গাজায় নিরানন্দ ইফতার, বেঁচে থাকাই দায় 

রমজান মাসে যুদ্ধবিরতির বদলে গাজায় হামলা আরো জোরদার করেছে ইসরাইল। একই সঙ্গে বেড়েছে ত্রাণ নিতে যাওয়া মানুষজনের ওপর হামলা। সীমান্তেও ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশে বাধা দেয়া হচ্ছে আগের চেয়ে বেশি। ফলে দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে থাকা গাজার বাসিন্দারা বুনো লতাপাতা খেয়ে রোজা রাখছেন। 

গাজা উপত্যকাজুড়ে এখন প্রতিদিনের দৃশ্যপট একই। সারাদিনই পড়ছে একের পর এক বোমা। ধসে পড়ছে বাড়িঘর। ইসরাইলি হামলায় প্রাণ হারাচ্ছেন গাজার রোজাদার মানুষজন। তারই মধ্যে সূর্যাস্ত হলেই ধ্বংসস্তূপের ওপর বসেই শুকনো প্যাকেটজাত খাবার দিয়ে ইফতার করছেন গাজাবাসী। 

ইসরাইলি গোলায় বাস্তুচ্যুত এক ফিলিস্তিনের ভাষায়, বোমা হামলায় আমাদের পাঁচতলা বাড়িটা ধসে পড়ে। আর তার নিচে চাপা পড়ে মারা যায় আমার ছেলে। একটা প্রোডাকশন হাউস ছিলো আমাদের। লাখ লাখ ডলার মূল্যের যন্ত্রপাতিও ধুলোর সাথে মিশে গেছে। এখন খোলা আকাশই আমার ঠিকানা।

 

জাবালিয়ায় নিজের ধসে পড়া বাড়ির দেয়ালের ওপর বসেই ইফতার করে ফিলিস্তিনি আল খালৌত পরিবার। তিনি বলেন, আমার অবস্থা দেখুন। ৮০ কেজি ওজন ছিলো, এখন ৬৫। গাজার চারপাশে তাকালে দেখবেন মানুষের হাঁটারও শক্তি নেই। খাবারের অভাবে সবার প্রাণ যায় যায় দশা। 

উম নায়েল আল খালৌত নামের এক নারী জানান, সেহেরিতে জঙ্গলি পাতা সেদ্ধ করে খাচ্ছেন তারা। এমন পরিস্থিতি পৃথিবীতে যেন আর কাউকে দেখতে না হয়। এক টুকরো রুটিও নেই। রমজান মাস। আমরা রোজা রাখছি জংলি পাতা খেয়ে। মানুষজন সাগরের লবণাক্ত পানি খেয়ে রোজা খুলছে। এরপর আর কি দেখার বাকি আছে, আল্লাহই ভালো জানেন।

পবিত্র মাস রমজানের প্রথম দিন রানদা বাকের ও তার পরিবারের সদস্যরা দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে দক্ষিণ গাজায় তাদের তাঁবুর ভেতর বসে ইফতার করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বাকের দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও মানবিক ত্রাণ থেকে পাওয়া খাবারের সমন্বয়ে ইফতারের ব্যবস্থা করেছিলেন, যার মধ্যে ছিল ভাত, আলু ও শিমের বীজ। ইফতারের সময় তার তিন সন্তান খুব চুপচাপ ছিল।

বাকেরের ১২ বছর বয়সী ছেলে আমির এতটাই অসুস্থ যে সে তাদের সাথে যোগ দিতে পারেনি। যুদ্ধের আগে তার স্ট্রোক হয়। এই রমজানে বাকেরের স্বামী ইসরাইলী হামলায় নিহত হন। গাজায় ইসরাইলের হামলার প্রথম মাসে তিনি এবং আরো ৩১ ব্যক্তি প্রাণ হারান। ইসরাইলি বিমান হামলায় গাজা সিটির উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণি অধ্যুষিত রিমাল জেলায় তাদের ও তাদের প্রতিবেশীদের বাড়িগুলো মাটির সাথে মিশে যায়।

বাকের (৩৩) বলেন, এ বছরের রমজান মাস হলো খাদ্যাভাব, বেদনা ও ক্ষতির। তিনি আরো বলেন, যাদের আমাদের সঙ্গে টেবিলে থাকার কথা, তারা আমাদের ছেড়ে গেছেন। আর জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে গৃহহীন ফিলিস্তিনি রাদওয়ান আবদেল হাই বললেন, আমরা এমনিতেই রোজা রাখছি। প্রত্যেক পরিবারে একজন শহীদ বা আহত সদস্য রয়েছে।

ফিলিস্তিনিরা রাফায় খোলা বাজারে পণ্য খুঁজে পাবার চেষ্টা করছেন। সরবরাহ খুব কম। গোশত, সবজি, ফল প্রায় নেই। দাম আকাশচুম্বী। অনেকেই ক্যানের খাবার খাচ্ছেন। খান ইউনুসে একজন গৃহহীন নারী সাবাহ আল হেন্দি বললেন, কারো চোখে আনন্দ নেই। সব বাড়িতে শোক। এখানে রমজানের কোনো আবহ নেই।

গাজার উত্তরাঞ্চলের বেশিরভাগ অবকাঠামোই গুড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইলি হায়েনারা। রমজান শুরুর প্রথম শুক্রবার সেখানকার বাসিন্দারা নামাজও আদায় করেন ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি মসজিদের প্রাঙ্গণে। এক মুসল্লি বলেন, এখানে একটি মসজিদ ছিলো। প্রতি বছর রমজানে আমরা এই মসজিদেই নামাজ পড়তাম। ইসরাইল সেটাও উড়িয়ে দিয়েছে। তাই এ জায়গাকেই অস্থায়ী মসজিদের মর্যাদা দিয়ে নামাজ পড়ছি আমরা। 

পেটে অসহনীয় ক্ষুধা, তার ওপর যেকোনো সময়ে হামলার ভয়। তারপরও থেমে নেই ফিলিস্তিনিদের ইবাদত। এতকিছুর পরও তারাবিহ পড়তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া মসজিদ প্রাঙ্গণে যান তারা। তাদের ভাষায়, মানুষ মরছে চারপাশে, আমাদের পরিবারের মানুষজন মারা যাচ্ছে একের পর এক। 

তারা আরও জানান, বিনা চিকিৎসায় রোগীর সেবায় শুধু অবনতিই হচ্ছে, তারপরও সবাই আসছেন নামাজ পড়তে। এটাই হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার প্রতি আমাদের প্রতিজ্ঞা, যেটা আমরা শেষনিশ্বাস পর্যন্ত পালন করবো। যুদ্ধ বিরতি, নয়তো নিশ্চিত মৃত্যু। হয় বোমায় নয় ক্ষুধায়। দীর্ঘদিন ধরে এখন এই ভয়ই তাড়া করছে গাজাকে। 

এদিকে, প্রতিদিন গাজা উপত্যকায় সাড়ে সাত হাজার ইফতারির প্যাকেট বিতরণ করা হচ্ছে এবং এই কার্যক্রম পবিত্র ঈদুল ফিতর পর্যন্ত চলবে প্রতি বছরের মতো এবারও অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ইফতারি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে ইরান। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সহযোগিতায় পবিত্র রমজান মাস শুরুর আগেই এই ইফতার সামগ্রী পাঠানো শুরু হয়। যা এখনও চলছে।