এমনটা হয় আমাদের। কোন কোন বিষয় আমাদের জীবনে এতোটাই
স্বাভাবিক আর নিয়মিত যে তার গুরুত্ব আলাদা ভাবে টের পাই না। এই যেমন বাতাস। বাতাস
আমরা না দেখতে পাই, না ধরতে পারি। অথচ বাতাসের সমুদ্রে
আমাদের বসবাস, আমাদের বেঁচে থাকা। বাতাস নেই মানে আমি নেই,তুমি নেই, আমরা নেই। প্রাণের অস্তিত্ব নেই।
বাতাসে আছে আমাদের জীবনের জ্বালানি অক্সিজেন। এই কোভিড সময়ে আমরা দেখেছি অক্সিজেন আমাদের কী ভাবে বাঁচিয়ে রাখে!
বাতাস নাক-মুখ দিয়ে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। শ্বাস তন্ত্রের বিভিন্ন নালি পেরিয়ে পৌছে যায় আমাদের ফুসফুসে। সেখানে আছে প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ছোট ছোট বায়ু থলি।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই বায়ু থলির নাম অ্যালভিওলাস (Alveolus, বহু বচনে Alveoli)। এই বায়ু থলিগুলোর দেয়াল খুবই সূক্ষ, বাতাস এই বায়ু থলি থেকে রক্তে পৌঁছে যায় অনায়াসে আর তার মাধ্যমে সারা দেহে।
এই পুরো ব্যবস্থাপনা আমাদের সুস্থ থাকার, ভালো ভাবে বেঁচে থাকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি আমাদের অসুস্থতার কারণ হয়।
অনেক সময় এই বায়ু থলি ফুটা হয়ে যায়। ফলে বায়ু থলির বাতাস ফুসফুস থেকে বের হয়ে আমাদের বুকের ভিতরে জমা হয়। ফুটা হলে বেলুন যেমন চুপসে যায় তেমনি ফুসফুসও চুপসে যায়, হতে পারে তা পুরোপুরি বা আংশিক।
এই চুপসে যাওয়া ফুসফুসে বাতাস থাকে না বা কম থাকে। ফলে শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণও যায় কমে। অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে আমাদের শ্বাস কষ্ট হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থার নাম নিউমোথোরাক্স, সহজ বাংলায় বলতে পারি ‘বুকের ভেতর বাতাস জমা হওয়া’।
নিউমোথোরাক্সের তীব্রতর ধরণকে বলে ‘টেনশান নিউমোথোরাক্স’ । এই অবস্থায় বুকের ভেতরে ক্রমাগত বাতাস জমতে থাকায় বুকের ভিতরে থাকা হৃৎপিণ্ডের উপর চাপ পড়ে, রক্ত চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। শ্বাসকষ্টও হয় ভয়ঙ্কর রকমের। রোগীর জীবন হয়ে পড়ে সংকটাপন্ন। জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা না নিলে মৃত্যু অবধারিত।
ফুসফুস আংশিক চুপসে থাকলে বা ‘টেনশান’ তৈরি না হলে অনেক সময় নিউমোথোরাক্স দেরিতে শনাক্ত হয়। রোগের লক্ষণের কম তীব্রতার কারণে এমনটি হয়। যেমন পরিশ্রমের কারণে শ্বাস কষ্ট বা হাঁপ ধরা, বুকে ব্যথা এবং কাশি।
যাদের ফুসফুস রোগাক্রান্ত তাদের ক্ষেত্রে নিউমোথোরাক্স হওয়া এবং লক্ষণ তীব্র হওয়ার ঝুঁকি বেশি। ধূমপানের কারণে হওয়া ফুসফুসের একটি রোগ সিওপিডি (COPD), এই রোগীদের নিউমোথোরাক্স বেশি হয়।
দুর্ঘটনা নিউমোথোরাক্সের আরেকটি অন্যতম কারণ। সড়ক দুর্ঘটনা,উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া, মারামারি কিংবা ছুরি বা ধারালো কোন যন্ত্র বা অস্ত্রের জখমের ফলে এমনটি হয়।
যে একবার নিউমোথোরাক্সে আক্রান্ত হয়েছে তার দ্বিতীয়বার নিউমোথোরাক্স হওয়ার আশঙ্কা বেশি, দ্বিতীয় বার হলে তৃতীয় বার। এই কারণে প্রথম নিউমোথোরাক্সের পর রোগীকে সতর্ক করা হয়, পরামর্শ দেয়া হয়। ড্রাইভার, পাইলট, ডুবুরিদের বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়।
নিউমোথোরাক্সের চিকিৎসা করা হয় একটি স্বল্প সময়ের ছোট্ট অপারেশনের মাধ্যমে, এই অপারেশনের নাম টিউব থোরাকোস্টমি (Tube Thoracostomy)। বক্ষব্যাধি সার্জনরা এই অপারেশনটি করেন।
দ্বিতীয় আরেকটি অপারেশনও করা হয়। সেই অপারেশনে ফুসফুসের রোগাক্রান্ত অংশ অপসারণ করা হয়। সাধারণত দ্বিতীয়বার নিউমোথোরাক্সের পর এই অপারেশন করা হয়। অনেক সময় প্রথমবার নিউমোথোরাক্সের পরও করা হয়, বিশেষ করে যারা রোগাক্রান্ত ফুসফুসের অধিকারী তাদের।
লেখক: পেশায় চিকিৎসক এবং জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের থোরাসিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।
ই-মেইল: milonkibria@yahoo.com