কয়েক দশক ধরে ইরান তার বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি হিসেবে মুসলিম বিশ্বের রক্ষক হওয়ার আখ্যান তৈরি করেছে। তেহরান নিজেকে ধারাবাহিকভাবে এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যা ইসলামি দেশগুলোর ওপর বাহ্যিক চাপের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষা করে। ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তৃতায় এবং দেশটির সরকারি প্রচারণায় এই বার্তা বারবার উঠে এসেছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অত্যন্ত স্ববিরোধী এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। তবে তেহরান বারবার বলে আসছে, আরব দেশগুলো নয়, তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু বিভিন্ন স্থানে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং দেশটির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠান। শুধুমাত্র একপাক্ষিক তথ্যের বয়ান দিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের প্রধান দোসর ইসরাইল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর, তেহরান অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাতে শুরু করে। আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল মার্কিন ঘাঁটিগুলো। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই স্থাপনাগুলোর অনেকগুলোই আরব ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ডে অবস্থিত।

এর ফলে, ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনগুলো এমন সব দেশের মাটিতে পড়তে শুরু করেছে যারা নিজেরাও মুসলিম বিশ্বের অংশ। বিগত কয়েক দিনে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র ইতিমধ্যেই এই হামলার পরিণতি ভোগ করেছে এবং প্রায় প্রতিদিনই ভোগ করছে।
প্রথম যে দেশগুলোতে এসব ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। আবুধাবি এবং দুবাইয়ে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ আছড়ে পড়ে। বেশ কিছু এলাকায় অগ্নিকাণ্ড এবং অবকাঠামোগত ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। যদিও লক্ষ্যবস্তু ছিল সামরিক স্থাপনা, কিন্তু শহরগুলো নিজেই যুদ্ধের আবহের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে।
একই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে কাতারেও। মার্কিন আল-উদাইদ বিমান ঘাঁটির কাছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে, যার কিছু অংশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিহত করা হয়। তা সত্ত্বেও দোহার বাসিন্দারা বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছে এবং রাজধানীর আশপাশে ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

সৌদি আরবও এই হামলার শিকার হয়েছে। রিয়াদ অঞ্চলে ড্রোন চলাচল এবং ধ্বংসাবশেষ পড়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। আরেকটি ঘটনায় রাস তানুবার কাছে তেল অবকাঠামোতে হামলা চালানো হয়, যার ফলে সেখানে আগুন ধরে যায় এবং সাময়িকভাবে কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
কুয়েতে এর পরিণতি ছিল আরও ভয়াবহ। বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সচল থাকা সত্ত্বেও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দেশটির ভূখণ্ডে আঘাত হানে। ধ্বংসাবশেষ পড়ার ফলে বেশ কয়েকজন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন। সবশেষ দুবাই বন্দরে কুয়েতের তেলবাহী জাহাজেও হামলা হয়েছে।
অনুরূপ ঘটনা বাহরাইনেও ঘটেছে, যেখানে সামরিক স্থাপনার দিকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করেছে। তা সত্ত্বেও, খণ্ডবিখণ্ড অংশগুলো দেশটির ভূখণ্ডে পড়ে অবকাঠামো ও বেসামরিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ওমানেও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে, যেখানে বন্দর অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এসব ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর একটি ছিল আজারবাইজানের ভূখণ্ডে ড্রোন হামলা।

ইরানি ড্রোনগুলো নাখচিভান স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্রে আঘাত হানে। এর মধ্যে একটি হামলা নাখচিভান বিমানবন্দর এবং বেসামরিক অবকাঠামোর সংলগ্ন এলাকায় ঘটে, যার খুব কাছেই একটি স্কুল ছিল। এই হামলায় চারজন আহত হন। এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ।
তিনি বলেছেন, আমাকে এটাও জানানো হয়েছে যে, ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাকুতে ফোন করেছিলেন এবং আজারবাইজানকে লেবাননে অবস্থানরত ইরানি দূতাবাসের কর্মীদের সরিয়ে নিতে সাহায্য করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন, কারণ তাদের নিজেদের সেই সক্ষমতা ছিল না। আমি তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দিই এবং একটি বিমান পাঠাতে বলি।
ইলহাম আলিয়েভ আরও বলেন, তাছাড়া, তারা এই অপারেশনের জন্য অর্থ পরিশোধ করতেও প্রস্তুত ছিল। আমি উত্তর দিয়েছিলাম: এর প্রয়োজন নেই, আমরা যদি কঠিন সময়ে সাহায্য না করি, তবে কখন করব? আর এসবের পর নাখচিভানে এমন নোংরা, বিশ্বাসঘাতক এবং নীচভাবে হামলা চালানো! এই লজ্জা তাদের নোংরা ও কুৎসিত মুখ থেকে কখনোই মুছে যাবে না।

এই ঘটনাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ আজারবাইজান ইরান ও তার শত্রুদের মধ্যকার সংঘাতের কোনো পক্ষ নয়। তা সত্ত্বেও দেশটির ভূখণ্ড আক্রান্ত হয়েছে।
অল্প সময়ের মধ্যে যুদ্ধের এই ভয়াবহতা আজারবাইজান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন এবং ওমানসহ বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক কূটাভাস বা প্যারাডক্স তৈরি করেছে।
যে দেশটি দীর্ঘ বছর ধরে ইসলামি বিশ্বের রক্ষক হওয়ার দাবি করে আসছে, তারা এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি যেখানে তাদের নিজস্ব সামরিক কর্মকাণ্ড মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ডে যুদ্ধ বয়ে আনছে।
সামরিক লক্ষ্যবস্তুকে লক্ষ্য করে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনগুলো ইসলামি দেশগুলোর মাটিতে পড়ছে, বেসামরিক অবকাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
অঞ্চলের অনেক সরকারের কাছে এর অর্থ হলো- ইরান এবং তার প্রতিপক্ষের মধ্যকার এই সংঘাত ধীরে ধীরে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য এক ব্যাপক নিরাপত্তা সংকটে রূপান্তরিত হচ্ছে।

সে কারণেই এখন পুরো অঞ্চলজুড়ে একটি জোরালো প্রশ্ন উঠছে; তেহরানের বর্তমান কৌশল কি এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যেখানে এক সময়ের 'প্রাকৃতিক মিত্র' হিসেবে বিবেচিত দেশগুলো এখন ইরানকে রক্ষক হিসেবে নয়, বরং নতুন অস্থিরতার উৎস হিসেবে দেখতে শুরু করেছে?
ইতিহাসে এমন অনেক রাষ্ট্রের উদাহরণ রয়েছে যারা কোনো বিশেষ আদর্শ রক্ষার দাবি করলেও বাস্তবে তাদের নিজেদের কর্মকাণ্ডই শেষ পর্যন্ত বিপরীত ফল বয়ে এনেছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোর ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরানকে কেন্দ্র করে ঠিক তেমনই এক প্যারাডক্স তৈরি হতে যাচ্ছে। যে দেশটি কয়েক দশক ধরে মুসলিম বিশ্বকে রক্ষা করার কথা বলেছে, আজ তারা এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে যেখানে স্বয়ং মুসলিম রাষ্ট্রগুলোই ইরানের যুদ্ধের চরম মূল্য দিতে শুরু করেছে।
সূত্র: দ্য কাসপিয়ান পোস্ট
দক্ষিণ লেবাননে আরও দুই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী নিহত