অবশেষে, আবারও মুক্ত জীবনে ফিরলেন আমেরিকাসহ বিশ্বের বহু সরকারের গোপন নথি ফাঁস করে দিয়ে শোরগোল বাধিয়ে দেয়া উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় নর্দান মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের আদালতে গুপ্তচরবৃত্তি আইন লঙ্ঘনের দায়ে দোষ স্বীকারের পর অ্যাসাঞ্জ মুক্ত একজন মানুষ হিসাবে নিজ জন্মভূমি অস্ট্রেলিয়ায় ফিরেছেন।
সাইপানের আদালতে তিন ঘণ্টার শুনানিতে অংশ নেন অ্যাসাঞ্জ। সমঝোতা অনুযায়ী, আদালতে অ্যাসাঞ্জ ফৌজদারি অভিযোগের দোষ স্বীকার করেন। তবে দোষ স্বীকার করলেও অ্যাসাঞ্জ বলেছেন, তিনি মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর ওপর আস্থা রাখেন। আর সেটা মুক্তমত চর্চা এবং কর্মকাণ্ডকে সুরক্ষা দেয়।
উইকিলিক্সের প্রতিষ্ঠাতাকে বহনকারী উড়োজাহাজ অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় পৌঁছেছে। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে আসেন তার বাবা এবং স্ত্রী স্টেলা আ্যসাঞ্জ। অ্যাসাঞ্জের কিছু সমর্থকও তাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন। অ্যাসাঞ্জের আগমনে তারা ব্যানার ও প্লাকার্ড নিয়ে উল্লাস করে।
মার্কিন সরকারের গোপন সামরিক তথ্য, নথিপত্র প্রকাশ করে ১৪ বছর আগে ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন অ্যাসাঞ্জ। ওই সময় থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’। সুইডেনে একটি ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে সাত বছর ধরে লন্ডনের একুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় নিয়ে লুকিয়ে ছিলেন অ্যাসাঞ্জ।
পরে ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সেদেশের কারাগারে ছিলেন। মার্কিন আদালতে দোষ স্বীকার করলে এই কারাবাসকেই তার শাস্তি হিসাবে গণ্য করা হবে, আর কারাভোগ করতে হবে না, মার্কিন সরকারের বিচার বিভাগের সাথে এমন সমঝোতার পর ব্রিটেন থেকে তিনি মুক্তি পান।
তাকে মুক্তি দিতে অনেকদিন ধরে অনুরোধ করে আসছিল অ্যাসাঞ্জের দেশ অস্ট্রেলিয়া। প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে নর্দান মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের একটি আদালতে হাজির হয়ে দোষ স্বীকার করার পর তাকে মুক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপরই ভাড়া করা বিশেষ উড়োজাহাজে করে অ্যাসাঞ্জ ক্যানবেরা উড়ে যান।
কৈশোরে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষ হয়ে উঠা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ২০০৬ সালে উইকিলিকস ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠা করেন অ্যাসাঞ্জ। ওয়েবসাইটটির দাবি, যুদ্ধ, গুপ্তচরবৃত্তি এবং দুর্নীতি সম্পর্কিত অনেক গোপনীয় সরকারি প্রতিবেদনসহ এক কোটিরও বেশি নথি প্রকাশ করেছে এটি।
এরপর ২০১০ সালে উইকিলিকস একটি মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার থেকে করা এমন একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যাতে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে ১৮ জন বেসামরিক লোককে হত্যা করার দৃশ্য দেখা যায়। ভিডিওতে একটি কণ্ঠ শোনা গেছে। সেই কণ্ঠকে বলতে শোনা গেছে, ‘সবাইকে জ্বালিয়ে দাও’।
এছাড়াও উইকিলিকস মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক গোয়েন্দা বিশ্লেষক চেলসি ম্যানিংয়ের সরবরাহ করা হাজার হাজার গোপনীয় নথি প্রকাশ করে। এসব নথিতে বলা হয়, আফগানিস্তানে যুদ্ধের সময় মার্কিন সামরিক বাহিনী কয়েকশ’ বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে যা রিপোর্ট করা হয়নি।
ইরাকি সেনাদের বন্দীদের নির্যাতনের তথ্য এবং মার্কিন কূটনীতিকদের আদান-প্রদান করা আড়াই লাখ বার্তা ফাঁস করা হয়েছিল। নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ারে হামলার দিন একে অপরের খবর নিতে মানুষজন যেসব পেজার বার্তা প্রদান করেছিলেন তার মধ্যে থেকে প্রায় ছয় লাখ বার্তা প্রকাশ করেছিল উইকিলিকস।
২০১৫ সালে মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সনি পিকচারসের প্রায় দুই লাখ ইমেইল ও ২০ হাজার নথি ফাঁস করা হয়েছিল। ওই সব ইমেইলে জানা যায় অ্যাঞ্জেলিনা জোলিসহ বিখ্যাত তারকাদের সম্পর্কে কোম্পানিটির প্রোডিউসার কেমন কটূক্তিমূলক কথাবার্তা বলেছেন।
এসব ঘটনায় দুনিয়াজুড়ে শোরগোল তৈরি হলে, নড়েচড়ে বসে মার্কিন প্রশাসন। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করে দেশটির বিচার বিভাগ। এসব মামলার বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৩ বছরের আইনি লড়াইয়ের ইতি ঘটলো দুই পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে। আবারও মুক্ত জীবনে ফিরলেন অ্যাসাঞ্জ।