বুশরা বিবি সম্পর্কে যা জানা যায়

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্বকাপ ক্রিকেট জয়ী অধিনায়ক ইমরান খানের প্লেবয় ইমেজের কথা কম বেশি সবাই জানে। বিশেষ করে ক্রিকেট দুনিয়ার এক সময়কার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পুরুষ হিসাবে তাকে মনে করা হতো। বিয়েও করেছেন একাধিক, সব সবগুলো নিয়েই গুজব-রটনার অভাব ছিলো না। এরই ধারাবাহিকতায় ইমরান খানের তৃতীয় স্ত্রীকে নিয়ে গুজব ছড়াতে বেশি সময় লাগেনি।

ইমরান খানকে বিয়ে করার আগে বুশরা বিবি পরিচিত ছিলেন বুশরা বিবি মেনকা হিসাবে। ক্রিকেটের মাঠে থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা ইমরান খানের আগের দুই স্ত্রীর মতো বুশরা বিবি গ্ল্যামারাস জীবনের বাসিন্দা ছিলেন না, যেমনটি ছিলেন ব্রিটিশ সমাজকর্মী জেমিমা গোল্ডস্মিথ ও  সাংবাদিক-উপস্থাপক রেহাম খান। 

২০১৮ সালে বুশরাকে বিয়ে করার পর ইমরান খান বেশ গর্বের সঙ্গেই ঘোষণা করেছিলেন যে, বিয়ের আগে তার সঙ্গে বুশরার দেখা হয়নি, মেলামেশা তো দূরের কথা। ইমরান খানের মুখ থেকে এমন কথা অনেককেই বিস্মিত করেছে, কেননা ১৯৮০ দশকে তার জীবনটাই ছিলো ইংল্যান্ডের দামি নাইট ক্লাব ঘিরে। 

ডেইলি মেইলকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সে সময় ইমরান খান বলেছিলেন, বুশরার বুদ্ধিমত্তা ও চরিত্রই তাকে তার কাছে আকৃষ্ট করেছিলো। কিন্তু ইমরানের এষব কথাতে তেমন কোন কাজ হয়নি। উল্টো বুশরা বিবিকে ঘিরে যে রহস্যময় পর্দা, সেদিকের প্রতি আগ্রহ বেশি ছিলো মানুষের। 

শনিবার ‘অনৈসলামিক নিকাহ’ স্বামীর সাথে দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকেই বিশ্বব্যাপী মানুষ বুশরা বিবি বিষয়ে গুগলে সার্চ করছে। তাকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে দেখা যায়নি কখনো, এমনকি স্বামীর নির্বাচনী প্রচারেও তার উল্লেখ করার মতো উপস্থিতি দেখা যায়নি কখনো। তবুও তাকে খুঁজছে সবাই। 

বুশরার রহস্যময়তাই তাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। তাকে ‘আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী’ বলে মনে করেন অনেকে। আধ্যাত্মিক বিষয়ে পরামর্শদাতা হিসেবে তার কিছু অনুসারীও আছে, যারা তাকে আলাদা সম্মান দেন। পাকিস্তানে কেউ কেউ বলেন বুশরা বিবি সুফি ভাবধারার সাথে যুক্ত। 

যদিও অনেকেই আবার সে বক্তব্যের সাথে একমত নন। ইসলামিক রহস্যে ঘেরা সুফিবাদ স্রষ্টার অনুসন্ধান এবং পার্থিব বিষয় ত্যাগের উপর জোর দেয়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইমরান খান এই ধারার প্রতি আগ্রহী। সেই সূত্রেই বুশরার সঙ্গে ইমরানের পরিচয় ঘটে বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। 

