ইরান-পাকিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা কোন পথে?

করোনা মহামারিকাল পেরুতে না পেরুতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ভেঙ্গে পরে বিশ্ব অর্থনীতির শৃঙ্খল। সেই ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই শুরু ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাত। যা ক্রমেই ছড়িয়ে পরছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। এর মধ্যেই আগুন জ্বলে উঠে ইরান-পাকিস্তান সীমান্তে।

পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী প্রদেশ বেলুচিস্তানে জঙ্গি সংগঠন জইশ অল অদলের এক ঘাঁটিতে ইরানের মারাত্মক মিসাইল ও ড্রোন হামলার পর, ইরানেও পাল্টা হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদেরও দাবি, তারাও ‘জঙ্গি দমন’ করতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরমধ্যে অন্য কোন বিরোধ নেই।

পাল্টাপাল্টি হামলায় ঘটনায় সংঘাতময় পৃথিবীতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্ব রাজনীতিতে যোগ হয়েছে নতুন উত্তেজনা, যা প্রতিদিনই বাড়ছে। ঘটনা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে কী-না, এমন আলোচনা শুরু হয়েছে দেশে দেশে। মানুষজন জানার চেষ্টা করছে, কেন ইরান-পাকিস্তানের মধ্যে এই বিরোধ।

ইরান ও পাকিস্তান- দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৯০০ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে। সীমান্তে পাকিস্তানের দিকে রয়েছে বেলুচিস্তান প্রদেশ। অপর পাশে রয়েছে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশ। পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে এই অঞ্চলেই সীমান্তের দুই পাশে। দুই দেশেরই দাবি এসব স্থানে রয়েছে জঙ্গি আস্তানা।

পাকিস্তানের বেলুচিস্তান ও ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী নানা গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। নিজ নিজ ভূখণ্ডে এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছে দুই দেশই। হামলার পর দুই দেশ একই সূরে কথা বলেছে। বল হয়েছে, সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ওপর হামলা হয়েছে, নাগরিকদের ওপর হয়নি।

পাকিস্তানে হামলা করার বহু আগেই ইরান মধ্যপ্রাচ্যে তার শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছিলো। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস, লেবাননের সামরিক গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ আর ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি সরাসরি তেহরানের আশীর্বাদ পেয়ে আসছে। এসব সংগঠনের খুঁটির জোর ইরানেই নিহিত। 
সম্প্রতি সিরিয়ায় জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ইরান। এরপর হামলা চালিয়েছে ইরাকেও। তেহরানের ভাষ্য, ইরাকে হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল ইসরাইলের গুপ্তচরদের একটি ঘাঁটি। এছাড়া গাজা সংঘাত ঘিরে সক্রিয় রয়েছে ইরানপন্থি বিভিন্ন গোষ্ঠী।

আফগানিস্তান-ইরানের সঙ্গেও আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করে নেয় পাকিস্তান। ইরান ও আফগানিস্তান- উভয়ই মুসলিম দু’টি দেশ। পাকিস্তানের মতো, আফগানিস্তানে সুন্নি মুসলিমদের সংখ্যা গরিষ্ঠতা হলেও ইরানে সংখ্যা গরিষ্ঠ শিয়া মুসলিমরা। ইতিহাস বলছে, পাকিস্তানকে ভালো প্রতিবেশী মনে করে না ইরান।

প্রতিবেশী হিসেবে পাকিস্তানের বদনাম বহু দিনের। দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তানকে ভালো প্রতিবেশী হিসাবে মনে করে না কোন দেশই। বিশেষ করে ভারত মনে করে, পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের বড় ধরনের বাণিজ্য সম্পর্কে থাকার পরও দেশটি থেকে ‘সন্ত্রাস’ ছাড়া আর কিছুই পাঠানো হয় না।

ভারতের থেকে খাদ্য, পণ্য, ওষুধ এবং শিল্প ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানি করে পাকিস্তান। কিন্তু ভারত বার বার অভিযোগ করেছে, পাকিস্তান ‘রপ্তানি করে’ সন্ত্রাস। আসলে কোনও প্রতিবেশীর সঙ্গেই পাকিস্তানের সৌহার্দ্য নেই। ভারত-পাক সীমান্ত মাঝেমধ্যেই অশান্ত হয়ে ওঠে।

সম্প্রতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পাকিস্তান-আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান-ইরান সীমান্ত। এই উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা কি আছে, এমন প্রশ্নই উঠছে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের চরিত্র বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এই উত্তেজনা বাড়তে পারে। তেহরানের জন্য উদ্বেগের বিষয়টা হবে যে পাকিস্তান সীমা অতিক্রম করে তাদের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে। যা তেহরানের সহজে মেনে নেয়ার কোন কারণ নেই।

iran-pakistan1

মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই প্রতিবেশী তিন দেশের সীমান্ত টপকে যাওয়ার ঘটনাকে তেহরান দেখছে, শুধুই জঙ্গি নিধনের মিশন হিসাবে। দেশগুলো সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন অভিযোগ বারবারই অস্বীকার করে আসছে ইরান। তেহরানের ভাষ্য, জঙ্গিগোষ্ঠী ও জয়েনবাদির বিরুদ্ধে তাদের জিরো টলারেন্স।

ইরান মনে করে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান থেকে জঙ্গিরা এসে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে হামলা করছে। অন্য দিকে পাকিস্তানও মনে করে, বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন যোগাচ্ছে ইরানের গোয়েন্দারা। পাকিস্তান অংশে বালুচরা আলাদা একটি দেশ গঠন করতে চায়।

পাকিস্তান ও ইরান- দুদেশের সীমান্তের ভেতরে ‘জঙ্গিদের কার্যক্রম’ দেশ দুটির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে শিয়া-সুন্নি বিরোধ। পাকিস্তানে বিভিন্ন সময় শিয়াদের লক্ষ্য করে নানা ধরনের হামলা হয়। এ বিষয়টি ইরানের মধ্যে একটি চাপা ক্ষোভ তৈরি করেছে বহুদিন ধরে।

তবে এসবের পরও রাজনৈতিকভাবে সুসম্পর্ক বজায় রাখে ইরান-পাকিস্তান। তাই পর্যবেক্ষকদের একাংশের ধারণা, এই সংঘাত আর বাড়বে না। যা হয়েছে, তা হলো দুই দেশই প্রমাণ দিতে চেয়েছে, নিজ নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষা সামর্থ্য রয়েছে তাদের। সাধ্যমতো লড়াই করার বার্তাই দিয়েছে ইরান-পাকিস্তান।