অপুষ্টি: লুকিয়ে থাকা নীরব ক্ষুধা

‘সঠিক পুষ্টিতে সুস্থ জীবন’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পালিত হচ্ছে জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ ২০২২। ২৩ এপ্রিল শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই পুষ্টি সপ্তাহের কার্যক্রম চলবে আগামী ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত। ২৪ এপ্রিল, রোববার পুষ্টি সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ প্রিভেনটিভ এন্ড সোশ্যাল মেডিসিন- নিপসম আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পুষ্টি সপ্তাহের উদ্বোধন করেন তিনি।

এবারের সপ্তাহব্যাপী প্রচারণায় মূলত সাতটি বার্তা দিতে চাইছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বার্তাগুলো হলো-

• জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে শালদুধ খাওয়ানো।

• শিশুকে ৬ মাস পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ এবং ৬ মাস বয়সের পর থেকে ২ বছর পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি সুষম খাবার দেয়া। 

• শিশু সঠিকভাবে বেড়ে উঠছে কি না জানতে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত ওজন ও উচ্চতা পরিমাপ করা।

• কিশোর-কিশোরীদের ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে উৎসাহিত করা। 

• গর্ভবতী ও প্রসূতি মাকে স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি বাড়তি খাবার দেয়া এবং নিয়মানুযায়ী আয়রন-ফলিক এসিড ও ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাওয়ানো।

• পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের পুষ্টি চাহিদার প্রতি নজর দেয়া।

• স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং কোভিড প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের গড়ে প্রতিদিন ২১০০ কিলোক্যালরি প্রয়োজন হয়। অনেক সময় বেশি খাবার খেলেও এই পরিমাণ খাদ্যগুণ ওসব নির্দিষ্ট খাবার অনুপস্থিত থাকে ফলে মানুষ পুষ্টির অভাবে ভোগে। তাই পুষ্টিহীনতার জন্য যেমন অভাব দায়ী তেমনি অসচেতনতাও সমানভাবে দায়ী।  


আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের স্বাস্থ্য সূচকে বাংলাদেশে অগ্রগতি থাকলেও অপুষ্টি দূর করা এখনো জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২১ সালের তথ্য বলছে, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টিতে ভুগছে ৩১ শতাংশ শিশু আর তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে ৮ শতাংশ শিশু। এই অপুষ্টির কারণে শিশু খর্বকায়তা এবং কৃশতায় ভুগছে। 

বয়সের অনুপাতে কম ওজনের শিশুর হার এখন ২২ শতাংশ। একারণে বার বারই শিশুকে শাল দুধ খাওয়ানোসহ দুইবছর পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। পাশাপাশি দেশীয় শাক-সবজি আর ডিমের মতো আমিষ জাতীয় খাবার মাছ-মাংসের মত দামী আমিষ জাতীয় খাবারের বিকল্প হতে পারে বলে জানান তারা।

শুধু শিশুরা নয় পরিবার নারী সদস্যটিরও পুরুষের তুলনায় অপুষ্টিতে ভোগার প্রবণতা বেশী।  যার কারণে রক্ত স্বল্পতায় ভুগছেন নারীরা।  অপুষ্টির কারণেই  ৪০-৪২ শতাংশ শিশু ও নারী আয়োডিন স্বল্পতায় ভুগছেন।  শুধু নারীরাই নয় পরিবারের প্রবীণ সদস্যটিও নানা কারণে অপুষ্টিতে ভুগে থাকেন।

পৃথিবীতে মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশ প্রবীণ যাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি যার মধ্যে ২৩ শতাংশ প্রবীণ অপুষ্টিতে ভুগছে। বাংলাদেশেও এই চিত্র খুব সুখকর নয়।  গেলো বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের এক চতুর্থাংশ প্রবীণ জনগোষ্ঠীই অপুষ্টিতে ভুগছেন। যা মোট প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ২৫.৬ শতাংশ। 

আর পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে আছেন অর্ধেকেরও বেশী প্রবীণ। ৫৮.৪ শতাংশ প্রবীণ এই ঝুঁকিতে আছেন। তুলনামূলকভাবে পুরুষের চাইতে নারীদের মাঝে অপুষ্টির হার বেশি। খাবারের অভাব নয় বরং মানসিক অস্থিরতা, বিষণ্ণতা, বিভিন্ন অসুস্থতা, খাবার গ্রহণের অক্ষমতা, মুখ ও দাঁতের সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়াই প্রবীণদের পুষ্টিহীনতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ওই গবেষণায়। 

এতে বলা হয়, ৩১৩ শতাংশ অপুষ্টিতে ভোগা প্রবীণেরা তেলজাতীয় খাবার পরিহার করেন, ২৫ শতাংশ প্রবীণ মাংস ও দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলেন।  তাই প্রবীণদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসের বিষয়ে গাইডলাইন করে কঠোরভাবে তা পালন করা গেলে প্রবীণদের মধ্যে অপুষ্টির প্রবণতা কমে আসবে বলে মনে করেন গবেষকেরা।  

আরও পড়ুন: ভবন নির্মাণের সময় ফুটপাত দখল না করার নির্দেশ

অপুষ্টিকে বলা হয়  লুকায়িত নীরব ক্ষুধা। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অপুষ্টির শিকার প্রায় ৬৯ কোটি মানুষ। এই মানুষগুলোর অনেকেই পুষ্টিকর মাছ-মাংস , শাক-সবজি কিংবা ফলমূলের মত পুষ্টিকর খাবার কিনে খেতে পারেন না। আবার অনেকে জানেনও না এরচেয়ে কম মূল্যেও হয়তো পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব। 

তবে বর্তমান গতিশীল বিশ্বে আরেকটি সমস্যা প্যাকেটজাত খাবারের বহুল প্রচলন। সময়ের অভাবে অনেকেই প্যাকেটজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীল বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের জীবন ব্যবস্থায় প্যাকেটজাত খাবারের বিকল্প নেই।  

কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই এসব প্যাকেটজাত খাবারে দিনের প্রয়োজনীয় পুষ্টি বিদ্যমান থাকে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্দিষ্ট পুষ্টিমানের তাজা খাবার গ্রহণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি শিশু, নারী এবং প্রবীণ এই তিন জনগোষ্ঠীর জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে বিশেষ সচেতনতা কার্যক্রম প্রয়োজন বলেও মনে করেন তারা।



ছবি: ইউনিসেফের সৌজন্যে