মিয়ানমার জান্তাকে সহায়তা করছে চীন-ভারত-রাশিয়া: প্রতিবেদন

চীন, রাশিয়া ও ভারত সরকারের সহায়তা মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে টিকে থাকতে ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে সাহায্য করছে বলে দাবি করেছে আইনপ্রণেতাদের একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। 

বুধবার (২ নভেম্বর) প্রকাশিত আসিয়ান পারলামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস (এপিএইচআর)-এর এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে বেইজিং ও মস্কোর পক্ষ থেকে এই 'স্থিতিশীল ও সমালোচনাহীন' সমর্থন এসেছে, যখন আসিয়ানের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনায় কোনও অগ্রগতিই আসেনি। 

প্রতিবেদনে এপিএইচআর মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক বিরোধী দলকে সহায়তায় দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে। আটজন আইনপ্রণেতা চার মাস ধরে মিয়ানমারে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের তদন্ত করেছেন। 

তাদের মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মিয়ানমারের ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টকে (এনইউজি) বৈধ সরকারের স্বীকৃতি দিয়ে তাদের অর্থ সহায়তা দেয়া। 

জরুরিভাবে এসব পদক্ষেপ নেয়ার আহবান জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, অভ্যুত্থানের ১৯ মাস পরও ক্ষমতা একীভূত করতে সমর্থ হয়নি জান্তা সরকার। মিয়ানমারের একটি বড় অংশ নিয়ে এখনও সেনাবাহিনী, এনইউজি সমর্থিত সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর মধ্যে বিরোধ রয়েছে। এর সাথে মিলে দেশটিতে চলমান সহিংসতার ফলে অর্থনৈতিক ধস এবং অভূতপূর্ব মানবিক সংকট আসন্ন। 

মিয়ানামারে এই মুহূর্তে প্রায় ১২ লাখ বাস্তচ্যুত মানুষ রয়েছেন। এছাড়াও রাজনৈতিক অপরাধের জন্য দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন অন্তত ১৫ হাজার মানুষ ও নিহত হয়েছেন দুই হাজার ৩৭১ জন। 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মিয়ানমারে সর্বশেষ সামরিক অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা দেশটির সামরিক জান্তাকে একঘরে করে দিলেও, রাশিয়া, চীন ও ভারতের মতো মিত্রদের সহায়তায় নেতা মিং অং হ্লাইং এখনও ক্ষমতায় টিকে রয়েছেন। 

'এসব সরকারের সমর্থন ও বৈধতা দেয়ার ফলে জান্তা নিজেকে টিকিয়ে রাখতে ও অসংখ্য মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে সমর্থ হয়েছে, যদিও সামরিক অভ্যুত্থানকে একীভূত করতে পারেনি তারা', বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। 

'২০২২ সালে এসে এই সমর্থন আরও দৃঢ় হয়েছে, কেননা মিয়ানমারের স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিলের (এসএসি) সাফল্যের সাথে নিজেদের স্বার্থ জড়িত বলে দেখতে পাচ্ছে মিত্ররা'। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো ধরণের কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে বাধা দিয়ে আসছে চীন ও রাশিয়া। এছাড়াও মানবাধিকার লঙ্ঘনে চীন ও রাশিয়ার সরবরাহ করা অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে। 

অভ্যুত্থানের পরে সতর্ক বিবৃতি দিলেও, চীন বর্তমানে মিয়ানমার জান্তার 'অন্যতম ক্ষমতায়নকারী' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। জান্তার নিয়োগ করা পররাষ্ট্রমন্ত্রী উনা মং লুইনের সাথে আলোচনা ছাড়াও অন্যান্য আঞ্চলিক অংশীদারদের একই ধরণের পদক্ষেপ নিতে চাপ দেয়ার অভিযোগ করা হয়েছে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে। 

তদন্তে সাক্ষ্যদানকারীরা বলেছেন, সংকট মোকাবেলা করে আলোচনার পথ সুগম করতে আসিয়ানের প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে বেইজিংয়ের সমর্থন। 

'শেষ পর্যন্ত চীনা সরকার এসএসি'র সাথে আগের মতই কাজ করার এবং মিয়ানমারে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার্থে জান্তাকে আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা থেকে রক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে', বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

তবে রাশিয়া শুরু থেকেই এসএসির পক্ষে দৃঢ় সমর্থন জানিয়ে আসছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গত মার্চে যখন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তখন নেপিদোতে সশস্ত্র বাহিনী দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে সরকারি প্রতিনিধিদের পাঠায় মস্কো। সেপ্টেম্বরে রাশিয়া সফরে গিয়ে ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে সাক্ষাৎ করেন সেনাবাহিনীর প্রধান মিং অং হ্লাইং। 

এই সমর্থনের বিনিময়ে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে আসছে মিয়ানমার। 

অন্যদিকে, স্বীকৃতি দিয়ে ও আন্তঃসীমান্ত সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকতা বজায় রেখে জান্তা সরকারের প্রতি ভারত সমর্থন জানিয়ে আসছে, বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। 

আরও পড়ুন: আবারও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন নেতানিয়াহু

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'অসমন্বিত ও অনিয়মিত' হওয়ায় এই সংকটকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছেন গণতন্ত্রের সমর্থকরা। অস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞাও অসমন্বিত হওয়ার পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে অর্থায়নকারী কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে অনাগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। 

'মিয়ানমারের জনগণকে সহায়তায় সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফেরত পাঠিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও বেশি কিছু করা উচিৎ। যার শুরু করতে হবে মানবিক সংকট সমাধান, অবৈধ জান্তার ওপর চাপ প্রয়োগ ও এনইউজি-কে মিয়ানমারের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে', বলা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। 


একাত্তর/এসজে