প্রায় দুই দশক আগে ১৯৯৫ সালে ব্রিটিশ নাগরিক জেমিমা গোল্ডস্মিথকে বিয়ে করেন ইমরান খান। তখন তার বয়স ৪৩ বছর আর জেমিমার বয়স ছিল ২১ বছর। মিজ গোল্ডস্মিথের বাবা সেসময় বিশ্বের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। ৯ বছর স্থায়ী সে সংসারে তাদের দুটি পুত্রসন্তান আছে।

এরপর ২০১৫ সালে সাংবাদিক এবং বিবিসির সাবেক আবহাওয়া উপস্থাপিকা রেহাম খানের সাথে ইমরান খানের দ্বিতীয় বিয়ে টিকেছিল এক বছরেরও কম সময়। রেহামের দাবি, ইমরান খানের সমর্থকরা তাকে হেনস্তা করেছিল এবং এ নিয়ে পরে একটি বইও লেখেন তিনি।

এই দুই বিয়ের বিপরীতে, ইমরান খানের ২০১৮ সালের তৃতীয় বিয়ে ছিল খুবই সাদামাটা। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এই বিয়ে ইসলামের প্রতি ইমরান খানের আনুগত্যকে জনগণের সামনে বেশ ভালোভাবে উপস্থাপন করেছিল। ইমরান খানের তৃতীয় বিয়ের পেছনে রাজনৈতিক অভিলাষও যুক্ত ছিলো। 

শোনা যায়, একবার ইমরান খান ১৩ শতকে নির্মিত এক দরগায় পরামর্শের জন্য গিয়েছিলেন পাঁচ সন্তানের মা বুশরা বিবির কাছে। তখনো বুশরা বিবি তার প্রথম স্বামীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে ছিলেন। এ সময় একদিন বুশরা বিবি স্বপ্নে দেখেন, শুধমাত্র তাদের বিয়ে হলেই ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন।

এরপর তারা বিয়ে করেন এবং ছয় মাস পর ইমরান খান দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তবে, বর্তমানে ৪০ বছর বয়সী বুশরা বিবি ২০১৮ সালের অক্টোবরে তার দেয়া একমাত্র টিভি সাক্ষাৎকারে এ বিষয়টি নাকচ করে দেন। তবে উপস্থাপককে আশ্বস্ত করেন, ইমরান খানের অধীনে দ্রুতই পাকিস্তান উন্নতি করবে।

ইমরান খান আমলে দেশটির অর্থনীতি ধসে পড়েছিল, জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যায়, তার বিরোধীপক্ষের অনেককে জেলে যেতে হয়েছিল। এছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছিলো এবং মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়া ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চার বছরের মধ্যেই ইমরান খানের রাজনৈতিক জীবনে ঝামেলা শুরু হয়। এক পর্যায়ে ২০২২ সালে তাকে সংসদে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। পরের বছর তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং বেশকিছু মামলায় তাকে জেলে পাঠানো হয়। এখন বুশরা বিবিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

বুশরার সাবেক স্বামীর নাম খাওয়ার মানেকা। সবশেষ ২০১৭ সালের বিবাহবিচ্ছেদের আগে তাদের ২৮ বছরের সংসার ছিলো। সরকারি কর্মচারী এবং সুপরিচিত এক রাজনীতিবিদের ছেলে খাওয়ার মানেকা। নভেম্বরে তিনি বুশরার নামে ‘বিয়েতে প্রতারণা এবং ব্যভিচারের’ অভিযোগ দায়ের করেন।

ব্যভিচারের অভিযোগ বাতিল করলেও প্রতারণার অভিযোগটি আমলে নেয় আদালত। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, স্বামীর মৃত্যু বা বিবাহ বিচ্ছেদের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নারীরা আবারো বিয়ে করতে পারেন না। কিন্তু খাওয়ার মানেকার সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পর নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার আগেই বুশরা বিবি ইমরান খানকে বিয়ে করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। তার আইনজীবীরা বলেছেন, মামলাগুলো রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দলটি বলেছে, বুশরা বিবির সাজা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপ সৃষ্টির আরেকটি প্রচেষ্টা।