আর একদিন পরেই, স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে ছুঁয়ে দেবেন বিজেপি নেতা নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী। রোববার টানা তৃতীয় মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেবেন তিনি। তার আগে এই কৃতিত্ব দেখিয়েছেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতা নেহরু।
এনডিএ জোটের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শুক্রবার সংসদ ভবনের সেন্ট্রাল হলে বৈঠক বসেছিলেন। ওই বৈঠকে রাজনাথ জোটের নেতা হিসাবে মোদীর নাম প্রস্তাব করেন। একই সঙ্গে সংসদে বিজেপির নেতা হিসাবেও মোদীর নাম প্রস্তাব করা হয়। এই প্রস্তাবে সায় দেন এনডিএ জোটের শরিক দলের নেতারা।
টানা তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর পদ নিশ্চিত হবার পরেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কংগ্রেসকে আক্রমণ করতে ভুল করলেন না বিজেপির এই নেতা। নীতীশ কুমার ও চন্দ্রবাবু নাইডুর সমর্থনের দৌলতে কোনও ক্রমে ২৭২ আসনের ম্যাজিক ফিগার অতিক্রম করেই আবারও কংগ্রেসের উদ্দেশ্যে কটাক্ষ ছুড়ে দিলেন মোদি।
দশ বছরেও ১০০ আসন না পাওয়ায় কংগ্রেসকে কটাক্ষ করেন তিনি। মোদী বলেন, ২০১৪, ১৯ ও ২৪ সালে কংগ্রেসের প্রাপ্ত আসন যোগ করলেও এ নির্বাচনে বিজেপির আসন সংখ্যাকে ছুঁতে পারবে না। আমি পরিষ্কার দেখতে পারছি ‘ইন্ডি’ জোট আগে একটু একটু করে ডুবছিলও, এবার দ্রুতগতিতে ডুবতে চলেছে।
বলে রাখা ভালো বিজেপি তথা এনডিএ নেতারা বঙ্গ করে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ‘ইনডিয়া’ জোটকে ব্যাঙ্গ করে ইন্ডি নামেই ডেকে থাকেন। এবারের লোকসভা নির্বাচনে ৩২৮ আসনে প্রার্থী দিয়ে ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন দল কংগ্রেস ৯৯ আসনে জয়লাভ করেছে। এটাই দলের গত ১৫ বছরের সবচেয়ে ভাল ফল।
২০১৪ সালে ৪৪ ও ২০১৯ সালে ৫২ আসনে জিতেছিল কংগ্রেস। একমাত্র ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী মনোমহন সিংয়ের নেতৃত্বে শেষবার দুশ’ আসনের গন্ডি অতিক্রম করে ২০৬ আসন পেয়েছিলো কংগ্রেস। কিন্তু পাঁচ বছর পরেই মোদী ঝড়ে উড়ে যায় কংগ্রেস, একই সঙ্গে কেন্দ্রে ক্ষমতা হারায়।
আর কংগ্রেসের এই আসন সংখ্যাকেই হাতিয়ার করেছেন মোদি। যদিও কেন্দ্রে গত দশ বছর ধরে যে সরকার চলছিলো, সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। গত তিনটি নির্বাচনের মধ্যে বিজেপি এবার সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে। ৫৪৩ আসনের মধ্যে এনডিএ পেয়েছে ২৯২ আসন, আর বিজেপি একা পেয়েছে ২৪০ আসন।
তবে মোদির দাবি, এবারের ভোটে ইভিএম যোগ্য জবাব দিয়েছে, এটা এনডিএ-এর মহাবিজয়, অথচ ফল প্রকাশের পর আমাদের ফলকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা হল। যেন আমরা হেরে গিয়েছি। দেশ জানে, আমরা না হেরেছি, না আমরা হারব। আগেও এনডিএ সরকার ছিল, এখনও আছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, যেন লোকজন গণতন্ত্রে বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়। ক্রমাগত ইভিএমের অপব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু ৪ জুন সন্ধ্যায় ইভিএম তাদের নীরব করে দিয়েছে, এটাই ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি। বিজেপিকে খাটো করতে বিরোধীদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ করে দিয়েছে জনগন।
