ভারতের রাজধানী দিল্লিতে তাপদাহ ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। রাজ্যটির চিকিৎসকরা এরইমধ্যে সতর্কতা জারি করে বলেছেন, চলমান তাপদাহ হিটস্ট্রোকে মৃত্যু সংখ্যা বাড়তে পারে। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে গত দুই দিনে দিল্লির একটি হাসপাতালেই পাঁচজন মারা গেছেন এবং ১২ জন লাইফ সার্পোর্টে আছেন।
মঙ্গলবার দিবাগত রাতটি ১২ বছরের মধ্যে নগরীটির রেকর্ড উষ্ণতম রাত ছিল। তাপদাহের মধ্যে দুই কোটি বাসিন্দার শহরটির পানি সঙ্কট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার রাতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৩৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিলো, তখন দিল্লিতে বিদ্যুতের চাহিদা সর্বকালের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল।
দিল্লির সরকারি রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. অজয় শুক্লা ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে জানিয়েছেন, হিটস্ট্রোকের শিকার হয়ে ২২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলো এবং তাদের মধ্যে পাঁচজন মারা গেছেন এবং ১২ জন লাইফ সাপোর্টে আছেন।
দিল্লির জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, হিটস্ট্রোকের ক্ষেত্রে এবার মৃত্যুর হার অনেক বেশি, প্রায় ষাট থেকে সত্তর শতাংশ। রোগীকে হাসপাতালে দেরি করে আনা হলে, একের পর এক অঙ্গ ব্যর্থ হতে শুরু করে। এ নিয়ে সচেতনতার অভাবও রয়েছে। এই রোগীদের বেশিরভাগই পরিযায়ী শ্রমিক।
ডা. শুক্লা বলেন, হিটস্ট্রোক সম্পর্কে আমাদের মানুষকে শিক্ষিত করতে হবে। হাসপাতালে ছুটে যাওয়ার পরিবর্তে, হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঘটনাস্থলেই প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা দেয়া প্রয়োজন। এমনকি হাসপাতালে নেয়ার সময়ও সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি ও বরফ রাখতে হবে।
চলতি গ্রীষ্মে দিল্লির বাসিন্দারা প্রায় একমাস ধরে অবিরাম তাপপ্রবাহের মধ্যে ভুগছেন। শহরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে, যা স্বাভাবিকের থেকে কয়েক ডিগ্রি বেশি এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রির কাছাকাছি। কলের পানি গরম থাকছে, এমনকি এয়ার কন্ডিশনও ঠিক মতো কাজ করছে না।
আবহাওয়া অফিস তার পূর্বাভাসে বলেছে, উত্তর ভারতের বেশিরভাগ অংশে তাপপ্রবাহ পরিস্থিতি আগামী ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে এবং এরপর কমতে পারে। রাতের বেলায়ও অস্বাভাবিক উষ্ণতা বিরাজ করছে। বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকায় দিল্লির বাসিন্দাদের অস্বস্তি সব সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
দিল্লিভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের (সিএসই) বিজ্ঞানী রজনীশ সরিন বলেন, রাজধানীকে ইট ও কংক্রিটের স্থাপনা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। কংক্রিটের দালানগুলো দিনে তাপ শোষণ করে এবং রাতে তা ছেড়ে দেয়। এই কারণেই বড় শহরগুলোতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বাড়ছে।
তিনি আরও জানান, আগে গরমের সময় রাতের বেলায় কিছুটা স্বস্তি পাওয়া গেলেও সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। দিল্লিতে নির্মাণ কাজ বাড়ছে এবং সবুজ এলাকা কমে যাচ্ছে। উঁচু ভবন নির্মাণ বাতাস চলাচলেও প্রভাব ফেলছে। কংক্রিট ব্যবহার কমাতে না পারলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
এদিকে, দীর্ঘমেয়াদি তাপদাহের কারণে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চলতি সপ্তাহে বিদ্যুৎ চাহিদা রেকর্ড ৮ হাজার ৬৪৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দিল্লি এবং উত্তর ভারতের অন্যান্য এলাকায় তাপমাত্রা ৪৪-৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করছে।
এসির মতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে বিদ্যুতের ওপর চাপ বেড়েছে। যার ফলে দিল্লিতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা যাচ্ছে। এর আগে মঙ্গলবার উত্তর ভারতের বিদ্যুৎ ব্যবহার ৮৯ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছায়। সোমবার দিল্লি বিমানবন্দর বেশ কয়েক মিনিট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিলো।
এছাড়া তীব্র পানির সংকটে ভুগছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মানুষ বালতি হাতে পানির ট্রাকের সামনে ভিড় জমাচ্ছে। দেশটির আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, উত্তর ভারতে চলমান তাপপ্রবাহ আগামী কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে। মার্চ মাসে গ্রীষ্ম শুরু হওয়ার পর থেকে তাপজনিত অসুস্থতায় ভারতে কয়েক ডজন লোক মারা গেছে।