প্রবাদ আছে- তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে। এবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সেনা বিদ্রোহের অভিযোগ উঠেছে তাঁরই হাতে গড়ে ওঠা ভাড়াটে সেনা দল ওয়াগনার গ্রুপের প্রধানের বিরুদ্ধে। অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয়া কে এই ইয়েভজেনি প্রিগোজিন?
নিজের বাহিনীর প্রতি প্রিগোজিনের হুঙ্কার, আমাদের পথে যা আসবে তাকেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও। এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বের নজর রাশিয়ার দিকে। সে সঙ্গে আলোচনায় উঠে আসছে প্রিগোজিনের নাম। প্রশ্ন উঠছে, কি করে একটি ভাড়াটে সেনা দলের মালিক হলেন তিনি।
গেল কয়েকমাসে ইউক্রেনের বিভিন্ন রণাঙ্গনে অসাধারণ বীরত্ব দেখিয়েছে ওয়াগনার গ্রুপ। বলতে গেলে প্রিগোজিন বাহিনী ইউক্রেনে ঢুকতেই মোড় ঘোরে যুদ্ধের। এই বাহিনীর দুরন্ত লড়াইয়েই নতুন করে পূর্ব দিকে একের পর এক শহর দখলে আসে মস্কোর।
সেই ওয়াগনার প্রধানের বিরুদ্ধে উঠেছে পুতিনকে সরানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকা অভিযোগ। যদিও তিনি বারবার অস্বীকার করে আসছেন, পুতিনের সঙ্গে তার কোন বিরোধ নেই। তার সব রাগ, ক্রেমলিনের দুই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তাদের শায়েস্তা করতে চান তিনি।
চুরির অভিযোগে দীর্ঘ দিন রাশিয়ার জেলে বন্দি ছিলেন প্রিগোজিন। কিন্তু হঠাৎ করে উল্কা গতিতে উত্থান হতে শুরু করে তাঁর। রাতারাতি ওয়াগনার গ্রুপের প্রধান বনে যান প্রিগোজিন। রুশ মাটিতে বেআইনি অস্ত্র কারখানা চালানোর মতো মারাত্মক অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
১৯৮১ সালে দ্বিতীয়বার চুরির অভিযোগে জেলে যান প্রিগোজিন। ওই সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০। ডাকাতির মামলায় মোট ১২ বছর রুশ কারাগারে কাটান তিনি। এর মধ্যে ন'বছর ডিটেনশন ক্যাম্পে ছিলেন প্রিগোজিন। কারামুক্তির পর লেনিনগ্রাডের 'হট ডগ' বিক্রি করতেন তিনি।
প্রিগোজিন এবং পুতিন, দু’জনেরই জন্ম সেন্ট পিটার্সবার্গে। সোভিয়েত জমানায় এই শহরের নাম ছিল লেনিনগ্রাদ। সেখানেই হটডগের ব্যবসা শুরু করেছিলেন প্রিগোজিন। রান্না-বান্নায় তাঁর হাত ছিলো চমৎকার। কেটারিংয়ের ব্যবসাও ছিল তাঁর। পরে নিজে খুলে বসেন একটি রেস্তোরাঁ।
সোভিয়েত জমানায় প্রায় এক দশক জেলবন্দি ছিলেন প্রিগোজিন। প্রতারণা, সম্পত্তি লুঠসহ নানা অপরাধমূলক কাজে নাম আছে তার। জেল থেকে ফিরে এসেও রেস্তোরাঁ ও কেটারিংয়ের ব্যবসা সমান তালে শুরু করেন প্রিগোজিন। সময়ের সঙ্গে জমেও উঠে খাবারের ব্যবসা।
পুতিন ক্ষমতায় আসার পর একবার প্রিগোজিনের রেস্তোরাঁয় যান। সেখানেই তাঁর রান্না খুব পছন্দ হয় রুশ নেতার। নিজের খাস রাঁধুনি হিসেবেও প্রিগোজিনকে নিয়োগ দেন। ধীরে ধীরে প্রিগোজিন হয়ে ওঠেন পুতিনের বিশ্বস্ত বন্ধু। বাড়তে থাকে তার ক্ষমতা ও অর্থ।
২০১১ সালের পর থেকে ‘পুতিনের শেফ’ প্রিগোজিন ক্রেমলিনের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে নিযুক্ত হতে শুরু করেন। পুতিনের সহযোগী ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা থাকার সময় নিজের সশস্ত্র যোদ্ধা বাহিনী গড়ে তোলার আগ্রহ দেখালে পুতিনও তাতে সায় দেন।
আগে পুতিনের ব্যক্তিগত বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন রুশ সেনা কর্তা দিমিত্রি উডকিন। পরে পুতিন তাঁর ব্যক্তিগত বাহিনীর প্রধান করেন ইয়েভজেনি প্রিগোজিনকে। এই দলের নাম হয় ওয়াগনার গ্রুপ। এই গ্রুপকেই কোম্পানিতে পরিণত করতে প্রিগোজিনকে অনুমতি দেন পুতিন।
ওয়াগনার গ্রুপ শুরুতে প্রকাশ্যে আসেনি। পুতিনের ব্যক্তিগত সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে নীরবে কাজ করে গেছে। পশ্চিমারা এই গ্রুপ নিয়ে নানা কথা বললেও, মস্কো বরাবরই মুখে কুলুপ এঁটেছিলো। শোনা যায়, মেঘের আড়ালে মেঘনাদের মতো কাজ করত এই যোদ্ধা বাহিনী।
শুধুমাত্র পুতিনের নির্দেশই মানত। পুতিনের হয়ে তাঁর শত্রুদের নাশ করা, রাশিয়ার বিভিন্ন গোপন কাজ উদ্ধারের দায়িত্ব দেয়া ছিলো এই বাহিনীর উপর। এজন্য দাগি আসামিরাই ছিল প্রিগোজিনের বিশ্বস্ত সেনা। তাদের দলে ভিড়িয়েই ভয়ংকর সব কাজ সমাধা করতেন প্রিগোজিন।
আরও পড়ুন: মস্কো যাচ্ছে ওয়াগনার বাহিনী, বাধা দিলেই লড়াই
পূর্ব ইউক্রেনের রুশপন্থী বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে অস্ত্র সরবরাহ এবং সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য ওয়াগনার বাহিনীকে কাজে লাগানো হতো। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পুতিনের হয়ে ‘ছায়া যুদ্ধ’ করতো এই ভাড়াটে সেনার দল।
ইউক্রেনের যুদ্ধের সময়ই প্রকাশ্যে আসে ওয়াগনার বাহিনী। এই যুদ্ধে প্রিগোজিনের ওয়াগনার যোদ্ধারাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। ডনবাস সহ ইউক্রেনের বড় বড় শহরগুলো দখল করতে এই যোদ্ধাদেরই কাজে লাগানো হয়েছিলো।
৬২ বছর বয়সি ইয়েভজেনি প্রিগোজিনের নেতৃত্বাধীন ওয়াগনার বাহিনীই পুতিনকে ক্ষমতা থেকে টেনে মানাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পুতিনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান তিনি। রোস্তভ শহর দখলে নিয়ে এবার নাকি তারা মস্কোর দিকে এগোচ্ছেন প্রিগোজিন।
একাত্তর/আরবিএস