ফ্রান্সের নির্বাচনে বামপন্থিদের চমক

ফ্রান্সের পার্লামেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে চমক দেখিয়েছে বামপন্থীরা। নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত জয় পেয়েছে তারা। বিপরীতে প্রথম ধাপে এগিয়ে থাকা কট্টর ডানপন্থী নেতা মেরি ল পেনের দল ন্যাশনাল র‌্যালি (আরএন) অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে।

সোমবার বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল অনুযায়ী দ্বিতীয় দফার ভোটে বামপন্থীদের জোট নিউ পপুলার ফ্রন্ট (এনপিই) জয়ী হয়েছে এবং পার্লামেন্টে তারাই সবচেয়ে বেশি আসন পেতে যাচ্ছে।

বিবিসির তথ্যমতে, দেশটির ৫৭৭ আসনের মধ্যে পার্লামেন্টে বামপন্থী ন্যাশনাল পপুলার ফ্রন্ট ১৮২টি আসন পেয়েছে, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাকরন উদারপন্থী দল পেয়েছে ১৬৮টি আসন। আর পেরি ল পেনের ন্যাশনাল র‍্যালি দল পেয়েছে ১৪৩টি আসন।

নির্বাচনের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী এসেম্বল জোট দ্বিতীয় অবস্থানে আছে এবং আরএন পার্টি এখন তৃতীয় অবস্থানে সরে গেছে। রোববারের এই ভোটে কট্টর-ডানপন্থি ন্যাশনাল ব়্যালিকে ঠেকাতে একজোট হয়ে লড়েছে বামপন্থি জোট দলগুলো।

France`s-election3

তবে বামপন্থীরা সর্বোচ্চ আসন পেলেও সরকার গঠনের জায়গায় তারা পৌঁছাতে পারবে না। ৫৭৭ আসনের ফরাসি পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২৮৯টি আসন।

ফ্রান্স ২৪’র এর খবরে বলা হয়েছে, কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা শুরু হতে পারে। কারণ দেশটিতে তিন দলের একসঙ্গে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা দেখা যায়নি।

France`s-election4

অবশ্য দ্বিতীয় দফার নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো কোনো মন্তব্য করেননি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ।

এদিকে, নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে ফ্রান্সের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গ্যাব্রিয়েল আতাল পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। দু-এক দিনের মধ্যেই তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন বলে জানা যাচ্ছে।

অন্যদিকে, ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র‍্যালির নেতা মারি লা পেন বলেছেন, এবারের নির্বাচনের ফলাফলের মধ্যে তিনি আগামী দিনের বিজয়ের বীজ দেখতে পাচ্ছেন।

France`s-election1

দলটির আরেকজন নেতা জর্ডান বারডেলা, বাম ও মধ্যপন্থীদের ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘অস্বাভাবিক’ এবং ‘মর্যাদাহীন’ জোট ফ্রান্সের জনগণকে ‘ন্যাশনাল র‍্যালির বিজয়’ থেকে বঞ্চিত করেছে।

দ্বিতীয় দফার এই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারলে জর্ডান বারডেলা ফ্রান্সের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে শোনা যাচ্ছিলো।

কারা এই নিউ পপুলার ফ্রন্ট

প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গত ৯ জুন আগাম নির্বাচন ঘোষণা করার পর সোশ্যালিস্ট (সমাজতান্ত্রিক), পরিবেশবাদী, কমিউনিস্ট ও কট্টর বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবোয়েড পার্টি (এলএফআই) মিলে নতুন যে জোটটি গড়ে তোলেন, সেটিই ‘নিউ পপুলার ফ্রন্ট’ নামে পরিচিতি পায়।

France`s-election8

এই দলগুলো আগে একে অপরের সমালোচনা করতো এবং তাদের আদর্শ ও কর্মপদ্ধতির মধ্যেও বেশ ব্যবধান রয়েছে। তারপরও তারা জোট গঠন করে, যেন কট্টর ডানপন্থীরা কোনোভাবেই রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে না পারে।

বস্তুত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কট্টর ডানপন্থী কোনো দল ফ্রান্সের রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসতে পারেনি।

নিউ পপুলার ফ্রন্টের পক্ষ থেকে বর্তমান সরকারের পাশ করা পেনশন ও অভিবাসন বিষয়ক সংশোধিত আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।

France`s-election9

সেই সঙ্গে অবৈধ অভিবাসীদের ব্যবস্থাপনা এবং ভিসা আবেদনের বন্দোবস্ত করার জন্য একটি সহায়তাকারী সংস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছে।

এছাড়া জীবনযাপনের ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নির্ধারণ করা এবং ন্যূনতম বেতন বাড়ানোরও ঘোষণাও দিয়েছে বামপন্থীদের নতুন এই জোট।

প্রথম দফার নির্বাচন

প্রথম দফায় ৩৩ শতাংশ ভোট নিয়ে এগিয়ে ছিলো ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র‌্যালি (এনআর)। বুথ ফেরতসহ বিভিন্ন জরিপে এবার ফ্রান্সে ডানপন্থী দল এনআর-এর বিজয়ের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিলো।

France`s-election11

পক্ষান্তরে প্রথম দফায় ম্যাঁক্রোর দল ২১ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিলো।

দ্বিতীয় দফার ভোটে বড় পরিবর্তন কেনো?

এক মাস আগে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট নির্বাচনে ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থিরা জয় পাওয়ার পর হতাশ মাক্রোঁ দেশে আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনের ডাক দেন। নির্বাচনের ফলাফর ঘোষণার পর তাৎক্ষণিকভাবে মাক্রোঁ কোনো মন্তব্য করেননি।

দুই পর্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রথম পর্বে কট্টর ডানপন্থিরা জয়ী হওয়ার পর দ্বিতীয় পর্বে তাদের ঠেকাতে বামপন্থি ও মধ্যপন্থি দলগুলো একজোট হয়ে লড়াই করে।

France`s-election10

এরপর বহু নির্বাচনী আসনে মধ্যপন্থি ও বামপন্থি প্রার্থীরা তাদের মধ্যে এগিয়ে থাকা প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে যান। ফলাফলে বড় পরিবর্তন দেখা গেলো।

সামনে কী হবে?

২০২৭ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় আছেন ম্যাক্রো। কিন্তু আগামী আড়াই বছর তার জন্য খুব সহজ হবে না। বামপন্থিদের সঙ্গে ম্যাক্রোর নীতির অনেক ফারাক। পার্লামেন্টে যদি বামপন্থি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন, তাহলে পদে পদে বাধা পেতে হবে ম্যাক্রোকে।

France`s-election13

বস্তুত, গত কয়েকবছরে অনেকটাই জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন ম্যাক্রো। এবারের নির্বাচনে তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।