একদিকে শক্তিধর দেশ রাশিয়া, অন্যদিকে তার প্রতিবেশী ইউক্রেন। দেশ দুইটির মধ্যে নতুন করে সামরিক সংকট দানা বাঁধছে। 'ন্যাটো' সামরিক জোটের সদস্য হতে চায় ইউক্রেন। কিন্তু তাতে রাজি নয় রাশিয়া। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রাশিয়াতে পশ্চিমাদের সামরিক চাপ রুখতেই ইউক্রেন-ন্যাটোর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে পুতিন প্রশাসন।
ন্যাটো-রাশিয়া সংকট নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর সূত্রপাত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। করোনা পরবর্তী আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতি এই সংকটকে ধীরে ধীরে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইউক্রেন-রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যকার সংকট বুঝতে এই পাঁচটি তথ্য গুরুত্বপূর্ণ-
১. ন্যাটো কি এবং কেন এটি গঠিত হয়েছিলো?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটো সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
প্রাথমিক অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্ররা এই জোটের মাধ্যমে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে (ইউএসএসআর) অর্থাৎ বর্তমান রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। এরপর কয়েক দশক ধরে জোটটি ক্রমাগতভাবে তার রাস্তা প্রসারিত করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর একটি অংশকে নিজেদের সদস্য বানিয়েছে ন্যাটো। এর ফলে বিশ্বব্যাপী নতুন করে সামরিক চাপে পড়ে রাশিয়া।
২. কোন দেশগুলো ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র?
ন্যাটো মোট ৩০টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত।
বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, ইতালি, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পর্তুগাল, যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলো।
নতুন সদস্য রাষ্ট্র হল উত্তর মেসিডোনিয়া, যেটি ২০২০ সালে যোগদান করেছে।
জোটের অংশীদার অন্যান্য দেশগুলো হলো, গ্রীস, তুরস্ক, জার্মানী, স্পেন, চেক রিপাবলিক, হাঙ্গেরী, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, আলবেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও মন্টিনিগ্রো।
৩. কেন ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিতে চায়?
ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র হওয়ার জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছে ইউক্রেন। এক্ষেত্রে বিষয়টি নতুন নয়। এর আগেও ন্যাটোর প্রতি মৌখিক সমর্থন জানিয়েছে কিয়েভ।
জোটে যোগদানের ফলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামূলক শক্তি বৃদ্ধি পাবে ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির কারণে। সেই নীতি ন্যাটোর প্রতিষ্ঠা চুক্তির অনুচ্ছেদ পাঁচ দ্বারা নির্ধারিত। মানে একজন মিত্রের বিরুদ্ধে আক্রমণকে সমস্ত মিত্রদের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়, তারা একে অপরকে রক্ষা করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
৪. ন্যাটো কি ইউক্রেনকে সমর্থন করে?
২০০৮ সালে ন্যাটো নেতারা ইউক্রেনকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, একদিন ইউক্রেনও এই জোটে যোগদানের সুযোগ পাবে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে সহযোগিতা আরও গভীর হওয়া সত্ত্বেও, শীঘ্রই এটি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এই জোটে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক মানদণ্ড পূরণ করতে যথেষ্ট কাজ করেছে কিয়েভ। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনের বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি।
৫. নতুন করে রাশিয়া-ন্যাটো দ্বন্দ্বের কারণ কি?
রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেন ন্যাটো জোটের সদস্য হতে চায়। কিন্তু রাশিয়ার সীমান্ত ও সামরিক নিরাপত্তার যুক্তিতে ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য হতে বাধা দিচ্ছে রাশিয়া। কিয়েভ এই জোটে যুক্ত হলে ইউরোপের সাথে রাশিয়ার কূটনৈতিক সমঝোতা ও গ্যাস সরবরাহে ভাটা পড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
পুতিন বলেছেন, ন্যাটোর সম্প্রসারণ রুখে দেওয়ার সময় এসেছে। ইউক্রেনকে কোনোভাবেই জোটের সদস্য হতে দেওয়া হবে না। পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। মৌখিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ন্যাটো নিজেকে প্রসারিত করেছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ন্যাটো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্ররা মস্কোর সাথে আলোচনায় বসতে চায়। কিন্তু ওয়াশিংটন এবং ন্যাটো ক্রেমলিনের মূল দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে রাশিয়াও ইউক্রেন নিয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
একাত্তর/আরবিএস