটাইল কভারের সঙ্গে এই উলের কভারের তুলনা করে দেখেছেন।
প্রাথমিক ফলাফল গবেষকদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রতি দুই সপ্তাহে নেয়া পরিমাপ অনুযায়ী, উলের তৈরি কভার সিন্থেটিক বা প্লাস্টিকের কভারের মতোই সফলভাবে বরফ গলা কমাতে সক্ষম হয়েছে। উলের স্থায়িত্ব দেখে ফিসোলানের কর্মকর্তা নিসলাউস সেগেসার এবং গবেষক শিক্ষার্থী এলিয়ট গাফিওট দারুণ বিস্ময় ও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তবে এই প্রকল্পের উদ্যোক্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, ভেড়ার উলের কম্বল কেবল সাময়িকভাবে স্থানীয় পর্যায়ে বরফ গলার গতি কিছুটা কমাতে পারে, কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মতো বিশাল সংকটের এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আল্পসের হিমবাহ রক্ষা করা কঠিন হবে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স