আমেরিকাসহ বিশ্বের শক্তি দেশের সরকার ও ব্যক্তিদের গোপন তথ্য ও দলিল ফাঁস করে দিয়ে আলোচনায় আসেন ওয়েবসাইট উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। তাকে ঠেকাতে আদা জল খেয়ে মাঠে নামে আমেরিকার প্রশাসন। দায়ের করা হয় একাধিক মামলা। আর, গ্রেপ্তার এড়াতে শুরু হয় অ্যাসাঞ্জের পলাতক জীবন।
কে এই জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ? অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে জন্ম নেয়া অ্যাসাঞ্জ একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামা। কিশোর বয়স থেকেই তিনি কম্পিউটার বিজ্ঞানে দক্ষ হয়ে উঠেন। ‘মেন্ডাক্স’ নাম ব্যবহার করে তিনি আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা এবং পেন্টাগনসহ বেশ কয়েকটি সুরক্ষিত সিস্টেমে অনুপ্রবেশ আলোড়ন সৃষ্টি হইচই ফেলে দিয়েছিলেন।

১৯৯১ সালে অস্ট্রেলিয়ান কর্তৃপক্ষ তাকে ৩১টি সাইবার অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অ্যাসাঞ্জ নিজেদের দোষ স্বীকার করে নেয়ায়, আদালত তাঁকে জরিমান করেই ছেড়ে দিয়েছে। বিচারক রায়ে বলেন, জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ যা কিছু করছেন, তারই সবই হচ্ছে তারুণ্যের অনুসন্ধানী মনের ফলাফল।
এরপর মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় পড়াশুনা করতে গিয়ে ডিগ্রি অর্জনের আগেই ক্যাম্পাস ছাড়েন, কারণ তার মন পড়ে থাকতো অন্যখানে। কম্পিউটার নিরাপত্তা পরামর্শদাতা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও, ২০০৬ সাল থেকেই বিভিন্ন দেশের সরকার, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির গোপন নথি প্রকাশের উদ্যেগ নেন অ্যাসাঞ্জ।
তিনি ‘উইকিলিকস’ নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে ওই বছরের ডিসেম্বরেই সোমালিয়ার এক বিদ্রোহী নেতার একটি বার্তা প্রকাশ করে আলোড়ন তৈরি করেন অ্যাসাঞ্জ। সেই নথিতে বেরিয়ে এসেছিলো, কিভাবে সোমালি বিদ্রোহীরা ভাড়া করা বন্দুকধারীদের দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের হত্যার ষড়যন্ত্র করতো।

এই নথিটির সত্যতা কখনই নিরপেক্ষ কোন সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করা হয়নি। তবে উইকিলিকসের গল্প বলা এবং তথ্য উপস্থাপনের কৌশলের কারণে ওয়েবসাইটটি জনপ্রিয় হয়ে উঠে। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ তার তথ্য প্রকাশের ধরনকে ‘বৈজ্ঞানিক সাংবাদিকতা’ হিসাবে অভিহিত করতেন। যদিও নূন্যতম সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ করতেন তিনি।
এরপর একে একে কুখ্যাত গুয়ানতানামো বে কারাগার, ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টির গোপন সদস্য তালিকা, সায়েন্টোলজি আন্দোলনের গোপন নথি এবং ইস্ট অ্যাঙ্গলিয়ার ইউনিভার্সিটির ব্যক্তিগত ই-মেলগুলোসহ আরও বেশ কয়েকটি নথি প্রকাশ করে গোটা বিশ্বে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেন আ্যাসাঞ্জ। তটস্থ হয়ে ওঠে বিভিন্ন দেশের শাসকরা।
জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ আসল বোমা ফাটান ২০১০ সালে। মার্কিন সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিশ্লেষকের কাছ থেকে পাওয়া লাখ লাখ গোপন নথি ফাঁস করে শোরগোল ফেলে দেন তিনি। বিশেষ করে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ সম্পর্কিত নাজুক ও স্পর্শকাতর নথি। এসব নথিতে যুদ্ধকালীন মার্কিনদের বন্দী নির্যাতনের খবরও ছিলো।

