ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি হামলা শুরুর ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় আগে, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। আলোচনার মূল বিষয় ছিল এমন এক জটিল ও দূরপাল্লার যুদ্ধ শুরু করা, যার ঘোর বিরোধী ছিলেন আমেরিকান এই নেতা।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু জানতেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং তাঁর শীর্ষ সহযোগীরা তেহরানে এক বৈঠকে মিলিত হবেন। খামেনিকে সপরিবারে বা দলবলসহ নির্মূল করার এটিই ছিল মোক্ষম সুযোগ। তবে নতুন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতের পরিবর্তে বৈঠকটি শনিবার সকালেই এগিয়ে আনা হয়। ইতিপূর্বে অপ্রকাশিত এই ফোনালাপের বিষয়টি রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট তিন ব্যক্তি।
নেতানিয়াহু কয়েক দশক ধরে এমন একটি অভিযানের জন্য উন্মুখ ছিলেন। তিনি যুক্তি দেন, খামেনিকে হত্যার এবং ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টার প্রতিশোধ নেয়ার এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর আসবে না। ২০২৪ সালে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্পকে হত্যার জন্য ইরানের ভাড়াটে খুনি নিয়োগের যে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ মার্কিন বিচার বিভাগ করেছিল, নেতানিয়াহু মূলত সেই প্রসঙ্গের দিকেই ইঙ্গিত করছিলেন।

সূত্রমতে, ফোনালাপের সময় ট্রাম্প নীতিগতভাবে অভিযানের অনুমোদন দিলেও ঠিক কখন বা কীভাবে তা শুরু হবে, তা নিয়ে দোটানায় ছিলেন। নেতানিয়াহু যুক্তি দেন, খামেনিকে সরিয়ে ট্রাম্প ইতিহাসে অমর হয়ে থাকতে পারেন। এমনকি এর ফলে ১৯৭৯ সাল থেকে চলে আসা ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে ইরানিরা রাস্তায় নেমে আসতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার সকালে প্রথম বোমাটি বর্ষিত হয় এবং সেই সন্ধ্যায় ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, খামেনি নিহত হয়েছেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি ফোনালাপের বিষয়টি সরাসরি স্বীকার না করলেও জানিয়েছেন, এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও নৌ-ক্ষমতা ধ্বংস করা এবং তারা যাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। যদিও নেতানিয়াহু এই যুদ্ধকে আমেরিকার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার দাবিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, তবে রয়টার্সের অনুসন্ধান বলছে, ইসরাইলি নেতার যুক্তিগুলো ট্রাম্পকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল।

গত জুনে প্রথম দফায় ইরান ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর দ্বিতীয় দফায় এই ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র পরিকল্পনা করা হয়। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের সফল অভিযান এবং ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ট্রাম্পকে এই আগ্রাসনের পথে আরও সাহসী করে তোলে। যদিও সিআইএ সতর্ক করেছিল যে, খামেনি নিহত হলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন আরও কট্টরপন্থি কেউ।
বাস্তবেও তাই ঘটেছে; খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি এখন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন, যাকে তাঁর বাবার চেয়েও বেশি আমেরিকা-বিদ্বেষী মনে করা হয়। এই যুদ্ধের ফলে ইতিমধ্যে প্রায় আড়াই হাজার ইরানি বেসামরিক নাগরিক এবং ১৩ জন মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারেও। ইসরাইলের মাটিতেও হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।
