ইসরাইলের অধিকৃত ভূখন্ডে নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। এই হামলাকে তারা নাম দিয়েছে ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’। স্থল-আকাশ-পানি তিন পথেই সাঁড়াশি হামলা চলছে। এর জবাবে ইসরাইলি সেনারা শুরু করছে পাল্টা অভিযান, নাম ‘অপারেশন আয়রন সোর্ডস’।
ইসরাইলি সেরা সূত্রের দাবি, এই যুদ্ধে এখনও পর্যন্ত ২৫০ জন নিহত হয়েছেন। যদিও বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় হাজারের কাছে। রোববার সকাল থেকেও মুহুর্মুহু রকেট, মর্টার, বোমা হামলা অনবরত চলছে। দক্ষিণ ইজরাইলের সেরটসহ কমপক্ষে আটটি স্থানে এই মুহূর্তে দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই চলছে।
হামাস গেরিলারা শনিবার ভোর থেকেই হামলা শুরু করে দক্ষিণ ইসরাইলের ২২ স্থান লক্ষ্য করে। ভোরের আলো ফুটতেই আচমকা আকাশ ধোঁয়ায় ঢেকে ইসরাইলের মাটিতে বানের পানির মতো আছড়ে পড়তে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র। ২০ মিনিটে প্রায় পাঁচ হাজার রকেট ছোড়ে হামাসের সদস্য।
কেন এভাবে হামলা শুরু করলো হামাস, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সবাই। ইসরাইলের হাতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আয়রন ডোম। এই ব্যবস্থা ৭০ কিলোমিটার রেডিয়াসের মধ্যে যে কোনো হামলাকে ভন্ডুল করে দিতে সক্ষম। আর বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ভেবেছে হামাস।
ইসরাইলি প্রতিরক্ষার অন্যতম সেরা শক্তি এই আয়রন ডোমের ‘এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’-এর দুর্বলতার খোঁজ চালাচ্ছিল হামাস। খুঁজেও পাওয় গেলো। খুব অল্প সময়ের মধ্যে যদি প্রচুর রকেট দিয়ে হামলা চালানো হয়, তা হলে সব লক্ষ্যবস্তুকে একসঙ্গে আটকানোর ক্ষমতা থাকবে না আয়রন ডোমের। আর সেই দুর্বলতা খুঁজেই এক সঙ্গে কয়েক হাজার রকেট হামলা চালানো হয়। হামাসের উদ্দেশ্য ছিলো এমন হামলার চালিয়ে ইসরাইলি সেনাদের হতচকিত করে দেশটির ভূখণ্ড বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র হামলা চালানে। পথে পথে যুদ্ধ জড়িয়ে পরা। কারণ হামাস যোদ্ধাদের মৃত্যুর ভয় নেই, সেটিই ছিলো তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
ইসরাইলের মাটিতে হামাসের একটি সবচেয়ে বড় হামলা। দেশটির সেনারা দাবি করেছে, হামাসের সশস্ত্র সদস্যরা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হামলা চালিয়েছে। বহু মানুষকে বন্দি করেও নিয়ে গেছে। সবচেয়ে ভয়ানক অবস্থা সেরোটের। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে এখনও জোর লড়াই চলছে।
হামাস যোদ্ধারা হাজার হাজার রকেট নিক্ষেপ করে এবং গাজার নিরাপত্তা বেষ্টনী লঙ্ঘন করে কাছাকাছি ইসরাইলি শহর ও সামরিক চৌকিতে হামলা চালায়। তারা বাসিন্দা ও পথচারীদের ওপরও গুলি চালায়। গোষ্ঠীটি পশ্চিম তীরে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আহবান জানিয়েছে।
হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়া বলেছেন, একটি মহান বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে আমরা। এরিমধ্যে ইসরাইলি বন্দিদের ছবি প্রকাশ করে হামাস জানিয়েছে, তাদের গোপন সুরঙ্গে আটকে রাখায় হয়েছে। তবে সবাই সুস্থ ও নিরাপদে আছে। অন্যদিকে বন্দিদের উদ্ধারের সর্বোচ্চ তৎপরতা চালাচ্ছে ইসরাইল।
শনিবার সকালে স্থল, সাগর ও আকাশ পথে ইসরাইলের খুব দ্রুততার সঙ্গে হামলা শুরু করে হামাস। ভোর ছয়টার দিকে এই যুদ্ধ মিশন করে শুরু করে হামাসের সশস্ত্র যোদ্ধারা। তারা কারেম শালোম ক্রসিংয় দিয়ে ইসরাইলের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। ইসরায়েল এবং গাজার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চেক পয়েন্ট।
হামাস যোদ্ধারা সীমান্তের বেড়া ভেঙ্গে সামরিক বাহিনীকে আক্রমণ শুরু করে। যোদ্ধারা ইসরাইলের ইরেজ সীমান্ত ক্রসিং স্টেশনেও অভিযান চালিয়ে দখল করে নেয় । এ ধরনের চেক পয়েন্টকে লক্ষ্য করে তারা ইসরাইলের ওপর ক্লাস্টার বোমা নিক্ষেপ করতে শুরু করে।
এমন হতচকিত হামলায় ইসরাইলের সেনারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সকাল সাড়ে সাতটার দিকে হামাসের বহু যোদ্ধা ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে ঢুকে পরে দখল নিতে শুরু করে। সীমান্তের কাছাকাছি নয়টি শহরে ঢুকে পড়ে তারা। এ সময় রাস্তায় ইসরায়ইলি পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোদ্ধাদের সংঘর্ষ হয়।
ফিলিস্তিনি জঙ্গিরা সীমান্তের কিছু অংশ ধ্বংস করতে শুরু করে। ইসরায়ইলি সীমান্তের একটি ছোট প্রবেশ মুখকে অল্প সময়ের মধ্যে বড় করে ফেলতে সক্ষম হয় হামাসের যোদ্ধারা। এতে করে আরও যোদ্ধা দ্রুত সময়ের মধ্যে ইসারাইলে ঢুকে পড়ে। গাজা সীমান্তের কাছের শহরগুলোতে জিম্মি করতে শুরু করে।
হামাসের আরেক গ্রুপ প্যারাগ্লাইডিং করে ইসরাইলের ভূখণ্ডে নেমে পরে। এরা বিভিন্ন শহরের বাসা বাড়িতে ঢুকে পরে ব্যাপক গোলাগুলি করে। এতে বিকেল নাগাদ কমপক্ষে ২০০ ইসরাইলি নিহত হয় এবং আরও এক হাজারের মতো আহত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ।
অল্প সময়ের মধ্যে ইসরাইলি সেনারা পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। ইসরাইলি বাহিনীর পাল্টা বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন ২৩০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি। এসব হামলায় এরইমধ্যে আহতের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। গাজা উপতক্যায় হামাসের ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে তারা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলে এমন প্রাণঘাতী হামলা বিশ্বে আর দেখা যায়নি। পরিকল্পিত এ হামলায় গোয়েন্দাদের ‘ব্যর্থতা খুঁজছে’ ইসরাইল। অন্যদিকে হামাস বলছে, পৃথিবীতে শেষ দখলদারিত্বের অবসান ঘটানোর জন্য এটাই সবচেয়ে বড় যুদ্ধের দিন। তাদের বিজয় সুনিশ্চিত।
ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে সংঘাত নতুন কিছু নয়। কয়েক দশক ধরে সেখানে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। তবে এবার যে লড়াই শুরু হয়েছে তা যে বড় ধরনের সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বেড় একটি যুদ্ধের সূচনা হলো মাত্র।