ইনডিয়া জোটকে কটাক্ষ করে মোদী বলেন, একদিকে জোট হয়েছে অন্যদিকে আবার পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ছে। এরমধ্যেই বলতে শুরু করেছে নির্বাচনের জন্য জোট হয়েছিল এখন আর নেই। ভোট পেতে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন মানুষ কংগ্রেসের অফিসে ধর্না দিচ্ছে আর তাদের তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।
জোটের অংশীদার এবং নবনির্বাচিত আইন প্রণেতাদের সম্বোধন করে নরেন্দ্র মোদি বলেন, এনডিএ ক্ষমতার জন্য একত্রিত হওয়া দলগুলোর একটি গোষ্ঠী নয়, বরং ‘জাতি প্রথম’ নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি জোট। এটি ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল জোট বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সরকার চালানো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব দেন সর্বসম্মতির উপর। তাঁর কথায়, সর্বসম্মতিতে চলবে দেশ। তিন দশক ধরে এনডিএ রয়েছে। এটা সামান্য ঘটনা নয়। আগামী দিনেও সর্বসম্মতি নিয়ে আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব। যদিও জোট ধর্ম বজায় রাখতেই মোদীর মুখে সর্বসন্মতির কথা উঠছে বলে মন করা হচ্ছে।
২০১৪ ও ২০১৯ সালে স্পষ্ট বহুমত থাকার সময় মোদিকে খুব একটা এনডিএ জোটের প্রসঙ্গ তুলতে দেখা যায়নি। তবে এবার সরকার গড়তে নাইড ও নীতীশের উপর নির্ভরশীলতাই মোদীকে জোট ধর্মের পথে ফিরিয়ে এনেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
মোদির কথায় তাঁর কাছে সব দলই সমান। সেটাই এনডিএর স্পিরিট। তাই গত ৩০ বছর ধরে জোট হিসেবে টিকে রয়েছে এনডিএ। এরই ধারাবাহিকতায় এনডিএ জোট সদস্য মোদীকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন করে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে সমর্থনের চিঠি পেশ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ওড়িশা বিজয় প্রসঙ্গ টেনে মোদী বলেন, আমি সব সময় এটাই মেনে আসি যে গরিবের দেবতা মহাপ্রভু জগন্নাথ। আগামী ২৫ বছরে ওড়িশা দেশের বিকাশে একদম সামনের সারিতে থাকবে। মোদীর কথায়, জগন্নাথ দেবের আশীর্বাদ নিয়েই গরিবদের জন্য কাজ করে যাব, পথ দেখাবে ওড়িশা।
তবে মোদী বলেন, সব দলের প্রতিনিধিই আমার কাছে সমান। লোকসভা কি রাজ্যসভা, সবাই সমান। এই কারণেই এনডিএ এগিয়েছে। সবাইকে আলিঙ্গন করতে আমরা পিছপা হই না। ২০২৪-এ যে ভাবনায় কাজ করেছি, শুধু ফটোসেশনের জন্য নয়, তৃণমূলস্তরে কাজ করার জন্যই এনডিএ জোট হয়েছে।
তবে মোদী বলেন, লোকসভা হোক বা রাজ্যসভা, আমাদের কাছে সবাই সমান। এই কারণেই এনডিএ জোট এগিয়েছে। সবাইকে আলিঙ্গন করতে আমরা পিছপা হই না। ২০২৪ সালে যে ভাবনায় কাজ করেছি, শুধু ফটোসেশনের জন্য নয়, তৃণমূলস্তরে কাজ করার জন্যই এনডিএ জোট জয়ী হয়েছে।
নিজেকে সাত দিন ২৪ ঘন্টা পাওয়া যাবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোদী বলেন, দেশবাসীর আশা-আকাঙ্খা পূরণে কোনও ত্রুটি রাখব না। আমার জন্য জন্ম, ওয়ান লাইফ, ওয়ান মিশন। সেটা হল ভারত মাতা। এই মিশন হল ১৪০ কোটি দেশবাসীর কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া।