আইনি জটিলতা কাটিয়ে মা-বাবার কোলে ফিরেছে ভারতের উত্তর প্রদেশের রামনরগ কণ্ডা গ্রাম থেকে নিখোঁজ হওয়া তরুণ সুভাষ রাই (২২)।
মঙ্গলবার (২১ মার্চ) বাংলাদেশ-ভারতের বেনাপোল-পেট্রাপোল আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন সুভাষ। তাকে নিতে ভারতীয় পাড়ে উপস্থিত ছিল তার বাবা-মা, গ্রামের এক প্রতিবেশী, গুজরাট রোটারী ক্লাব বারুচ'এর সদস্য রিজওয়ানা শানকিন জামিনদার প্রমুখ।
এসময় সুভাষকে তাদের বাবা মায়ের হাতে তুলে দিতে উপস্থিত ছিলেন একাত্তর টেলিভিশনের প্রতিনিধিও।
ছেলেকে কাছে পেয়ে উল্লাসিত সুভাষের বাবা-মা। আড়াই বছর পর তাদের দেখে চিনতে ভুল করেনি সুভাষও। বাবা-মা বলে ডেকে উঠে ছেলে। পরে সুভাষকে নিয়ে পেট্রাপোল থেকে সড়ক পথে যশোর রোড, কলকাতা হয়ে গাড়ি পৌঁছয় হাওড়া স্টেশনে। এদিনই স্থানীয় সময় রাত ১২টার ট্রেনে চেপে উত্তরপ্রদেশে গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা দেন তারা।
জানা যায়, ২০২১ সালের জুন মাসের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ডিমলা থেকে সুভাষকে উদ্ধার করা হয়। এরপর আহত অবস্থায় একজন রিকশাচালক তাকে ডিমলা থানায় পৌঁছে দেন। পরে নীলফামারী থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের সহায়তায় ২০২১ সালের ১৩ জুন সুভাষকে ভর্তি করানো হয় রংপুর মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতালের নিউরোসায়েন্স বিভাগে। সেখানে ভর্তির সময় সুভাষের কোমরের হাড় ভাঙা ছিল। চিকিৎসা শেষে ওই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর সুভাষকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু ঠিকানা না জানার কারণেই চিকিৎসার পরেও দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালের বারান্দায় পড়েছিলেন তিনি। পরে বাংলাদেশ সমাজসেবা অধিদপ্তর তাকে ‘গ্লোরী সমাজ উন্নয়ন সংস্থা’ নামে একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাছে হস্তান্তর করে। ধীরে ধীরে অনেকটাই সুস্থ হয়ে ওঠে সুভাষ। তবে এখনও হুইলচেয়ারে করে বসেই তাকে চলাফেরা করতে হচ্ছে।
সুভাষের পরিবার জানায়, ছেলের সঙ্গে একাত্তর টেলিভিশনের প্রতিনিধি তার যোগাযোগ করিয়ে দেন। কিন্তু নেপাল সীমান্ত ঘেঁষা ভারতের উত্তরপ্রদেশের রামনগরের বাসিন্দা সুভাষ কীভাবে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের রংপুরের বদরগঞ্জের ওই আশ্রয় কেন্দ্রে পৌঁছেছে তা এখনও অজানা।
মা সুনীতা দেবী জানান জন্মের পর থেকে কোনো শারীরিক অসুবিধা ছিল না সুভাষের। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে থাকে সে। তার আর্থিক সক্ষমতার মধ্যেই ছেলেকে চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু সুস্থ করা যায়নি। ছেলে মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে মাঝে মধ্যেই এদিক-ওদিক চলে যেত, আবার কয়েকদিন পর ফিরেও আসত। ফলে বিষয়টি একপ্রকার গা সওয়া হয়ে উঠেছিল ওই পরিবারের। সুভাষের বাবা-মা সহ পরিবারের স্বজনরাও ভেবেছিলেন এবারও হয়তো তাদের ছেলে ফিরে আসবে। কিন্তু দিন যায়, মাস যায়, মাস ঘুরে বছর পেরোয় তবুও ছেলের সন্ধান না পাওয়ায় এক প্রকার হতাশ হয়ে পড়েন তারা। তবু আশা ছাড়েননি, ভরসা রেখেছেন উপরওয়ালার ওপর।
ছেলে নিখোঁজের পর গত বছরের ৫ আগস্ট স্থানীয় কোতোয়ালি মূর্তিহা থানায় একটি নিখোঁজের অভিযোগ দায়ের করা হয়। আবেদনপত্রে সুভাষকে বাংলাদেশের ওই আশ্রয় কেন্দ্র থেকে নিজের গ্রামে ফেরত পাঠাতেও আরজি জানানো হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশও বিষয়টি খতিয়ে দেখা শুরু করে। পুলিশের তরফে ওই পরিবারকে আশ্বাসও দেওয়া হয় যত দ্রুত সম্ভব তার ছেলেকে বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
২০২২ সালের আগস্ট মাসে হটাৎ করে বাংলাদেশ থেকে ফোন যায় সুভাষের গ্রামের বাড়িতে, ফোনে বলা হয় তাদের একমাত্র ছেলে বেঁচে আছে। এরপর থেকে বেশ কয়েক মাস ধরে ‘গ্লোরী সমাজ উন্নয়ন সংস্থা’ নামে বাংলাদেশেরই একটি বেসরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে থাকে সুভাষ। সেখান থেকেই ভিডিও কলে ছেলের সঙ্গে কথাও বলেন তার বাবা-মা। আর এরপর থেকেই ছেলেকে ফিরে পেতে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন বাবা লক্ষ্মণ ও মা সুনীতা। তারপর নানা প্রক্রিয়া শেষে নিজ দেশে ফেরে সুভাষ।
একাত্তর/এসি