লেবাননে হিজবুল্লাহর প্রবল প্রতিরোধের মুখে ইসরাইল

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসকে নির্মূলের নামে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই দখলদার ইসরাইলের উপর ‘রকেট যুদ্ধ’ শুরু করেছিলো লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই হামলা তীব্রতর হতে শুরু করলে ইসরাইলও পাল্টা হামলা শুরু করে। 

সাম্প্রতিক সময় দক্ষিণ লেবানন সীমান্তে ইসরাইল-হিজবুল্লাহ পাল্টাপাল্টি হামলা তীব্র হতে শুরু করার পর পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়তে থাকে। লেবাননে বিমান হামলায় হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার নিহত হবার পর স্থল অভিযান শুরু করে ইসরাইল। 

সোমবার রাতে লেবাননে সীমিত আকারে স্থল হামলা শুরুর দাবি করে ইসরাইল। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সোমবার রাতে তাদের ৯৮তম এলিট ডিভিশনের সেনারা লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করেছে। এই ডিভিশনটি দুই সপ্তাহ আগেও গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে লড়ছিলো।

ইসরাইল জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন গ্রামে বিমান ও গোলন্দাজ বাহিনীর সহযোগিতায় ‘সীমিত, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর’ বিরুদ্ধে স্থল অভিযান শুরু করা হয়েছে। এসব গ্রামে অবস্থান নেয়া হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী।

লেবাননের দুই নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী লেবাননের সীমান্ত পেরিয়ে এসে রাতভর নজরদারি কার্যক্রম চালানোর পর মঙ্গলবার ভোর থেকে শুরু হয়েছে অভিযান। এ সময় লেবাননের নিজস্ব সেনারা সীমান্তবর্তী অবস্থান থেকে পিছু হটে যায়। 

মঙ্গলবার ভোরে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে নিয়ন্ত্রিত হামলা চালানো হবে। মূলত স্থলপথে হওয়া এই অভিযানের নাম দেয়া হয়েছে ‘অপারেশন নর্দান অ্যারো’। হামাসের মতো হিজবুল্লাহরও গোপন সুড়ঙ্গগুলোকে ধ্বংস করতে চাইছে ইসরাইল।

ইসরাইলের সেনারা লেবানন সীমান্ত পেরিয়ে স্থল অভিযান শুরু করার বিষয় এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি হিজবুল্লাহ। তবে, মঙ্গলবার হিজবুল্লাহ জানিয়েছে তারা ইসরাইলি সেনাদের ওপর রকেট ও কামানের গোলাবর্ষণ করেছে। সবশেষ খবর অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়েছে ইসরাইল।

আল জাজিরাকে সশস্ত্র গোষ্ঠীটির মিডিয়া কর্মকর্তা মুহাম্মাদ আসিফ জানিয়েছেন, সীমান্ত বিষয়ক অভিযানের বিষয়ে ইসরাইল যে দাবি করছে, তা মিথ্যা। এখন পর্যন্ত হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলি সেনাদের মধ্যে কোন ধরনের সংঘর্ষ ঘটেনি। যে কোনো ধরনের স্থল আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রস্তুত রয়েছে হিজবুল্লাহ।

হিজবুল্লাহ বলছে, তারা তেল আবিবে অবস্থিত মোসাদ এবং একটি সেনা ইউনিটের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে ‘ফাদি-৪’ রকেট উৎক্ষেপণ করেছে। হামলায় মোসাদ সদর দপ্তরের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলেছে, গত এক ঘণ্টায় লেবানন থেকে প্রায় ১৫টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রবেশ করেছে। 

লেবাননের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের পিছু হটা নিয়মিত মহড়ার অংশ। দক্ষিণ লেবাননের কিছু অবস্থান তারা 'অদল-বদল' করার দাবি জানিয়েছে। লেবানন সেনারা ইসরাইলের সঙ্গে বড় আকারে সংঘাত এড়িয়ে চলে। গত ১১ মাসে হিজবুল্লাহ-ইসরাইল সংঘাতে একবারও নাক গলায়নি লেবানিজ সেনাবাহিনী।

লেবাননের সীমান্ত শহর আইতা আল-শাআবের বাসিন্দারা কামানের গোলাবর্ষণ, কপ্টার এবং ড্রোন হামলার বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। অপর সীমান্তবর্তী শহর রমেইশ থেকে আকাশ হামলার সতর্কতাসূচক ফ্লেয়ার ছুড়ে মারা হচ্ছিলো, যা রাতের আকাশকে আলোকিত করে তোলে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, মঙ্গলবার ভোরে হিজবুল্লাহর বেশ কয়েকটি সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়েছে ইজরাইলি সেনা। সীমান্ত পেরিয়ে দক্ষিণ লেবানন ধরে সুড়ঙ্গগুলোতে এগোচ্ছে সেনা। ইতিমধ্যেই দক্ষিণ লেবাননের হিজবুল্লাহর ঘাঁটি দাহিয়ে থেকে বেসামরিকদের সরিয়ে দিয়েছে ইসরাইল। 

লেবাননের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ বৈরুতে ইসরাইল কমপক্ষে ছয়দফা হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলি হামলার কারণে লেবাননে ইতিমধ্যে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এছাড়া সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম বলেছে, রাজধানী দামেস্কের আশেপাশেও ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে লেবাননের জন্য সবচেয়ে খারাপ দিনটি ছিলো গত শুক্রবার। এদিন ৮০টিরও বেশি বাঙ্কার-বাস্টার মিসাইলের একটি বিস্ময়কর ব্যারেজ বৈরুতের হিজবুল্লাহ অধ্যুষিত শহর দাহিহের ভূগর্ভস্থ কাঠামো এবং চারটি ভবন ধ্বংস হয়ে যায়। এই হামলায় নাসরাল্লাহসহ শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা নিহত হন।

হিজবুল্লাহর ডেপুটি লিডার নাইম আল-কাসেম দাবি করেন, তাদের কমান্ড এন্ড কন্ট্রোল যন্ত্রপাতি এবং মধ্য ও দূর-পাল্লার অস্ত্রের অস্ত্রাগার অক্ষত রয়েছে এবং এটি একই হারে তার আন্তঃসীমান্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, স্থল আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন তারা। এই যুদ্ধে বিজয়ী হবেন তারা। 

ইসরাইল স্থল অভিযান শুরুর ঘোষণা করার পরেই, আমেরিকা বন্ধুরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন জানিয়েছেন, ইজরাইলের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করে পেন্টাগন। বিশ্লেষকরা বলেন, স্থল অভিযানের মধ্য দিয়ে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের লড়াই নতুন মাত্রা পেয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সোমবার ইসরাইলি স্থল অভিযানের বিরোধিতা করে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহবান জানিয়েছেন। আর লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাজিব মিকাতি যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের সাম্প্রতিক প্রস্তাবের ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতি এবং লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধের আহবান জানিয়েছেন।

ইসরাইলের স্থল অভিযানের নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে এই আক্রমণ বন্ধ ও লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের আহবান জানিয়েছে তুরস্ক। এক বিবৃতিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, স্থল অভিযান দ্বারা লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে ইসরাইল। যা একটি অবৈধ আক্রমণও বটে।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, ইসরাইলের পদক্ষেপ জাতিসংঘ আইনের লঙ্ঘন। এক বিবৃতিতে জাতিসংঘ জানায়, ইসরাইলি সেনাবাহিনী লেবাননে সীমিত স্থল অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এভাবে লেবাননে প্রবেশ করার অর্থ হলো দেশটির সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন।