ইরানের নবম প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করেছেন ড. মাসুদ পেজেশকিয়ান।
তেহরানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম পার্সটুডে ও প্রেসটিভি জানায়, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায় ইরানের জাতীয় সংসদ ভবনের প্রধান হলে এ শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বিচার বিভাগীয় প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেয়ি।
শপথ গ্রহণের সময় পেজেশকিয়ান বলেন, আমি আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য আমার সমস্ত সক্ষমতা এবং যোগ্যতা উৎসর্গ করবো এবং আমি জনগণের সেবা ও জাতিকে উন্নত করতে ধর্ম ও নৈতিকতার প্রচার, ন্যায়পরায়ণতার প্রতি সমর্থন এবং ন্যায়বিচারের প্রসারে নিজেকে নিবেদিত করবো।
এ অনুষ্ঠানে প্রায় ৮৮টি দেশের প্রতিনিধি দল অংশ নেয়। বিদেশি প্রতিনিধি দলগুলোতে রয়েছেন বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের সদস্য, রাষ্ট্রদূত এবং ৬০০ দেশি-বিদেশি সাংবাদিক।
এসময় তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, উজবেকিস্তানের সংসদ স্পিকার, মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কঙ্গোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ব্রাজিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নের উপপ্রধান এনরিক মোরা, জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, দক্ষিণ আফ্রিকার উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দক্ষিণ কোরিয়ার উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাংহাই সহযোগিতা পরিষদের মহাসচিব এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
দুদিন আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আনুষ্ঠানিকভাবে মাসুদ পেজেশকিয়ানকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের অনুমোদন দিয়েছেন।
এর আগে গেলো মে মাসে আজারবাইজানের সীমান্তের কাছে দুটি বাঁধ উদ্বোধন করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি। এরপর হেলিকপ্টারে চড়ে ইরানের উত্তর-পশ্চিমের তাবরিজ শহরের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি ও তার সহযাত্রীরা। পথিমধ্যে পাহাড়ি এলাকায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তাদের বহনকারী হেলিকপ্টারটি।
পরে পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের পাহাড়ি ও তুষারাবৃত এলাকায় ইরানি প্রেসিডেন্টকে বহনকারী হেলিকপ্টারের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পায় অনুসন্ধানী দল।
দুর্ঘটনায় নিহত হন ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আব্দুল্লাহিয়ান পূর্ব আজারবাইজানের গভর্নর মালেক রহমাতি, পূর্ব আজারবাইজানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি মোহাম্মদ আলী আলে-হাশেম, প্রেসিডেন্ট গার্ডের প্রধান মেহেদি মুসাভি। প্রাণ হারিয়েছেন হেলিকপ্টারের পাইলট, কো-পাইলটও।
প্রেসিডেন্টের মেয়াদকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই রাইসির মৃত্যু হয়।
কে এই মাসুদ পেজেশকিয়ান?
১৯৫৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আজারবাইজান প্রদেশের মাহাবাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন মাসুদ পেজেশকিয়ান।
স্কুলের পাঠ এবং প্রথম ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাবুল শহরে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। তবে সামরিক বাহিনীতে বেশিদিন স্থায়ী হননি মাসুদ। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানে দ্বিতীয় ডিপ্লোমা করবেন।
১৯৭৬ সালে তিনি তাবরিজ মেডিকেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হন। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক্তারি ডিগ্রি এবং জেনারেল সার্জারির ওপর বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৯৩ সালে ইরান ইউনিভার্সিটি অফ মেডিকেল সায়েন্সেস থেকে কার্ডিয়াক সার্জারিতে একটি উপ-স্পেশালিটি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে হার্ট সার্জারিতে বিশেষজ্ঞ হন মাসুদ পেজেশকিয়ান। এরপর তিনি পাঁচ বছর তাবরিজ ইউনিভার্সিটি অফ মেডিকেল সায়েন্সের প্রধানও ছিলেন।
পেজেশকিয়ানের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৭ সালে, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির প্রশাসনে উপ-স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি যোগদান করেন।
এরপর ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রায় চার বছর খাতামি প্রশাসনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পেজেশকিয়ান।
ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় তাবরিজ অঞ্চল থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। তবে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হিসেবে পার্লামেন্টে প্রবেশ করেন ২০০৮ সালে।
দেশটির দশম জাতীয় সংসদে তিনি উপ-স্পীকার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং চলতি বছরের প্রথম দিকে যে সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে আবারও তাবরিজের প্রতিনিধি হিসেবে বিজয়ী হন।
মাসুদ পেজেশকিয়ান এর আগেও দুইবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
এরমধ্যে ২০১৩ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় আলী আকবর হাশেমি রাফসানজানির প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে দাঁড়ান। আর সবশেষ ২০২১ সালে, নির্বাচন করার জন্য তিনি নাম রেজিস্ট্রার্ড করলেও তখন ইরানের অভিভাবক পরিষদ তাকে অনুমোদন দেয়নি।
গেলো মে মাসে ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মর্মান্তিক মৃত্যুর পর মাসুদ পেজেশকিয়ান আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে শামিল হন।