ব্রাজিলে এই পরিস্থিতি যেভাবে সৃষ্টি হলো

ব্রাজিলের কংগ্রেস, সুপ্রিম কোর্ট ও প্রেসিডেন্টের বাসভবনে হামলা চালিয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর হাজার হাজার সমর্থক। ব্রাজিলের পতাকার রঙের পোশাক পরে তারা দেশটির মূল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভাঙচুর চালিয়েছেন। তবে হঠাৎ কজরে দেশটিতে কেনো এমনটা হচ্ছে? 

দুই মাস আগে অনুষ্ঠিত এক তিক্ত নির্বাচন

২০২২ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন উগ্র ডানপন্থী জাইর বলসোনারো ও বামপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। জোরালো ও তিক্ত নির্বাচনী প্রচারণার পর ৩০ অক্টোবর সামান্য ভোটের ব্যবধানে বলসোনারোকে পরাজিত করেন লুলা। 

রাষ্ট্রীয় ভবনে হামলার এ ঘটনা 'অভূতপূর্ব' বলে মন্তব্য করে হামলাকারীদের 'ধর্মান্ধ ফ্যাসিস্ট' বলে আখ্যা দিয়েছেন লুলা। বলসোনারোর বিরুদ্ধে দাঙ্গাবাজদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানি দেয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি। 

তিনি বলেন, 'সবাই জানে সাবেক প্রেসিডেন্টের এমন অনেক বক্তব্য রয়েছে যা এটিকে উৎসাহিত করছে'। 

গভীরভাবে দ্বিধাবিভক্ত একটি দেশ ব্রাজিল

ব্রাজিলের জনগণের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি অত্যন্ত গভীর। কংগ্রেসে হামলার ঘটনা এটিই প্রমাণ করে যে, যেসব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান আর তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না তাদেরকে আক্রমণ করতে তারা কতদূর যেতে প্রস্তুত। 

এটি শুধু ডান বনাম বামের লড়াই নয়। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ফল গ্রহণ করতে যারা অস্বীকৃতি জানায় তারা নিজেদের ক্ষোভ এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর ঝাড়ছেন বলে মনে করা হচ্ছে। 

যারা দাঙ্গায় অংশ নিচ্ছেন তারা এই জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে উগ্র অংশ। তবে লুলার বিরোধিতা করা এমন অনেকেই আছেন যারা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দাঙ্গার আগুন উসকে দিচ্ছেন। 


বহু বলসোনারো সমর্থক তার পরাজয় মানতে অনিচ্ছুক

জাইর বলসোনারোর অনেক সমর্থক তাকে একজন 'ত্রাতা' হিসেবে দেখেন। তাদের বিশ্বাস, 'ঈশ্বর, পিতৃভূমি ও পরিবার' নামের যে তিন মূল্যবোধ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোকে তিনি রক্ষা করেন। 

লুলাকে তারা এসব মূল্যবোধের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখেন এবং তাদের আশা ছিল বলসোনারো এই হুমকিকে পরাজিত করতে পারবে। লুলা নির্বাচিত হলে তিনি দেশের গির্জা বন্ধ করে দেবেন, এমন গুজবে বিশ্বাস ছিল বলসোনারো সমর্থকদের। 

যারা ভেবেছিলেন লুলা নির্বাচনে পরাজিত হবেন তারা তার জয় মেনে নিতে পারেননি। অনেকেই সামরিক ব্যারাকের সামনে ক্যাম্প করে সেনাবাহিনীর প্রতি লুলার জয় ঠেকানোর আহবান জানান। এতে যদি সামরিক অভ্যুত্থান হয় তবে তাতেও তারা রাজি ছিলেন। 

তবে সেনাবাহিনী এতে সাড়া দেয়নি এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী লুলা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 

লুলা প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে প্রবেশ করায় বলসোনারো সমর্থকদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়

লুলা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় দাঙ্গার সূত্রপাত হলো। লুলার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করে সেসময় যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান বলসোনারো। 

এর ফলে বলসোনারোর সমর্থকদের মধ্যে জমাট বাধা ক্ষোভ আরও তীব্র হয়। লুলাকে যারা 'ব্রাজিলের প্রতি কমিউনিস্ট হুমকি' হিসেবে দেখেন তাদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। 

সেনাবাহিনীর প্রতি হতাশ হয়ে তারা পরিস্থিতি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যেসব প্রতিষ্ঠান শুধু তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না এবং তাদের মূল্যবোধকে রক্ষা করে না সেসবে তারা হামলা চালান। 


চরমপন্থা ও গুজব রূপ নিয়েছে নিজস্ব সত্ত্বায়

জাইর বলসোনারোর বিভক্তিমূলক বক্তব্য ও ব্রাজিলের নির্বাচনী ব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ব্রাজিলের বর্তমান পরিস্থিতিকে উসকে দিতে অনেকটাই সাহায্য করেছে। 

নির্বাচনের আগে তিনি বারবার অভিযোগ করেছেন যে, ব্রাজিলের ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থায় জালিয়াতির ঝুঁকি রয়েছে। তার তার এ অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে দেশটির নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ। 

তবে অনেক ব্রাজিলীয়র বিশ্বাস, নির্বাচন 'চুরি' করা হয়েছে যদিও বলসোনারোর রাজনৈতিক দলের দায়ের করা চ্যালেঞ্জ প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছে নির্বাচনী আদালত। 

দাঙ্গা শুরুর পর টুইটারে এক বার্তায় দাঙ্গায় উসকানি দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলসোনারো। 'সরকারি ভবনে লুটতরাজ ও অনুপ্রবেশের' যে ঘটনা ঘটেছে তাকে বেআইনি বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি। 

তবে হামলাকারীদের চরমপন্থি আচরণ এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে একটি নিজস্ব সত্ত্বা হয়ে দাঁড়িয়েছে যেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 


একাত্তর/এসজে