বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি মরিয়ম নওয়াজ

পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ পাঞ্জাবের প্রভাবশালী শরীফ পরিবারের মেয়ে হিসাবে মরিয়াম নওয়াজের ইতিহাস তৈরির বিষয়টি ছিলো শুধু সময়ের অপেক্ষা। কারণ, এই পরিবারটি পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভুট্টো পরিবার থেকে কম যায় না। সেনা শাসনের বাইরে দুই পরিবারের হাতেই ঘুরেছে পাকিস্তানের রাজনীতি।

পাঞ্জাবের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া মরিয়ম নওয়াজের জন্য যতটা সহজ হয়েছে, তার চেয়ে ঢের কঠিন হবে তার সামনের পথ চলা। তার সামনে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ, কি সেই সব চ্যালেঞ্জ। মজার বিষয় মরিয়মের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে তাই পরিবার, বিশেষ করে তার পূর্বসূরীরা। 

শরীফ পরিবারের চতুর্থ সদস্য আর প্রথম নারী হিসাবে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে সবে কাজ শুরু করেছেন মরিয়ম। তার প্রথম চ্যালেঞ্জই হলো, এই পদে তার পূর্বসূরীদের রেখে যাওয়া পারফর্মেন্স। নওয়াজ থেকে শুরু করে শেহবাজ ও হামজার আমলের থেকে ভালো কিছু করার বিশাল চ্যালেঞ্জ তার সামনে। 

পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নওয়াজ ও শাহবাজ দুজনেই সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন। সেই সঙ্গে জনতার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিলো ঘনিষ্ঠ এবং সরাসরি। অন্যদিকে গেলো ১৩ মাস পাঞ্জাবের তত্ত্বাবধায়ক মুখ্যমন্ত্রী মহসিন নকভি কাজের দিক থেকে দ্রুততম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন। 

তিনি শেহবাজ শরীফের রেকর্ড ভেঙ্গে ‘মহসিন স্পিড’ খেতাব অর্জন করেন। বিপরীতে মরিয়মের জন্য এটি হবে প্রথম কোন পাবলিক অফিসের অভিজ্ঞতা। ফলে মহসিন নকভি ও মাহবাজ শরীফের পারফর্মেন্সকে ছাড়িয়ে যাওয়ার একটি চাপ অলক্ষ্যেই মরিয়মের ভেতরে থাকবে। 

অভিযোগ আছে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হবার পরও মরিয়ম নওয়াজের জনসম্পৃক্ততা বেশ কম। অথচ নওয়াজ ও শাহবাজ শরীফ এর ঠিক বিপরীতি চরিত্রেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেকটা নীরব নওয়াজ কন্যা। নাগরিক ব্যস্ততা ও সামাজিক মাধ্যম দুই হতে পারে তার বড় চ্যালেঞ্জ। 

পিএমএল-এন সূত্র বলছে, মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে সফল হতে হলে মরিয়মকে তার অহংকার দূরে সরিয়ে রাখতে হবে এবং জেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এসিরুমে বৈঠক করে সময় না কাটিয়ে মাঠে পর্যায়ে নিজেকে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রাখতে হবে। কারণ, জনতা সব সময় নেতাকে কাছে পেতে চায়। 

শেহবাজ শরীফ এবং মহসিন নকভি গভীর রাতে কিংবা ভোরে বিভিন্ন শহরে উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করতেন এবং সংশ্লিষ্টদের উপর সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। তারা দুজনই ব্যক্তিগতভাবে উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি করেন এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই সেগুলো সম্পন্ন করতে সক্ষম হন।

মহসিন রাজা নকভি তত্ত্বাবধায়ক মুখ্যমন্ত্রী হবার পর বেতন ও প্রোটোকল না নেয়ার ঘোষণা দেন। রাজনৈতিক পন্ডিতরা আশা করেছিলেন যে, মরিয়ম নওয়াজ প্রাদেশিক পরিষদের সভায় তার প্রথম বক্তৃতায় একই রকম ঘোষণা করবেন, তবে তিনি এখনও এমন কোনও ঘোষণা দেননি।

পাঞ্জাবের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে, মরিয়ম নারীদের সহিংসতা, লিঙ্গ বৈষম্য, অনার কিলিং এবং অন্যান্য নারীসম্পর্কিত বিষয়গুলো গ্রহণ করবেন বলে প্রত্যাশা খুব বেশি। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে তিনি পাঞ্জাবের নারীদের জন্য বিশেষ প্যাকেজ দেবেন বলেও আশা করা হচ্ছে। 

এছাড়াও মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, নগর উন্নয়ন, পানি ও স্যানিটারি পরিষেবা ও শহরাঞ্চলের চারপাশে সবুজ এলাকা বাড়ানো, অবৈধ হাউজিং ব্যবসা, দুর্নীতি, বিচার এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মতো কয়েকটি ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী মরিয়াম নওয়াজকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হবে।

পূর্বসুরীদের চেয়ে মরিয়ম নওয়াজকে অনেক বেশি নতুন উন্নয়ন প্রকল্প শুরু করার পাশাপাশি প্রদেশ জুড়ে চলমান প্রকল্পগুলি পরিদর্শন করতে হবে। আবার পাঞ্জাব সীমান্তে সন্ত্রাস ও চোরাচালানও বড় চ্যালেঞ্জ হবে মরিয়মের জন্য। তাদের দমনে নতুন ধরনের কৌশল নিতে হবে তাকে। 

নিত্যপণ্য ও খাবারের দাম কমিয়ে আনাও মরিয়মের জন্য কঠিন হবে। তবে এটি করতে না পারলে শুরুতেই তার জনপ্রিয়তায় ধস নেমে আসতে পারে। প্রদেশ জুড়ে ন্যূনতম মজুরি কার্যকর করা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। আর এসব কাজের জন্য আসছে রমযান মাস মরিয়মের জন্য প্রথম এসিড টেস্ট হবে বলেই মনে করছে সবাই। 

নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে বিভিন্ন সরকারি দফতরের বিষয়গুলো দেখতে হবে। বিলাসবহুল যানবাহন এবং অতিরিক্ত পেট্রোলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সঙ্গে স্থানীয় সরকার পুনরুদ্ধারে আরও কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে মরিয়াম নওয়াজকে।