দ্বিতীয় নেতাজি হিসাবে খ্যাত ভারতের বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুলায়ম সিংহ যাদব আর নেই। গুরুগ্রামের এক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
সমাজবাদী পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মুলায়ম দু’বছর থেকেই অসুস্থ। গেলো ২ অক্টোবর অসুস্থতা বাড়ায় তাঁকে গুরুগ্রামের মেদান্ত হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। অবস্থার আরও অবনতি হলে তাঁকে আইসিইউতেও রাখা হয়। এতে মুলায়মের শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হয়।
তবে এই রোববার (৯ অক্টোবর) হঠাৎ অবস্থার অবনতি হয় তাঁর। রাতে অক্সিজেনের স্তর অনেকটাই নেমে যায়। অক্সিজেনের স্তর বাড়িয়ে প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় মুলায়মের শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল করা গেলেও শেষরক্ষা হয়নি। সোমবার সকালে মারা যান তিনি।
উত্তর প্রদেশের রাজনীতিতে ‘নেতাজি’ হিসাবে পরিচিত মুলায়ম সিং যাদব। তিন দফায় প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি। এর মধ্যে ১৯৯৬-৯৮ পর্যন্ত তিনি ছিলেন কেন্দ্রে দেব গৌড়া সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ১৯৯৬ সালে প্রথম বার সংসদ সদস্য হন। ২০০৪ সালে মুখ্যমন্ত্রিত্বের কারণে লোকসভা ভোটে দাঁড়াননি। ২০০৯ সাল থেকে আমৃত্যু সংসদের সদস্য ছিলেন মুলায়ম।
১৯৩৯ সালের ২২ নভেম্বর উত্তরপ্রদেশের ইটাওয়া জেলার সাইফাই গ্রামে জন্ম হয় মুলায়ম সিং যাদবের। বাবা সুঘর সিং যাদব। মা মূর্তি দেবী। পড়াশোনা গ্রামেই। সেখানের একটি কলেজ থেকেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। আর আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি।
ছাত্র থাকার সময়ই রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন উত্তর প্রদেশের নেতাজি। সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষায় অসাধারণ বক্তৃতা করার ক্ষমতা তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয় এনে দেয়। লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে তার কথা। যদিও মুলায়মের প্রথম প্রেম ছিলো কুস্তির প্রতি।
সেই ১৯৬২ সালে কথা। লখনৌয়ে যশবন্ত নগরের একটি গ্রামে বিধানসভা ভোটের চলার সময় একটি কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সেখানে দর্শক হিসাবে এসেছিলেন সংযুক্ত সোশালিস্ট পার্টির নেতা নত্থু সিং। সেই কুস্তির আসরে চ্যাম্পিয়ন হন মুলায়ম।
কুস্তির সেই আসরে মুলায়মের মাথায় হাত রাখেন নত্থু সিং। গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের সেই শুরু। আর ১৯৬৭ সালেই যশবন্ত নগর থেকেই প্রথমবার ভোটে লড়েন মুলায়ম। এরপর দল ভেঙ্গে নতুন দল তৈরি হলেও নিজ এলাকা ছেড়ে যাননি মুলায়ম।
যশবন্ত নগরের বিধায়ক হিসেবেই মুলায়ম ১৯৮৯ সালে প্রথমবার উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হন মুলয়াম সিং যাদব। তখন তিনি জনতা দলের বিধায়ক। ১৯৯৩ সালে আবার মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম। অবশ্য এর এক বছর আগেই তৈরি করে ফেলেন সমাজবাদী পার্টি।
বিধায়কের পদ ছেড়ে ১৯৯৬ সালে তিনি লোকসভা নির্বাচন করেন। প্রদেশটির মইনপুরী আসন থেকে জিতে মুলায়ম দেব গৌড়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব সামাল দেন। এরপর তিনি আবারো ফিরে আসে লখনৌতে। তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হন মুখ্যমন্ত্রী।
তৃতীয় দফায় মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরে যাবার পর মুলায়ম সিং যাদব দিল্লির রাজনীতিতেই বেশি করে মনোনিবেশ করেন। তাঁর স্থায়ী আসন হয়ে দাঁড়ায় মইনপুরী। প্রবল মোদী হাওয়ার মধ্যেও ২০১৯ সালে এই কেন্দ্র থেকেই আবার জিতে লোকসভায় আসেন তিনি।
উত্তর প্রদেশে কংগ্রেস ও বিজেপির একচেটিয়া আধিপত্যকে ছেটে দেন মুলায়ম। কাশীরামের ধারার রাজনীতি থেকে আলাদা ঘরানা তৈরি করে নিজের এক আলাদা পরিচয় বানিয়েছিলেন উত্তর প্রদেশের রাজনীতির এই সিংহ পুরুষ। ছিলেন সবার শ্রদ্ধার পাত্র।
প্রবাদ আছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পথ যায় উত্তর প্রদেশ দিয়ে। আর সেই উত্তর প্রদেশের পথের কোতোয়ালের নাম মুলায়ম। আর এসব কারণেই নিজের দল থেকে শুরু বিরোধী দলের নেতা ও কর্মীরা মুলায়ম সিং যাদবকে ডাকতেন ‘নেতাজি’ হিসাবে।
উত্তর প্রদেশে যাদব রাজনীতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নেতা হিসেবে মুলায়মের নাম ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে অনেক আগেই। তারপরও তিনি নিজের রাজনৈতিক গুরু হিসাবে বাঙালি নেতা জ্যোতি বসুর নাম বলতেন সব সময়। জ্যোতির একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন তিনি।
১৯৯৬ সালে সিপিএম পলিটব্যুরোর সিদ্ধান্তের কারণে যখন প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি জ্যোতি বসু, সেই সময় প্রথম প্রকাশ্যে সিপিএমের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গরা চড়িয়েছিলেন মুলায়মই। তিনি বলেছিলেন, এই সিদ্ধান্ত একটি ঐতিহাসিক ভুল। কারণ জ্যোতিরা সব সময় আসেন না।
বিহারের লালু এবং বামপন্থীদের পাশাপাশি মুলায়মই সেই বিরল নেতাদের অন্যতম, যারা কখনওই বিজেপির সঙ্গে জোট বাঁধেননি। বরং, কখনও কংগ্রেস আবার কখনও বিজেপিকে হারাতে মুলায়ম হাত মিলিয়ে ছিলেন দলিত নেত্রী মায়াবতীর সঙ্গেও।
আরও পড়ুন: ভারতের দ্বিতীয় 'নেতাজি' মুলায়ম আর নেই
কী রাজনীতি কী ব্যক্তিজীবন- সব খানেই বিতর্ক কখনও মুলায়মের পেছন ছাড়েনি। তার পরেও মানুষের ভালোবাসার জোরে সব কিছু উৎরে গেছেন অবলীলায়। ভারতের রাজনীতিতে তৃতীয় ধারার জনক হিসাবে সব সময়ই মুলায়মের নাম সবার আগেই উচ্চারিত হবে।
লোকসভায় মুলায়মের ভাষণ ছিলো সব সংসদ সদস্যের জন্যই দারুণ জনপ্রিয় এক আকর্ষণ। শুধু তাই নয় জনসভায় তার কথ্য ভাষার ভাষণ শুনতে শুধু নিজ দলেরই নয় বিরোধী দলের নেতাকর্মীরাও ছুটে আসতেন। সেখানেই সবার থেকে আলাদা ‘নেতাজি’ মুলায়ম সিং যাদব।
একাত্তর/এসজে