বারাক ওবামার প্রশাসন এসব তথ্য ফাঁসকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে সমালোচনা করেন। এতে দমে যাননি অ্যাসাঞ্জ। ২০১০ সালের নভেম্বরে প্রায় আড়াই লাখ মাকিন কূটনৈতিক তার বার্তার নথি প্রকাশ করে উইকিলিকস। যার মধ্যে ইরানকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন প্রচেষ্টার তথ্য ছিলো।
এসব ঘটনায় বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করে এবং উইকিলিকসের প্রকাশনা নিয়ে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে। সেসব ক্ষোভের বেশিরভাগ লক্ষ্যে পরিণত হন অ্যাসাঞ্জ। কিছু আমেরিকান রাজনীতিবিদ তাকে সন্ত্রাসী হিসাবে আখ্যায়িত করে অনুসরণ না করার জন্য জন্য আহবানও জানিয়েছিলেন।
এরপর, জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করে যুক্তরাষ্ট্র। শুরু হয় গ্রেপ্তার তৎপরতা। গ্রেপ্তার এড়াতে এক পর্যায়ে অ্যাসাঞ্জ লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয়ে নেন এবং সেখানেই প্রায় সাত বছর কাটান। ২০১৯ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর, গেলো পাঁচ বছর যুক্তরাজ্যের কারাগারে ছিলেন অ্যাসাঞ্জ। সেখানে বসেই আইনি লড়াই চালান তিনি।
এরমধ্যেই ২০১০ সালের নভেম্বরে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে সুইডেনে দুই নারীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা হয়। জারি করা হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। অভিযোগ অস্বীকার করেন অ্যাসাঞ্জ। বলেন, ওই ঘটনা ছিলো সম্মতিসূচক যৌন সম্পর্কের। পরে, লন্ডনে গ্রেপ্তার হন অ্যাসাঞ্জ। জামিনও পান।

সুইডেনে ফেরত পাঠানো এড়াতে ২০১২ সালের জুনে অ্যাসাঞ্জ লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় নেন। আবেদন করেন রাজনৈতিক আশ্রয়ের। ইকুয়েডরের তৎকালীন বামপন্থী প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরেরা আবেদন মঞ্জুর করেন। ফলে অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাজ্যের বাইরে পাঠানোর পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
২০১৭ সালের মে মাসে সুইডেনের কৌঁসুলিরা অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের তদন্তের ইতি টানেন। ওই বছরেরই ডিসেম্বরে ইকুয়েডর সরকার অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেয়া অ্যাসাঞ্জকে নিজেদের নাগরিকত্ব দেয়। তবে যুক্তরাজ্য সরকার এ উদ্যোগ আটকে দেয়। এরপর ইকুয়েডরে পালাবদল হয়ে আ্যাসাঞ্জের নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করে নেয় দেশটি।
এরপর ২০১৯ সালে এপ্রিলে ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে অ্যাসাঞ্জকে বের করে গ্রেপ্তার করে লন্ডন পুলিশ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যর্পণের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে। শুরু হয় প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া। ২০১৯ সালের মে মাসে মার্কিন বিচার বিভাগ অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে গোপন নথি ফাঁস করার ষড়যন্ত্রের জন্য অভিযোগ গঠন করে।
২০২২ সালে ১৭ জুন যুক্তরাজ্য সরকার অ্যাসাঞ্জের যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ অনুমোদন করে। এর বিরুদ্ধে আপিল করেন অ্যাসাঞ্জ। তার স্ত্রী স্টেলা অ্যাসাঞ্জ স্বামীর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ জানালে আপিলে সুযোগ দেয়া হয়। সেই আপিলের শুনানি হবার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক সমঝোতায় যুক্তরাজ্যের কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
তিস্তা-গঙ্গার পানি বণ্টন, মোদী-মমতা দ্বন্দ্ব চরমে