আমেরিকাতেও জাল ছড়িয়েছে সৌদি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক

দেশে-বিদেশে সৌদি আরবের সমালোচকদের নানাভাবে শাস্তি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বিরুদ্ধে। ২০১৮ সালে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার অভিযোগে সমালোচিত হয়েছেন তিনি। 

এবার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই দাবি করেছে, সমালোচকদের হেনস্তা করতে যুক্তরাষ্ট্রেও নিজেদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের জাল বিস্তৃত করেছে সৌদি আরব। 

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বসবাসরত সৌদি আরব সরকারের সমালোচনাকারী সৌদি নাগরিক- বিশেষত সৌদি নারীদের হেনস্তা ও হুমকি দেয়ার ব্যাপারে মার্কিন ফেডারেল কর্মকর্তাদের কাছে মিথ্যে বলার দায়ে এক সৌদি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে মার্কিন ফেডারেল প্রশাসন। 

গ্রেপ্তার ওই সৌদি নাগরিকের নাম ইব্রাহিম আল হুসেইন (৪২)। মিসিসিপির দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আল হুসেইন সৌদি সরকারকে সহায়তা করতে তার @samar16490 টুইটার অ্যাকাউন্ট দিয়ে অল্পবয়সী নারীদের অপমান করতেন ও হুমকি দিতেন বলে জানিয়েছে এফবিআই। 

গত মাসে ব্রুকলিনের একটি আদালতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন নিউইয়র্কে বসবাসরত সৌদি অ্যাক্টিভিস্ট দানাহ আল-মায়ুফ। আল-মায়ুফের অভিযোগ, ২০১৯ সালে আল হুসেইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সাথে যোগাযোগ করে একটি মামলার ব্যাপারে তাকে সহায়তা করতে চান। 

এ প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় আল হুসেইন আল-মায়ুফকে হুমকি দেন ও তাকে হেনস্তা করার উদ্দেশ্যে তার অবস্থান জানার চেষ্টা করেন। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আর কিছু জানানো হয়নি। 

সৌদি অ্যাক্টিভিস্ট দানাহ আল-মায়ুফ

আল হুসেইন আল-মায়ুফকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, 'এমবিএস তোমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবে, দেখে নিয়ো।' এখানে সৌদি যুবরাজকে তার নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে সম্বোধন করছিলেন তিনি। 

সৌদি আরবে কারাদণ্ডে দণ্ডিত নারীদের উদাহরণ দিয়ে তিনি নানা সময়ে আল-মায়ুফকে হুমকি দিতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

দানাহ আল-মায়ুফ একটি জনপ্রিয় ইউটিউব শো করেন, যেখানে তিনি সৌদি আরবের সাথে সম্পর্কিত চলমান বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে কথা বলেন এবং ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের সমালোচনা করেন। 

একই অভিযোগ করেছেন সৌদি আরবের নারী অধিকার কর্মী মৌদি আলজোহানি। তার বিশ্বাস, আল হুসেইন একই উপায়ে তার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিলেন। 

তিনি জানান, ২০২০ সালে একটি ভুয়া ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন আল হুসেইন। ওই অ্যাকাউন্ট থেকে তার কাছে তার পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ সদস্যের 'রহস্যময়' ছবি পাঠানো হয়। 

তবে ম্যাসেজের জবাব না দিলে আল হুসেইন বলেন, আশা করি তোমার পরিণতিও নাদা আল-কাহতানির মতো হবে। ২০২০ সালে 'অনার কিলিং'য়ের নামে নিজের ভাইয়ের হাতে খুন হয়েছিলেন নাদা আল-কাহতানি। 

এফবিআই জানিয়েছে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত আল হুসেইন এক সৌদি সরকারি কর্মকর্তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন। সেই কর্মকর্তা সৌদি রয়্যাল কোর্টে আরেক কর্মকর্তার কাছে রিপোর্ট করতেন। 

প্রসিকিউটররা আরও জানিয়েছেন, আল হুসেইন খাশোগির মৃত্যুর এক বছর আগে থেকে তার সব টুইটার পোস্টের স্ক্রিনশট রেখেছিলেন। এমনকি এই বছরও তার ফোনে খাশোগির ছবি ছিল। 

২০২১ সালের জুন থেকে ২০২২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনটি সাক্ষাৎকারে মার্কিন ফেডারেল কর্মকর্তাদের কাছে মিথ্যা কথা বলার অভিযোগ রয়েছে আল হুসেইনের বিরুদ্ধে। এফবিআই বলছে, নিজের নামে ছাড়া আর কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তিনি ব্যবহার করতেন না বলে তদন্তকারীদের বলেছিলেন তিনি। 

বিভিন্ন দেশের স্বৈরাচারী সরকারের প্রবাসী সমালোচকদের শাস্তি দেয়ার উপায় খোঁজা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ অস্বস্তিতে রয়েছে মার্কিন প্রশাসন। এমন সময়ে এই বিষয় নিয়ে তাদের তৎপরতা ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি নিয়ে বিস্তৃত তদন্তের দিকেই নির্দেশ করে। 

এদিকে উদারপন্থী সংস্কারক হিসেবে নিজের ইমেজ প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান একইসাথে দেশে ও বিদেশে বিরোধীদের দাবিয়ে রাখতে ব্যস্ত। অনেক আগে থেকেই সৌদি সরকারের অভিযোগ, সমালোচকরা সহিংসতা উসকে দিয়ে সাম্রাজ্যের নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটায়। 

খাশোগি হত্যায় অভিযুক্ত যুবরাজ সালমানের সাথে বৈঠক করে সম্প্রতি সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তবে সৌদি সরকার আবার তেমন কিছু করার চেষ্টা করলে উপযুক্ত জবাব দেয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন তিনি। 

আরও পড়ুন: লঙ্কার প্রেসিডেন্ট ভোটে জিতে যা বললেন রানিল

যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি সমালোচকদের মুখ বন্ধ করাতে সৌদি আরব বেশ অনেকদিন ধরেই সক্রিয় বলে ধারণা করা হয়। ২০১৯ সালে মার্কিন প্রসিকিউটররা দাবি করেন, হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক ও সৌদি সমালোচকদের টুইটার অ্যাকাউন্টে নজরদারি করতে টুইটারের দুই কর্মীকে নিয়োগ দেয় সৌদি আরব। 

সৌদি আরবে সফরে গিয়ে বাইডেন তার মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। তবে আল হুসেইনের গ্রেপ্তার এটাই প্রমাণ করে যে, অন্তত মার্কিন ভূমিতে যেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা না ঘটে সেদিকে কড়া নজর রেখেছে বাইডেন প্রশাসন। 


একাত্তর/এসজে