মগজখেকো অ্যামিবায় আক্রান্ত হয়ে বেঁচে ফিরলেন জসিম!

পৃথিবীতে যতগুলো বিরল আর ভয়ঙ্কর স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে, তার মধ্যে একটি হলো মগজখেকো অ্যামিবা দ্বারা আক্রান্ত হওয়া। এতে আক্রান্ত হলে মৃত্যু প্রায় অবধারিত। এই অ্যামিবা একবার মাথায় বাসা বাঁধলে কুরে কুরে খেয়ে শুরু করে মস্তিষ্ক, তারপর একদিন আক্রান্তে ঠেলে দেয় মৃত্যুর খাদে।

তবে সেই মৃত্যুর খাদ থেকে ফেরার বিরল ইতিহাসও রয়েছে। সম্প্রতি তেমনই এক ঘটনার জন্ম দিয়েছেন এক ভারতীয় কিশোর। মরণঘাতী মগজখেকো অ্যামিবা দ্বারা আক্রান্ত হয়েও বেঁচে ফিরেছেন তিনি। তার ফেরার গল্প এখন নেটদুনিয়ায় তুমুল ভাইরাল। বিশেষ করে আলোচনায় ভারতের কেরলা রাজ্য।

কেরালার ১৪ বছরের কিশোর আফনান জসিম স্থানীয় একটি পুকুরে সাঁতার কাটতে গিয়ে এই মারণ শক্তির ব্রেই ইটিং অ্যামিবা বা মগজখেকো অ্যামিবায় সংক্রমিত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানকার চিকিৎসকরা জানান, সাধারণত দুষিত পানিতে এই ধরনের অ্যামিবার বাস।

কেরালায় গত তিন মাসে মগজখেকো অ্যামিবার আক্রমণে মারা গেছেন অনেকেই। আসলে এই অ্যামিবা একবার মাথায় বাসা বাঁধলে কুরে কুরে খেয়ে নেয় মগজ। তারপর একদিন হঠাৎ করেই নিয়ে যায় মৃত্যুর খাদে। কেরালায় একের পর এক মৃত্যু হয়েছে এই ব্রেন ইটিং অ্যামিবার আক্রমণে।

এই রোগকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় অ্যামিবিক মেনিনগোএনসেফালাইটিস। এতে মৃত্যুর হার ৯৭ শতাংশ। কিন্তু এই রোগকে জয় করেছেন আফনান জসিম। গেলো মঙ্গলবার কেরালার স্বাস্থ্যমন্ত্রী বীণা জর্জ ঘোষণা করেন এই কিশোরের মারণরোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের কথা।

তিনি জানান, এই রোগ থেকে সেরে ওঠা একটি বিরল ঘটনা। মাথা ব্যথা, প্রচণ্ড জ্বর, সর্দিকাশি, গায়ে ব্যথার মতো সাধারণ উপসর্গ দেখা যায় এই অ্যামিবার আক্রমণে। কিন্তু যত দিন যায় উপসর্গগুলো জটিল হয়ে ওঠে। পরিসংখ্যান বলছে বিশ্বব্যাপী মাত্র ১১ জন এই রোগ থেকে সেরে উঠেছেন।

আফনান জসিম নামে দশম শ্রেণির এই কিশোর বিশ্বের নবম ব্যক্তি, যিনি এই মরণ রোগে আক্রান্ত হয়েও বেঁচে গেছে। মগজখেকো অ্যামিবার দ্বারা আক্রান্ত হয়ে কেরালার কোঝিকোড়ের এক হাসপাতালে ২২ দিন ধরে চিকিৎসাধীন থাকার পর শেষ পর্যন্ত বেঁচে যান এই ভারতীয় ছাত্র।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার সুস্থ হয়ে ওঠার পিছনে মূল কারণ হলো প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল এই রোগকে। শুধু জসিমই নন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই মরণ রোগে আক্রান্ত যে ৮জনকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল, তাদের ক্ষেত্রেও সময় মতো রোগ শনাক্ত করা ও চিকিৎসা শুরু করা গিয়েছিল।

