চিকিৎসা বিজ্ঞানে অভাবনীয় অগ্রগতির যাত্রায় সবশেষ সফলতা এসেছে পুরো চোখ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে। মানুষের হৃদপিন্ড থেকে শুরু করে কিডনি প্রতিস্থাপনের কথা হরহামেশাই শোনা গেলেও চোখ প্রতিস্থাপন করা ছিলো কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। চোখের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের কাজটি বহু বছর আগেই শুরু হলেও গোটা চোখ প্রতিস্থাপনের প্রথম সফলতা আসে গেল বছরের মে মাসে।
সেসময় প্রথমবার পুরো চোখ প্রতিস্থাপনে সফল হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একদল শল্যচিকিৎসক। সেই সময়ে ঘটনাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি অনন্য অর্জন হিসেবে দেখা হলেও, অ্যারন জেমস নামের ৪৬ বছর বয়সী ওই পুরুষ রোগী চোখে দেখতে পাবেন কি না, সেটা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। অবশেষে সুখবর এলো, জেমসের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং আবারও দেখতে পাবেন।
নিউইয়র্কের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আমেরিকার সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য অ্যারন জেমস স্বাভাবিক জীবন পুনরায় শুরু করতে সক্ষম হয়েছেন। ২০২১ সালে একটি উচ্চক্ষমতার বৈদ্যুতিক কেন্দ্রে কাজ করার সময় এই দুর্ঘটনায় তিনি দুই চোখের পাশাপাশি মুখের কিছু অংশও হারিয়েছিলেন। চোখ প্রতিস্থাপনের সঙ্গে তার মুখের একটি অংশও প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এরপর শুরু হয় জেমসেন দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া।
গত ২৭ মে চোখ প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি জেমসের মুখমণ্ডলের অংশবিশেষও প্রতিস্থাপন করা হয়। যদিও চোখ প্রতিস্থাপনে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন কি না, তা তখনও নিশ্চিত ছিলো না। তবে আশা ছাড়েননি চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, দান করা চোখটি বেশ সুস্থ দেখাচ্ছে। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাঙ্গোন হেলথের চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, অ্যারন জেমস সুস্থ হয়ে উঠছেন।
২১ ঘন্টা ধরে চলা প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিয়েছেন চিকিৎসক এদুয়ার্দো রদ্রিগেজ। তিনি জানান, চোখ দান করা ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির অপর চোখটি ভালো এবং সুস্থ আছে। তিনি জানান, দান করা চোখের প্রভাবে দাতার অপর চোখ ক্ষতিগ্রস্থ হবার ঝুঁকি থাকে। তবে এক্ষেত্রে সেটি হয়নি। একই সঙ্গে জেমসের প্রতিস্থাপিত বাম চোখও বেশ সুস্থ দেখাচ্ছে। এক বছরে তার অগ্রগতিতে চিকিৎসকরা সন্তুষ্ট।
জেমস সেই চোখে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাননি, তবে গবেষকরা আশাবাদী যে তিনি শেষ পর্যন্ত এটি থেকে আবার দেখতে সক্ষম হবেন। জেমসের চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. বৈদেহী দেদানিয়া বলেন, অস্ত্রোপচারের পরে আমরা যে ফলাফলদেখতে পাচ্ছি তা বেশ অবিশ্বাস্য এবং নতুন পথ দেখাবে। মানুষের জটিল সংবেদনশীল অঙ্গগুলোর সাথে জড়িত জটিল প্রতিস্থাপনের গবেষণাকে আরও অনুপ্রাণিত করতে পারে।
গবেষকরা বলেছেন, ইলেক্ট্রোরেটিনোগ্রাফি নামক এক পরীক্ষা দেখা গেছে, দাতার চোখের রড ও কনসসহ চোখের আলো-সংবেদনশীল স্নায়ু কোষগুলো প্রতিস্থাপনের পরও বেঁচে গেছে। চোখের মধ্যে যেসব স্নায়ুকোষগুলো দৃষ্টিশক্তি মস্তিকে বার্তা পাঠায় সেগুলো কাজ করছে। ফলে দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে পুরো চোখ প্রতিস্থাপনের বিষয়টি ভবিষ্যতের জন্য আশা দেখাবে।
জেমস তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারাননি। দান করা মুখ এবং চোখ ৩০ বছর বয়সী একক পুরুষ দাতার কাছ থেকে এসেছে। অস্ত্রোপচারের সময়, ডাক্তাররা দাতার অস্থি মজ্জা থেকে প্রাপ্তবয়স্ক স্টেম সেলগুলো অপটিক স্নায়ুতে ইনজেকশন দিয়ে পুশ করা হয়েছিলো, যাতে করে গৃহীতার সেরে উঠতে সময় কম লাগে। গবেষকরা আশাবাদি, জেমসের ঘ্রাণশক্তি এবং শক্ত খাবার গ্রহণের ক্ষমতা ফেরায় একদিন দেখতেও পাবেন।
জেমস বলেন, আমি অনেকটাই স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে ফিরে এসেছি, স্বাভাবিক কাজগুলো করছি। তিনি বর্তমানে তার কন্যা সন্তানের পড়াশোনা দেখভাল করছেন। ডা. এডুয়ার্ডো রদ্রিগেজ বলছেন, এখন তাদের প্রধান কাজ হচ্ছে জেমসের দৃষ্টিশক্তি ফেরানো। যেহেতু প্রতিস্থাপনের কাজটি সফলভাবে করা গেছে তাই, দৃষ্টিশক্তি ফেরানোর বিষয়েও তারা আশবাদী এবং দ্রুতই সেই সুখবরও দিতে পারবেন।