মারণ অ্যামিবাতে আক্রান্ত হবার জসিমকে প্রথমে নেয়া হয়েছিল কেরলার মেলাডির প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। সেখানের স্বাস্থ্যকর্মীরা উপসর্গ দেখে সন্দেহ করে, ছেলেটির মেনিনগোএনসেফালাইটিস হয়ে থাকতে পারে। আক্রান্তের মৃগীর মতো উপসর্গ ছিলো। দেরি না করে তাকে নেয়া হয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে।

কোঝিকোড়ের সেই বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা শুরুতেই মিল্টেফোসিন জাতীয় ওষুধ চালু করে। এই ওষুধ অ্যামিবা সংক্রমণ আটকাতেই ব্যবহার করা হয়। প্রাথমিক সনাক্তকরণ এবং উপলব্ধি চিকিৎসার যথোপযুক্ত ব্যবহারেই সেরে ওঠার চাবিকাঠি বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

প্রাইমারি অ্যামিবিক মেনিনগোয়েন্সফালাইটিস (পিএএম) নামে পরিচিত এই রোগের জন্য দায়ী ‘নিগলেরিয়া ফওলেরি’ নামক অ্যামিবা- যাতে আক্রান্ত হলে জীবনের তীব্র ঝুঁকি রয়েছে। গবেষণা বলছে, আক্রান্ত হওয়ার ৯ ঘণ্টা থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে এই রোগ ধরা পড়লে তবেই বেঁচে ফেরা সম্ভব।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা- সিডিসি’র প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ১৯৭১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও পাকিস্তানের মতো চারটি দেশে এই প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়েও এর আগে বেঁচে গিয়েছেন মাত্র আটজন।

হঠাৎই আফনান জসিমের তীব্র মাথা ব্যাথা হতে থাকে। পরে তার খিঁচুনি শুরু হওয়ায়, জসিমের পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। দ্রুত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। চিকিৎসার প্রথম দুই দিন তিনি খিঁচুনির পরবর্তী অবস্থায় (এই রোগে আক্রান্ত হলে যে লক্ষণ দেখা যায় তার পর্যায় অনুযায়ী) ছিলেন।

কোঝিকোড়ের বেবি মেমোরিয়াল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আব্দুল রউফ বলেন, আফনানকে যখন ভর্তি করা হয়, ততদিনে এই রোগে কেরালায় তিনজনের মৃত্যু হয়ে গেছে। এর মধ্যে দু’জন রোগীকে আমাদের কাছে অনেক পরে রেফার করা হয়েছিলো। কিন্তু জসিমের ক্ষেত্রে শুরুতেই চিকিৎসা শুরু করা গেছে।

আফনানের বাবা সিদ্দিকী পেশায় পশুপালক। ৪৬ বছরের এই বাবা জানান, দিন কয়েক আগে তার ছেলে কোঝিকোড় জেলার পায়োল্লি পৌরসভার অন্তর্গত টিক্কোটি গ্রামের একটা পুকুরে সাঁতার কাটতে নেমেছিল। এরপরই আফনান অসুস্থ হয়ে পড়লে সঙ্গে সঙ্গেই নেয়া হয় স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রে।

এরপরেও আফনান জসিমের খিঁচুনি বন্ধ না হওয়ায় ভাদাক্কারার অন্য একটা হাসপাতালে নিয়ে যান বাবা। কিন্তু সেখানে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। ওই হাসপাতালই আফনান জসিমকে বেবি মেমোরিয়াল হাসপাতালে রেফার করে দেয়া হয়। সেখানে নেয়ার পরপরই চিকিৎসা শুরু হয়ে যায়।

নাক দিয়ে মানবদেহে ঢোকে নিগলেরিয়া ফওলেরি। সেখান থেকে খুলির কাছে অবস্থিত ক্রিব্রিফর্ম প্লেটের মাধ্যমে পৌঁছে যায় ব্রেনে। ডা. রউফ বলেন, এটা এক প্রকারের প্যারাসাইট (পরজীবী) যা বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল নিঃসরণ করে এবং মস্তিষ্ককে নষ্ট করে দেয়।

এই অ্যামিবা যে রোগের সৃষ্টি করে তার প্রধান লক্ষণগুলি হল জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, গলা শক্ত হয়ে যাওয়া, সংজ্ঞা হারানো, খিঁচুনি এবং কোমার মতো পরিস্থিতিতে চলে যাওয়া। মাথার খুলিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়ে থাকে।